.ঢাকা, রোববার   ২৪ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ১০ ১৪২৫,   ১৭ রজব ১৪৪০

পিকি ব্লাইন্ডারস

সৌমিক অনয়

 প্রকাশিত: ১৫:০৩ ৯ নভেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৫:০৩ ৯ নভেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

উনিশ শতকের শুরু থেকে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর বড় বড় শহরগুলোতে শুরু হয় গ্যাংস্টার কালচার। ভারতের মুম্বাই থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, শিকাগো সব বড় শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণই ছিল বড় বড় সব অরগানাইজড ক্রিমিনালদের হাতে। দেশ ভেদে এদেরকে বিভিন্ন নামে ডাকা হত- যেমন ইংলিশ ক্রিমিনালদের বলা হত গ্যাংস্টার, রাশিয়ানদের মবস্টার, ইতালীয় বা ইউরোপীয়দের মাফিয়া এবং জাপানীজদের ইয়াকুজা। নাম বা পরিচয় ভিন্ন হলেও এদের কাজ প্রায় একই ছিল।  এদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি তখনকার সময়ে এদেরকে আইনের উপরে রেখেছিল। শহরে জুয়া ব্যবসা থেকে শুরু করে ডাকাতিসহ সব অপরাধমূলক কাজই এসকল গ্যাংস্টারদের আওতায় হত। সাধারন মানুষের কাছ থেকে এরা ভয় এর সঙ্গে সঙ্গে সম্মানও পেতেন। এমনই ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম কেন্দ্রিক একটি অরগানাইজড ক্রিমিনাল দল ছিল পিকি ব্লাইন্ডারস।

বিখ্যাত ব্রিটিশ টিভি সিরিজ "পিকি ব্লাইন্ডারস" থেকে আমরা অনেকেই পিকি ব্লাইন্ডারস সম্পর্কে কম বেশি জানি। এই টিভি সিরিজে  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বার্মিংহামে পিকি ব্লাইন্ডারস তথা টমি সেলবি এবং তার গ্যাং মেম্বারদের উথ্যান দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব পিকি ব্লাইন্ডারস এর গল্প ভিন্ন ছিল। টিভি সিরিজে পিকি ব্লাইন্ডারসের উথ্যানের সময়কাল ১৯২০ দেখানো হলেও বাস্তবের পিকি ব্লাইন্ডারস এর উথ্যান হয় ১৮৯০ সালে এবং বিলি কিম্বারের দ্য বার্মিংহাম বয়েজের প্রভাবে পিকি ব্লাইন্ডারসের প্রভাবের সমাপ্তি হয়। টিভি সিরিজের মত না হলেও বাস্তবের পিকি ব্লাইন্ডারসরা ছিল আরো ভয়ানক এবং তাদের ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল টিভি সিরিজের চেয়েও লোমহর্ষক। তো কারা ছিল এই পিকি ব্লাইন্ডারস? আর কীভাবেই বা তাদের উথ্যান হল?

১৮৯০ এর অর্থনৈতিক মন্দায় বার্মিংহামের বস্তিতে কিছু স্ট্রীট গ্যাং-এর উথ্যান হয়। এর সদস্যরা ছিল ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সের এবং পকেটমারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, ছোটখাট চুরি এবং ডাকাতি করেই এরা নিজেদেরকে বার্মিংহামের অপরাধ জগতে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। ১৮৯০ এর শেষের দিকে এসব ছোটখাট স্ট্রীট গ্যাংগুলো একত্রিত এবং আরো সংগঠিত হয়ে গঠন করে পিকি ব্লাইন্ডারস। এদের নাম পিকি ব্লাইন্ডারস হওয়ার পিছনেও গল্প আছে। পিকি ব্লাইন্ডারস সদস্যদের মাথায় সবসময় ক্যাপ থাকত। এ ক্যাপের ভিতরে তারা সযত্নে রেজর ব্লেড রাখত। যেগুলো যুদ্ধের সময় শত্রুদের মাথার ভেইন কেটে তাদের অন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হত। শত্রুদের অন্ধ করার জন্যই এরা পিকি ব্লাইন্ডারস নামে পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু এই তত্ত্ব অনেক ইতিহাসবিদই মানতে নারাজ। কারণ তখনকার সময়ে এই রেজর ব্লেড ছিল বিলাসিতার বস্তু এবং কিছুটা দূর্লভ। তবে এই কারণ ছাড়া তাদের নামকরণের ইতিহাস সম্পর্কেজানা যায়নি। কিন্তু কি ছিল তাদের কার্যক্রম?

পিকি ব্লাইন্ডারসদের থেকেই ইংল্যান্ডে জেন্টেলম্যান গ্যাংস্টারদের উৎপত্তি ঘটে। পিকি ব্লাইন্ডারসদের নির্দিষ্ট ড্রেস কোড ছিল। তারা সব সময় দামী স্যুট, পিকড হ্যাট এবং লেদার সু পরতেন। তখনকার সময়ে গ্যাংস্টারদের এমন পোষাক পরিধান মোটামুটি বিরলই ছিল। সংগঠিত হবার পর ১৮৯০ সালে তারা প্রথম বার্মিংহামের একজন গ্যাংস্টারকে হত্যা করে এবং পত্রিকাগুলোতে চিঠি দিয়ে নিজেদের পিকি ব্লাইন্ডারস দাবি করেন। প্রথমদিকে, পিকি ব্লাইন্ডারসরা ছোটখাট চুরি, ছিনতাই করলেও পরবর্তীতে তারা আরো সংগঠিত হয়ে শুরু করে বেয়াইনি বুকমেকার বা জুয়া ব্যবসা। এভাবে পিকি ব্লাইন্ডারসদের ব্যবসার উন্নতি হতে থাকে। এর সঙ্গে তাদের কার্যকলাপে বড় ডাকাতি, চোরা চালান, ফ্রড, জমি দখল ও অন্যান্য অপরাধ যুক্ত হতে থাকে৷  

এভাবে তাদের প্রভাব বাড়তে থাকে এবং অন্য আরেকটি গ্যাং ‘দ্য স্লোগার্স’ নজরে আসে। ফলে তাদের মধ্যে এলাকা দখল নিয়ে লড়াই শুরু হয়। তখনই তারা প্রথম পুলিশের নজরে আসে এবং ঘুষ দিয়ে পিকি ব্লাইন্ডারসরা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক তাদের বেশি ঝামেলায় পড়তে হয় না। যদিও পিকি ব্লাইন্ডারসের অন্যতম সদস্য বেবি ফেইসড হ্যারি বা "হ্যারি ফলস", ডেভিড টেইলর এবং আর্নেস্ট হায়েনসকে একটি মোটরসাইকেল চুরির দায়ে এক মাস জেল খাটতে হয়েছিল। পিকি ব্লাইন্ডাসের অন্যতম শক্তিশালী সদস্য ছিল টমাস গিলবার্ট। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, তিনি ছিলেন পিকি ব্লাইন্ডারসদের নেতা। তবে এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি। পিকি ব্লাইন্ডারসদের ফ্যামিলি সম্পর্কে বেশি তথ্য জানা না গেলেও ব্লাইন্ডারসদের স্ত্রী ও গার্লফ্রেন্ডরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন এবং একইসঙ্গে তারাও পিকি ব্লাইন্ডারসদের অপরাধ জগৎ এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এভাবে পিকি ব্লাইন্ডারসরা মধ্য পশ্চিম ইংল্যান্ডে তাদের প্রতিপত্তি বিস্তার করে। ধীরে ধীরে তারা দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করে এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আসে।

পিকি ব্লাইন্ডারসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরানো গ্যাংগুলোর সঙ্গে তাদের দন্দ্ব বেড়ে যায়। দ্য স্লোগার্সের সঙ্গে তাদের দন্দ্ব কিছুটা কমলেও শুরু হয় দ্য সিজলার্সের সঙ্গে দন্দ্ব। পিকি ব্লাইন্ডারসরা এসব অপেক্ষাকৃত ছোট গ্যাংগুলোর সঙ্গে শত্রুতায় জড়ানোর মত ক্ষমতা থাকলেও বার্মিংহাম বয়েজের মত বড় রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন দলগুলোর সঙ্গে টক্কর দেয়ার মত ক্ষমতা তাদের ছিলনা। ১৯১০ সালে ব্রামাং বয়েজ ভেঙে গঠিত হয় দ্য বার্মিংহাম বয়েজ। এই গ্যাং এর নেতৃত্ত্ব দেয় ইংল্যান্ডের সর্বকালের সবথেকে ভয়ঙ্কর গ্যাংস্টার বিলি কিম্বার। ১৯৩০ সালের দিকে পিকি ব্লাইন্ডারসরা বার্মিংহামে রেসকোর্স ব্যবসায় ঢুকলে তাদের বার্মিংহাম বয়েজের সঙ্গে ভয়ঙ্কর কষাঘাত শুরু হয় যা পিকি ব্লাইন্ডারসদের সমাপ্তি ডেকে আনে। পিকি ব্লাইন্ডারস সদস্যরা বার্মিংহাম ত্যাগ করে। পরবর্তীতে তাদের জায়গা পূরণের জন্য বার্মিংহামে গঠিত হয় দ্য সিবানী গ্যাং। এরপর থেকে পিকি ব্লাইন্ডারস সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আজও বার্মিংহামে স্ট্রীট ক্রিমিনালদের পিকি ব্লাইন্ডারস বলা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস