.ঢাকা, শনিবার   ২৩ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ৯ ১৪২৫,   ১৬ রজব ১৪৪০

শারীরিক ওজন কমানোর যে ৮টি বিষয় আপনি জানেন না

খাদিজা তুল কুবরা

 প্রকাশিত: ১২:৩৫ ১০ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১৫:৪৭ ১০ আগস্ট ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

দেহের ওজন বেড়ে যাওয়া বা স্থূলতা অনেকের জীবনে একটা বড় সমস্যা। শারীরিক সুস্থতার জন্য সুগঠিত স্বাস্থ্য এর কোনো বিকল্প নেই। অতিরিক্ত শারীরিক ওজন তাই আমাদের কাছে দুশ্চিন্তা নিয়ে আসে এবং আমরা নানাভাবে এটা কমানোর চেষ্টা করি। 

যুক্তরাস্ট্রের সাউথ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শরীরবিদ্যা ও রোগতত্ত্ব‘ বিভাগের শিক্ষক স্টিভেন ব্লেয়ার গবেষণা করে বের করেছেন শারীরিক স্থূলতার নানারকম কারণ হতে পারে। এটা হরমোনজনিত কারণে হতে পারে। জীনগত সমস্যা, এমনকি ভাইরাসও আমাদের দেহের ওজন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। 

সাধারণ মানুষের একটা সাধারণ ভাবনা হলো, যদি কেউ কম খায় এবং পরিশ্রম বেশী করে তবে ওজন কমে যাবে। কিন্তু সত্যিকারভাবে দেখলে এটা ওজন কমাতে ওভাবে সাহায্য করেনা আসলে। স্টিভেন বলছেন, সাধারণ মানুষেরা এটাই ভাবে। আপনি হয়ত কোনো মোটা মানুষকে দেখে বললেন বোধহয় সে চেষ্টা করছেনা ওজন কমানোর। কিন্তু এটা সবসময় সত্যি নাও হতে পারে।

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেশকিছু কারণ বের হয়ে এসেছে শারীরিক স্থূলতার কারণ হিসেবে যেগুলো সম্পর্কে আমরা ভাবতেই পারিনা হয়ত। বিজ্ঞানীরা ৮ টি কারণের কথা বলছেন।

(১) জীনগত সমস্যা
বিজ্ঞানীরা ইঁদুর এর উপর গবেষণা করে পেয়েছিলেন একধরণের জীনের কারণে ইঁদুর স্থূলতায় আক্রান্ত হয়। তখন তারা এই জীনের নাম দিয়েছিলেন ‘ফ্যাটসো জীন’। কয়েকবছর পর বিজ্ঞানীরা মানব শরীরেও এই জীনের অস্তিত্ব খুঁজে পেলেন। যাদের শরীরে এই জীন আছে তাদের শারীরিক স্থূলতায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে এটা আজীবনের কোনো শাস্তি নয়। নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

(২) ‘ফ্যাট কোষ’ এর আধিক্য
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে কারো কারো শরীরে ফ্যাট কোষের পরিমাণ অন্যান্যদের থেকে দ্বিগুণ। যেটা তাদের স্থূলতার কারণ। যদি তারা শরীরচর্চার মাধ্যমে কিছু ওজন কমায়ও তারপরও এই ফ্যাট সেলে জমাকৃত চর্বি হ্রাস এতে পায়না। এবং ওজনও শেষ পর্যন্ত আর কমানো সম্ভব হয়না।

(৩) বিপাকীয় পরিবর্তন
গবেষণায় দেখা গেছে কম ওজনের মানুষের তুলনায় মোটা মানুষের বিপাকীয় সমস্যা বেশী হয়। যে কারণে শরীর স্বাভাবিক যে প্রক্রিয়ায় শরীরে জমে থাকা চর্বি পুড়িয়ে দেয় সেটা সম্ভব হয়না এবং এটা ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

(৪) দুশ্চিন্তা
হাজার হাজার বছর আগে মানুষের পূর্বপুরুষেরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতেন কখন? যখন খরা এগিয়ে আসতো অথবা শিকার করতে গিয়ে বাঘের সামনে পড়তে হতো। তখন এই বিপদজনক অবস্থায় শরীর টের পেত টিকে থাকতে হলে তার শক্তির প্রয়োজন। তখন স্ট্রেস হরমোনে সে শক্তি সঞ্চয় করত। 

ঠিক একইভাবে এখনো আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলে আমাদের স্ট্রেস হরমোনের কারণে চর্বি জমে যায় শরীরে। এ থেকে মুক্তির জন্য শরীরচর্চার পাশাপাশি মনকে শান্ত ও দুশ্চিন্তামুক্ত রাখা উচিত। নিয়মিত গান শোনা বা যোগাভ্যাস করা দুশ্চিন্তামুক্ত হবার একটা সমাধান হতে পারে।

(৫) গর্ভকালীন সমস্যা
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মা ধূমপায়ী হলে সন্তানের জন্মকালীন ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে যায়। কিংবা মা যদি এলকোহলিক হন সেটা গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকারক হয়। ঠিক একইভাবে গর্ভাবস্থায় মা যদি পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর খাবার না খেয়ে চর্বিযুক্ত খাবার বেশী খান সেটা সন্তানের শারীরিক স্থূলতার কারণ হয়। 

কারণ চর্বিযুক্ত খাবার খেলে এর ফ্যাট কোষগুলো গর্ভাশয়ে গিয়ে শিশুর শারীরবৃত্তিয় পরিনর্তন ঘটায় যেটা ভবিষ্যৎকালে শিশুর স্থূলতার জন্য দায়ী হয়।

(৬) ঘুম
সঠিক পরিমাণ ঘুম শারীরিক সুস্থতার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। গবেষণায় দেখা গেছে দৈনিক ৭-৮ ঘন্টার ঘুম আমাদের পরিপূর্ণ করে এবং ওজন কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু যদি আমরা ঘুমের পরিমাণ ঠিক না রাখি সেটা আমাদের দেহে একধরণের হরমোন নিঃসরিত করে এবং আমাদের ক্ষুধাবোধ তৈরি করে, যদিও আমরা ক্ষুধার্ত নাও থাকি। এর ফলে আমাদের ওজন বেড়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন ওজন কমানোর জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সহজ উপায় হলো পরিমিত ঘুমের অভ্যাস।

(৭) ভাইরাসজনিত কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন ভাইরাসের কারণে আমাদের দেহের ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে। আমাদের দেহের স্টেম সেলগুলো ভাইরাসের কারণে ফ্যাট সেলে রূপ নিতে পারে। এবং কিছু কিছু ভাইরাস আছে যেগুলো আমাদের দেহের ফ্যাট সেলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন হয়ত সামনে এই স্থূলতা সৃষ্টিকারী এসব ভাইরাসনিরোধক প্রতিষেধক তৈরি করা যাবে।

(৮) চর্বিযুক্ত খাদ্যে আসক্তি
সাধারণ খাবার এর প্রতি আমাদের আসক্তি কোকেইন বা এলকোহলের মত নয়। কিন্তু কিছু চর্বি জাতীয় খাবারের প্রতি আমাদের আসক্তি আছে। ফিলাডেলফিয়ার কেমিক্যাল সেন্স সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু চর্বিযুক্ত খাবারের ঘ্রাণ পেলে মানুষের মস্তিষ্কের যে স্নায়ু উত্তেজিত হয়, সেই একই স্নায়ু নানারকম নেশাদায়ক দ্রব্যের প্রতি উত্তেজিত হয়। চর্বিযুক্ত চকলেট, বিস্কুটের প্রতি আমাদের আকর্ষণ তাই শারীরিক ওজন বৃদ্ধির একটা কারণ।

আমাদের একটা সাধারণ ভাবনা হলো মোটা স্বাস্থ্য মানেই বাজে জিনিস। কিন্তু আশ্চর্যের কথা হলো বিজ্ঞানীরা বলছেন উচ্চ ওজন ও স্বাস্থ্য  নিয়েও সুস্বাস্থ্য এর অধিকারী হওয়া যায়। আমেরিকার ৫৫৪০ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষের উপর গবেষণায় দেখা গেছে ৫১ শতাংশ মানুষ উচ্চ শারীরিক ওজন সম্পন্ন। 

এদের মধ্যে ৩২ শতাংশ মানুষের কোলেস্টেরল, ব্লাড শুগার, রক্তচাপ নরমাল। এবং অন্যান্য শারীরিক পরিমাপও ভালো স্বাস্থ্য এর লক্ষণযুক্ত। আমেরিকাত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এর রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে যে ভালো স্বাস্থ্য এর জন্য সপ্তাহে অন্তত পাচ দিন ত্রিশ মিনিট করে শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করা খুব প্রয়োজনীয়। 

সুস্থতা আসলে অনেকসময় ওজনের উপর নির্ভর করে না। উচ্চ ওজনের একজন মানুষও তাই সুস্থ, স্বাভাবিক হতে পারেন এবং তার ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা ও অপেক্ষাকৃত কম থাকে। সুস্থ থাকতে হলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। একজন স্বাস্থ্যবান মানুষই পারেন জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস