Alexa শারদ প্রাতে দেবী দুর্গার আগমন  

ঢাকা, শনিবার   ১৯ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৩ ১৪২৬,   ১৯ সফর ১৪৪১

Akash

শারদ প্রাতে দেবী দুর্গার আগমন  

 প্রকাশিত: ১৮:২৬ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

'আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জি, ধরনীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা, প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত; জ্যোতির্ময়ী জগতমাতার আগমন বার্তা, আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি...’ সময় ভোর চারটে আট মিনিট। 

সালটা ১৯৪৪ বা ৪৫। আকাশবাণীতে শুরু হয়েছে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। সম্প্রতি রেডিও’র এই অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয়তার শিখর স্পর্শ করেছে। রচনা ও পরিচালনায় বানী কুমার, পাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, সঙ্গীত পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য পঙ্কজ কুমার মল্লিক। দুর্গাপুজোর আগে দেবীপক্ষের সূচনায় মহালয়ার ভোরে এই অনন্য অনুষ্ঠান। কিন্তু আজ যেন কণ্ঠটা একটু অন্যরকম লাগছে! পড়ছেন অসাধারণ। কিন্তু বীরেনবাবুর কণ্ঠ তো নয়। ঘটনাটি সত্যি। দেবী দুর্গার স্তোত্রপাঠ করছিলেন নাজির আহমদ। আকাশবাণীর আরেক শিল্পীকর্মী। ঢাকা থেকে কলকাতায় এসেছেন বদলি হয়ে। তখন রেকর্ডবাহিত নয়, লাইভ অনুষ্ঠান হত।

কবি শামসুর রহমানের লেখা থেকে জানা যায় (কোন বছরের ঘটনা কবি উল্লেখ করেননি), ‘…মহালয়ার দিন প্রত্যুষে আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠানের সূচনা হত স্তোত্রপাঠ দিয়ে। সেই স্তোত্রের অবধারিত পাঠক ছিলেন বীরেন ভদ্র। অন্য কেউ তার মতো স্তোত্র আবৃত্তি করতে পারতেন না। এক বার মহালয়ার স্তোত্রপাঠের নির্ধারিত সময়ে তিনি বেতারকেন্দ্রে আসতে পারেননি। রেডিওর অনুষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে প্রচার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। নাজির আহমদ জানালেন যদি কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেন তা হলে তিনি স্তোত্রপাঠ করতে পারেন। অনুমতি পাওয়া গেল। ঠিক সময়মাফিক মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে স্তোত্র আবৃত্তি করতে লাগলেন তার আবেগময় কণ্ঠস্বরে। এরইমধ্যে বীরেন ভদ্র এসে হাজির। তিনি দাঁড়িয়ে নাজির আহমদের স্তোত্রপাঠ শুনলেন নিবিষ্ট চিত্তে। কেউ কেউ নাজির আহমদকে থামানোর প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু বীরেন ভদ্র বারণ করলেন। কারণ তিনি একজন প্রকৃত গুণীর কদর করতে জানেন।’

কিন্তু ঘটনাটা প্রকাশ্যে আনা হয়নি। কেন? কারণ এই অনুষ্ঠানের শুরুতে কিছু রক্ষণশীল মানুষ, তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, এক অব্রাহ্মণ ব্যক্তির কণ্ঠে কেন চণ্ডীপাঠ শুনতে হবে? আরো একটি আপত্তি ছিল। মহালয়ার সকালে পিতৃপুরুষের তর্পণের আগেই কেন চণ্ডীপাঠ? বীরেনবাবুর স্তোত্রপাঠ নিয়ে বিতর্ক উঠতে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন বাণীকুমার, পঙ্কজ মল্লিক ও স্টেশন ডিরেক্টর নৃপেন্দ্র নাথ মজুমদার ও রাইচাঁদ ঘোষাল। এ নিয়ে ব্রাহ্মণেরা আর বেশি এগোন নি। তর্পণের আগে চণ্ডীপাঠ নিয়ে তারা বললেন যে এটা মন্দিরে পূজা হচ্ছে না। নিছক অনুষ্ঠান। কিন্তু নাজির আহমেদের স্তোত্রপাঠ নিয়ে পাঁচকান করে তারা বিতর্ক বাড়াতে চান নি। কিন্তু দেবী দুর্গার আবাহনে যে প্রথম মুসলমান সন্তান এগিয়ে এসেছিলেন তার নাম নাজির আহমেদ। ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন- এর প্রথম বাংলা অনুবাদক জন্মসূত্রে হিন্দু ও পরে ব্রাহ্ম ভাই গিরিশচন্দ্র সেনকে যেমন বাঙালি মুসলমানের ধর্মচর্চার ভগীরথ বলা হয় তেমনই এই নাজির আহমেদের কণ্ঠেই সেই বছর দেবীর আগমনবার্তা ধ্বনিত হয়েছিল।

কিন্তু কে এই নাজির আহমেদ? এককথায় তিনি অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, বেতারকর্মী, লেখক। ১৯২৫ সালে ঢাকার ইসলামপুরের আশেক লেনে বিখ্যাত মীর্জা পরিবারে তার জন্ম। পিতা মীর্জা ফকির মোহাম্মদ ছিলেন একজন ব্যবসায়ী; তবে অবসর সময়ে তিনি সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চা করতেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতি শিল্পী হামিদুর রহমান ছিলেন তার অনুজ। নাজির আহমেদ প্রথমে ঢাকার হাম্মাদিয়া মাদরাসায় লেখাপড়া করেন। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৯৩৮), জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি (১৯৪২) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাস করেন। ছাত্রাবস্থায়ই নাজির আহমেদ মহল্লা, স্কুল ও কলেজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, বিশেষ করে নাট্যাভিনয়ে অংশগ্রহণ করতেন। ১৯৩৯ সালে ঢাকায় বেতার কেন্দ্র চালু হলে শিল্পী হিসেবে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে তিনি আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে প্রথম মুসলমান ঘোষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৬ সালে ঢাকায় ফিরে তিনি বেতার কেন্দ্রে যোগ দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রযোজনা, গ্রন্থনা ও পরিবেশনার দায়িত্ব পালন করেন এবং নাটক, জীবন্তিকা, গান ও কবিতা রচনা করেন। তাঁর রচিত একটি গান ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ পাকিস্তানের বিকল্প জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছিল।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলে রাত বারোটার পর তিনিই প্রথম ঘোষণা করেন ‘পাকিস্তান ব্রডকাস্টিং সার্ভিস, ঢাকা’। দেশভাগের ফলে তখন বেতারে যে নানামুখী শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল তা পূরণের ক্ষেত্রে নাজীর আহমদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ববঙ্গ সফর উপলক্ষে প্রথম প্রামাণ্য চিত্র ইন আওয়ার মিডস্ট তিনিই তৈরি করেন। তিনি ১৯৪৯ সালে লন্ডনে ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশনে (বিবিসি) যোগ দেন এবং বাংলাভাষীদের জন্য প্রথম বাংলা অনুষ্ঠান ‘আঞ্জুমান’ চালু করেন। ১৯৫৩ সালে ঢাকায় ফিরে তিনি পূর্ববঙ্গ জনসংযোগ বিভাগের অধীনে চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান হিসেবে ফিল্ম স্টুডিও ল্যাবরেটরি তৈরির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে তাঁর নির্মিত ‘সালামত’ প্রামাণ্য চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ১৯৫৫ সালে নাজির আহমেদের উদ্যোগে ঢাকায় প্রথম ফিল্ম ল্যাবরেটরি ও স্টুডিও প্রবর্তিত হয় এবং তিনি চাকা, কর্ণফুলি, পূর্ব পাকিস্তানের প্রবেশপথ সহ কয়েকটি প্রামাণ্য চিত্র প্রযোজনা করেন। ১৯৫৭ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তার প্রথম নির্বাহী পরিচালক হন। ফতেহ লোহানীর আসিয়া (১৯৬০) চলচ্চিত্রের কাহিনীকার, নবারুণ (১৯৬০) প্রামাণ্য চিত্র ও নতুন দিগন্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন নাজির আহমেদ । ১৯৬২ সালে ঢাকা ছেড়ে তিনি কয়েক বছর জার্মানি, করাচি ও লন্ডনে বসবাস করেন। ১৯৬৫-৬৭ সময়ে পুনরায় দুবছর বিবিসিতে কাজ করার পর তিনি লন্ডনে প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক: চন্দ্রগুপ্ত, সাজাহান, সিরাজুদ্দৌলা, তটিনীর বিচার, নার্সিংহোম, টিপু সুলতান প্রভৃতি এবং বেতারনাটক: আলীবাবা, বেদের মেয়ে, চেঙ্গিস খাঁ, অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেটরা, ইডিপাস রেক্স, এন্টিগোনি, টেম্পেস্ট প্রভৃতি। উল্লেখ্য যে, চেঙ্গিস খাঁ নাটকটি তারই রচনা। তিনি ১৯৮৩ সালে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার’ লাভ করেন। ১৯৯০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে তাঁর মৃত্যু হয়। তার সম্মানে বিএফডিসি-র সাউন্ড কমপ্লেক্সের নামকরণ করা হয়।  

নাজির আহমদের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি শামসুর রহমান জানাচ্ছেন, ‘… যারা আকাশবাণী কলকাতার আরেকটি বিশেষ অনুষ্ঠান শুনেছিলেন বহু বছর আগে তারা আজও স্মরণ করেন ‘কচ ও দেবযানী’র কথা। সেই সংলাপকাব্য নাজির আহমদ এবং নীলিমা সেনের কণ্ঠে এমনই জীবন্ত হয়ে উঠেছিল যে, যদি রবীন্দ্রনাথ শুনতেন, তা হলে তিনিও সাধুবাদ জানাতেন…’।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র নিজে একবার ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় মহিষাসুরমর্দিনী প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, এ যেন স্বয়ং মহামায়া এসে হিন্দু-মসুলমান শিল্পীদের মিলিত প্রচেষ্টায় সুরবৈচিত্র্যের এক সঙ্গম স্থাপন করে দিয়ে গিয়েছিলেন আড়াল থেকে।

আকাশবাণীর জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠানটির যন্ত্রানুষঙ্গে আকাশবাণী কলকাতার মুসলমান শিল্পীদের অবদান স্মরণীয়। অনুষ্ঠানে সারেঙ্গি বাজিয়েছেন মুনশি, চেলো বাজান তাঁর ভাই আলি, হারমোনিয়ামে ছিলেন খুশি মহম্মদ। এ ছাড়াও আকাশবাণীর আরও কয়েক জন নিয়মিত মুসলমান বাদক ছিলেন মহিষাসুরমর্দিনীর নেপথ্য শিল্পী। পরে দেশভাগ হয়েছে। শিল্পীদের যাওয়া আসা ঘটেছে। কিন্তু অনুষ্ঠান ভাগ হয় নি কখনও বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে। ভাগ হয় নি শ্রোতারাও। তবে আগে দেবী দুর্গার আগমনীর সাথে আগে ফজরের নমাজের আজান মিশে যেত। এখন আর যায় না। তাই আমার মা শোনেন আর বলেন – হইল না, এর লগে ফজরের আজানের সুর তো মিশা গেল কৈ? নয় বছর বয়েসে দেশছাড়া এখন চুরাশি বছরের আমার মা। তিনি এখনও শুনতে চান মাতৃবন্দনার সাথে - আল্লাহু আকবার আশহাদু-আল লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ আশহাদু-আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ হাইয়া আলাস সালা। যার সাথে একই সুরে ধ্বনিত হত - যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃ রূপেন সংস্থিতা।/ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ। দায়িত্ব আজ নতুন প্রজন্মের। ফের ফিরে আসুক দ্বৈত আহবান। ধর্ম হোক যার যার উৎসব হোক সবার।

(তথ্য ঋণস্বীকারঃ তপন রায় চৌধুরী ও অনুপম হায়াৎ)

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর