Exim Bank Ltd.
ঢাকা, বুধবার ২৪ অক্টোবর, ২০১৮, ৯ কার্তিক ১৪২৫

শান্তিতে নোবেল পুরস্কার...

মেহেদী হাসান শান্তডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার...
ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানি কিশোরী মালালা ইউসুফজাই, তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামা, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের পথিকৃৎ মার্টিন লুথার কিং কিংবা ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থার উদ্ভাবক ড মুহাম্মদ ইউনুস। এরা সবাই নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। এ বছর এ সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছেন যৌন সহিংসতা ও হয়রানিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বন্ধে আওয়াজ তোলা ২৫ বছর বয়সী নাদিয়া মুরাদ এবং কঙ্গোর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডেনিস মাকওয়েজি। আসলে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের ব্যাপারটিই এ রকম, যদি বলতে বলা হয় গত বছর পদার্থবিজ্ঞানে অথবা রসায়নে কারা নোবেল পেয়েছিলেন; খুব বেশি খোঁজ খবর না রাখলে আপনার পক্ষে উত্তরটা দেয়া বেশ কঠিনই হবে বোধ করি। কিন্তু নোবেল শান্তি পুরস্কারের বেলায় কিন্তু এমন প্রশ্নের উত্তর করা বেশ সহজ। আর্তমানবতার সেবায়, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে অথবা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ বা মারণাস্ত্রমুক্ত পৃথিবী গড়ার কান্ডারি- এ ধরনের কাজের জন্য সারা বছর পত্রিকা বা টেলিভিশনের খবর হন, তাদের মধ্যে থেকেই কাউকে এই সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসটা জানতে হলে যেতে হবে সেই উনবিংশ শতকে। ১৮৬৬ সালে সুইডিশ রসায়নবিদ আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিস্কার করে বিশ্বে হইচই ফেলে দেন। একজন সফল উদ্ভাবক ও ব্যবসায়ী হিসেবে তার পথ চলা শুরু তখনই। ৩০ বছরের ব্যবসায়ী জীবনে তার সম্পদের পরিমাণ পাহাড়সম। ২০টি দেশে তার প্রতিষ্ঠিত কারখানা ৯২টি। এছাড়া ছোট বড় মোট ৩৫৫টি আবিষ্কারের পেটেন্টও আলফ্রেড নোবেলের নামে! কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ, বিয়ে করেননি। তাই বিপুল সম্পদের কোনো উত্তরাধিকারী ছিল না। মৃত্যুর পর যখন উইল খোলা হয় তখন সবাই বেশ চমকে যান। সেই উইলে লেখা, নোবেলের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি পাঁচটি বিশেষ ক্ষেত্রে অবদান রাখা কৃতি মানুষদের পুরস্কার প্রদানের জন্য ব্যয় করা হবে। এই ক্ষেত্রগুলো পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তি। জীবনভর বিজ্ঞানের সাধনায় নিয়োজিত নোবেলের উইল যেন তার বিজ্ঞানপ্রীতির দৃষ্টান্ত। এছাড়া ইতিহাস থেকে জানা যায় নোবেল ছিলেন প্রচণ্ড সাহিত্য অনুরাগী। কিন্তু শান্তিতে অবদানের জন্য তিনি কেনো আলাদা একটি ক্ষেত্র রাখতে চাইলেন?

আগেই উল্লেখ করেছি, ডিনামাইট আবিষ্কার নোবেলের সবচেয়ে বড় কীর্তি এবং এর মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যুদ্ধক্ষেত্রে ডিনামাইটের ব্যবহার বাড়তেই থাকে। অগণিত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় আলফ্রেড নোবেলের এই উদ্ভাবন। তাই অনেকেরই ধারণা, অপরাধবোধের কারণেই শান্তিতে অবদান রাখা মানুষদের সম্মানিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু এটি নিতান্তই জনশ্রুতি মাত্র, নিজে কখনো এ রকম বক্তব্য বা মনোভাব ব্যক্ত করেছেন বলে জানা যায় না। অনেক ঐতিহাসিকের মতে নোবেলের শান্তিতে পুরস্কার প্রচলনের পেছনে অস্ট্রিয়ান বন্ধু বার্থা ফন সুটনারের ভূমিকা রয়েছে। বার্থা ফন সুটনার ওই সময়ের বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের একজন অগ্রদূত। ১৯০৫ সালে নোবেলের মৃত্যুর পর বার্থাই সর্বপ্রথম শান্তিতে নোবেল জয়ী।

আলফ্রেড নোবেলের উইলে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তিনটি শর্ত আছে। প্রথমটি, অন্য পুরস্কারগুলো সুইডেন থেকে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ থাকলেও শুধুমাত্র নোবেল শান্তি পুরস্কার নরওয়ে থেকে ঘোষিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে। দ্বিতীয়ত, নিরস্ত্রীকরণ, শান্তি সম্মেলন ও জাতিতে জাতিতে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার যারা অবদান রেখেছেন তাদেরকেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়া যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে মানবাধিকার ও সমঝোতাসহ শান্তি প্রতিষ্ঠায় অন্যান্য অবদানের জন্য নোবেল দেয়ার বিধি চালু হয়। তৃতীয়ত নোবেল শান্তি পুরস্কার শুধু যে একজনই পাবেন, এমন কোন বিধি নিষেধ নেই। এখন পর্যন্ত প্রদত্ত মোট নোবেল শান্তি পুরস্কার গুলোর এক-তৃতীয়াংশই দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ভাগাভাগি করে দেয়া হয়েছে।

এখন আসি যারা শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন প্রদান করেন তাদের কথায়। নোবেল ফাউন্ডেশন এর মতে, কোনো দেশের সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক আদালতের কোনো সদস্য অথবা কোনো দেশের সরকার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য নাম প্রস্তাব করতে পারেন। এ ছাড়া বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, আইন ও যুক্তিবিদ্যার অধ্যাপকগণ এবং পূর্বের নোবেল শান্তি বিজয়ীরাও এ পুরস্কারের জন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়ার ক্ষমতা রাখেন। যদি জানতে চান এ বছর নাদিয়া মুরাদ ও ডেনিস মাকওয়েজির সঙ্গে আর কারা মনোনয়ন পেয়েছিলেন, সেজন্য কিন্তু সুদীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। কারণ নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য প্রাথমিক মনোনয়নের সংখ্যাটি পাওয়া গেলেও সর্বশেষ বাছাইয়ের তালিকাটি এবং পুরস্কারপ্রাপ্তদের কে কে মনোনীত করেছেন সেই নামগুলো তো অবশ্যই গোপন রাখার নিয়ম! এ কারণেই ১৯৬৪ সালে নোবেল বিজয়ী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে কারা মনোনীত করেছিলেন এই আলোচিত প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০১৪ সাল পর্যন্ত!

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য সর্বোচ্চ কতবার মনোনীত হতে পারবেন এমন কোন বাঁধা ধরা নিয়ম নেই। যুক্তরাষ্ট্রে সোশ্যাল ওয়ার্ক ধারণার প্রণেতা জেন অ্যাডামস নোবেল পাওয়ার আগে মোট ৯১ বার মনোনয়ন পেয়েছনে বলে জানা যায়! মৃত্যু পরবর্তী কাউকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার নিয়ম নেই। যদিও ১৯৬১ জাতিসংঘ মহাসচিব ড্যাগ হ্যামারহোল্ডের জন্য নিয়মটি শিথিল করা হয়। বিমান দূর্ঘটনা নিহত হওয়ার পর তিনি মরণোত্তর নোবেলে ভূষিত হন। গান্ধীর মৃত্যুর স্মরণে ১৯৪৮ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়নি। এই অবস্থাটিকে 'মিসিং লরিয়েট' বলে।

নরওয়ের নোবেল কমিটির মনোনীত পাঁচ সদস্যের একটি জুরি বোর্ড প্রায় এক বছর সময় নিয়ে চূড়ান্ত নোবেল শান্তি বিজয়ীকে মনোনীত করেন। পুরো মনোনয়ন প্রথা সম্পূর্ণরূপে গোপন রাখা হয়। জুরি বোর্ডের কেউ অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মনোনীতদের সংখ্যা তিন শতাধিক হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। জুরি বোর্ড সকল মনোনীত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডগুলো বিশ্লেষণ করে একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করেন। সেখান থেকেই চূড়ান্ত বিজয়ীকে নির্ধারণ করা হয়। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান প্রতি বছর অক্টোবর মাসে এই বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি করা হয় প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর। আলফ্রেড নোবেল এই তারিখেই মৃত্যুবরণ করেন। পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয় একটি সোনার মেডেল যাতে ল্যাটিন বাক্যে খোদাই করা "মানব জাতির শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের জন্য"। এছাড়াও দেয়া হয় একটি ডিপ্লোমা এবং একটি নির্দিষ্ট অর্থ পুরস্কার, যার পরিমাণ বর্তমানে ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার বা ১০ লাখ ডলার। যদি একের অধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নোবেল পান তবে পুরস্কারের অর্থ ভাগ করে দেয়া হয়। বিজয়ীরা অর্থ ইচ্ছা মত খরচ করার অধিকার পেয়ে থাকেন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে নোবেল পিস লরিয়েট রা তাদের প্রাপ্ত অর্থ কোনো মানব কল্যাণ প্রতিষ্ঠানে বা সামাজিক কর্মকাণ্ডে দান করে দেন।

বহু বছর কেবলমাত্র ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকার পুরুষরাই শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নে প্রাধান্য পেতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই রীতিতে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার এখন অনেকটাই বৈশ্বিক। এ পর্যন্ত সর্বমোট ২৩টি প্রতিষ্ঠান এবং ১০৩ জন ব্যক্তি শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন যাদের মধ্যে ৮৭ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী। এদের মধ্যে আছেন ডেসমন্ড টুটু, যিনি দক্ষিণ আফ্রিকার যুগ যুগ ধরে চলমান জাতি-বিদ্বেষ এর বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন শুরু করেন। মার্টিন আন্টিসারী, যিনি নামিবিয়া, কসোভো ও ইন্দোনেশিয়ায় দাঙ্গা রোধে কাজ করেছেন। আরো আছে বিশ্বজুড়ে রাসায়নিক হামলা প্রতিরোধে কাজ করা আইকানের মতো প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে বিশ্বব্যাপী শান্তির ঝান্ডাবাহীদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/এসজেড

আরোও পড়ুন
সর্বাধিক পঠিত
নোবেলের সঙ্গে যা করতে চান মোনালি
নোবেলের সঙ্গে যা করতে চান মোনালি
আজো হিমঘরে সন্তানের প্রতীক্ষায় ‘বাবা’!
আজো হিমঘরে সন্তানের প্রতীক্ষায় ‘বাবা’!
আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন
আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সময়সূচি
প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সময়সূচি
‘গোপন বিয়ে’ মুখ খুললেন রোদেলা
‘গোপন বিয়ে’ মুখ খুললেন রোদেলা
না ফেরার দেশে সালমানের ‘শেষ প্রেমিকা’
না ফেরার দেশে সালমানের ‘শেষ প্রেমিকা’
তুরস্কে দূতাবাস থেকে হেঁটে বেড়োলেন খাশোগি!
তুরস্কে দূতাবাস থেকে হেঁটে বেড়োলেন খাশোগি!
যেভাবে প্রথম বুবলীর ‘ভাই’
যেভাবে প্রথম বুবলীর ‘ভাই’
স্ত্রী ফিরে দেখে বাসায় অন্য নারী!
স্ত্রী ফিরে দেখে বাসায় অন্য নারী!
অনেকেই সাবান জমান কেউ গোসলই করেন না!
অনেকেই সাবান জমান কেউ গোসলই করেন না!
আর নিজেকে ‘কুমারী’ দাবির সুযোগ নেই দীপিকার!
আর নিজেকে ‘কুমারী’ দাবির সুযোগ নেই দীপিকার!
মৃত্যুর আগে কোথায় ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু?
মৃত্যুর আগে কোথায় ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু?
ধর্ষণ থেকে বাঁচতে ঝাঁপ দিল তরুণী, অতঃপর...
ধর্ষণ থেকে বাঁচতে ঝাঁপ দিল তরুণী, অতঃপর...
কাদের ওপর চটেছেন জেমস?
কাদের ওপর চটেছেন জেমস?
তারেককে ধ্বংসে ড. কামাল ইন: মইনুল
তারেককে ধ্বংসে ড. কামাল ইন: মইনুল
এক উঠোনে মসজিদ-মন্দির, প্রার্থনায় নেই বিবাদ
এক উঠোনে মসজিদ-মন্দির, প্রার্থনায় নেই বিবাদ
দুলাভাইয়ের কাছে শ্যালিকার আবদার!
দুলাভাইয়ের কাছে শ্যালিকার আবদার!
এবার মেয়েকে নিয়ে মারাত্মক কথা বললেন ঐশ্বরিয়া!
এবার মেয়েকে নিয়ে মারাত্মক কথা বললেন ঐশ্বরিয়া!
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাচ্চুর ৬০টি গিটার!
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাচ্চুর ৬০টি গিটার!
বন্ধুর ‘অকাল প্রয়াণে’ যা বললেন হাসান
বন্ধুর ‘অকাল প্রয়াণে’ যা বললেন হাসান
শিরোনাম:
ঐক্যফ্রন্টের জনসভা ঘিরে বিএনপির ১০ নেতা আটক ঐক্যফ্রন্টের জনসভা ঘিরে বিএনপির ১০ নেতা আটক