Alexa শহীদ স্বামীর কবর সংরক্ষণ চান তাজিয়া খাতুন

ঢাকা, সোমবার   ১৯ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৪ ১৪২৬,   ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

শহীদ স্বামীর কবর সংরক্ষণ চান তাজিয়া খাতুন

 প্রকাশিত: ০৯:৫০ ২৮ এপ্রিল ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বীর নারী তাজিয়া খাতুন। পিতা নিজাম উদ্দিন। মাতা আইনবী। পিতা-মাতার তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। চাঁদপুর জেলার সাচার উপজেলার আইনপুর গ্রামে জন্ম।৬০-র দশকের শুরুর দিকে কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার দক্ষিণ দোল্লাই নবাবপুর ইউনিয়নের বিচুন্দাইর গ্রামের  বিআরটিসিতে চাকরি করা ফুল মিয়ার সঙ্গে অল্প বয়সেই তার বিয়ে হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তিনি ২ ছেলে ও ২ মেয়ের জননী হন।

বীর নারী তাজিয়া খাতুন ১৯৭১ সালে যে শুধু নিজের সতীত্ব, জীবনের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না-বান্না করেছেন তা নয়, হারিয়েছেন প্রিয়তম স্বামীকেও। এই বীর নারী তাজিয়া খাতুন-শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুল মিয়ার সাহসী স্ত্রীও।সেই থেকে আজো তিনি বিধবা হয়েই বেঁচে আছেন। বয়সের ভারে ন্যূজ এ নারী ঠিকমত কথা বলতে পারেন না, আবার ভালোভাবে কানেও শেনেন না।

যখনি মুক্তিযুদ্ধের কথা উঠে এসেছে তখনি তার চোখ মুখে দুঃখ-বেদনার  মানচিত্র ফুটে উঠেছে। পুত্রবধূ ও দুই নাতির সহায়তা নিয়ে জানালেন ’৭১-এ তার ওপর ঘটে যাওয়া নির্মম কাহিনী।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী হিসেবে তাজিয়া খাতুনকে বীরনারী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। পাশাপাশি তাকে চান্দিনা উপজেলার বিচনাদাইর মৌজার ১ নং খতিয়ানের ৯৭৯ নং দাগে ৫ শতক জমিও দিয়েছেন।

স্বামী ফুল মিয়া অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। তিনি যে শুধু নিজে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তাই নয়, স্ত্রী তাজিয়া খাতুনকে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বহুদিন খাবার রান্না করিয়েছেন। এ সব রিপোর্ট চলে যায় স্থানীয় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। তাই রাজাকারদের সহায়তায় এক দিন স্বামী ফুল মিয়াকে ধরে বাড়ির কাছেই বুলেটবিদ্ধ করে হত্যা করে। বিধবা হন তাজিয়া খাতুন। তাজিয়া খাতুন একদিকে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুল মিয়ার স্ত্রী, অপর দিকে তিনি নিজেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী। মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায়তাকারী এ দুই পরিচয় নিয়ে তার দাবী, স্বামী মুক্তিযোদ্ধা ফুল মিয়ার কবরটি যেন সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা ফুল মিয়ার স্ত্রী তাজিয়া খাতুনের কথা জানতে চাইতেই তার স্বামীর বাড়ির বিচুন্দাইর গ্রামের ৭৫ বছর বয়সি বৃদ্ধ আবুল কাশেমের চোখ ছল ছল করে ওঠে। জানালেন, শহীদ ফুল মিয়া অনেক সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। বাড়ি থেকে ধরে এনে বটতলায় প্রকাশ্যে, দিনের বেলায় পাকিস্তানি বাহিনী মেরে ফেলে ফুল মিয়াকে। তাকে মারার পিছনে স্থানীয় রাজাকারদেরও সহায়তা ছিল বলে জানালেন তিনি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের ঘটনা মনে আছে কি না জানতে চাইলে বয়সের ভারে ন্যূজ তাজিয়া খাতুন একবার ছেলের স্ত্রীর দিকে আরেকবার নাতির দিকে তাকান। পরক্ষণে কি মনে করে কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। মিনিট ২-১ পর মাথা তুলে বলেন,  এগুলো মনে করে এখন আর কি হবে? এই যুদ্ধে আমি আমার স্বামী হারিয়েছি, অল্প বয়সে বিধবা হয়েছি। আমার স্বামী বিআরটিসিতে  চাকরি করতেন। ছুটি নিয়ে বাড়ি এসে আর চাকরিতে ফিরে যান নি।  যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তার অনেক সাহস ছিল, শরীরে শক্তিও ছিল। মাঝে মাঝে আমার কাছে ডিম, ডাল, চাউল কিনে পাঠাতেন। বলতেন, কষ্ট হবে জানি, তারপরও নিজেদের রান্নার পর অতিরিক্ত হিসেবে এগুলোও রান্না করে দিও। নতুবা আমার সহকর্মীরা না খেয়ে থাকবে।

কখনো কখনো নিজের ঘরের ডিম, মুরগী রান্না করে মুক্তিযোদ্ধাদের খাইয়েছি। ছেলে-মেয়েগুলো ছোট ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না করতে গিয়ে অনেক সময় সন্তানদেরও খোঁজ নিতে পারিনি। স্বামী ৭-৮ দিন পরপর বাড়ি আসতেন। কখনো কখনো রান্না করে রাখতাম। লোক এসে নিয়ে যেত।

একদিন দুপুর বেলা স্বামী ঘরে আসছিলেন।  খবর পেয়ে পাক আর্মিরা এসে স্বামীকে ধরে বটতলায় নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। আমাকেও নির্যাতন করে। এ পর্যায়ে এসে কথা থেমে যায় তাজিয়া খাতুনের।

এরপর তাজিয়া খাতুন হঠাৎ করে বলে উঠলেন,  যে দেশের জন্য আমার স্বামী জীবন দিল, আমি বিধবা হলাম, সেই দেশ, সরকার আজো আমার স্বামীর কবরটি সংরক্ষণ করে নি। জেলা প্রশাসক আমাকে জমি দিয়েছে, সম্মান জানিয়েছে ভাল কথা, এতে আমরা খুশি। কিন্তু আমার এখন একটাই দাবি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার স্বামীর কবরটি সংরক্ষণ করা হোক। যাতে কবরের সামনে দিয়ে যখন মানুষ চলাচল করবে তখন যেন বলতে পারে এটি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফুল মিয়ার কবর। যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। সরকারের কাছে আমার শেষ জীবনে এই একটি মাত্র চাওয়া।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ

Best Electronics
Best Electronics