Alexa শপথ সময়ের...

ঢাকা, বুধবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৩ ১৪২৬,   ১৮ মুহররম ১৪৪১

Akash

শপথ সময়ের...

হাবীবুল্লাহ সিরাজ

 প্রকাশিত: ২১:০৭ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ২১:০৭ ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সময় জীবনের চেয়ে দামি। কতগুলো সময়ের সমষ্টি হলো জীবন। সময় আর জীবনের হিসাব এক ও অভিন্ন। 

সময়ের মেহনত জীবনের মেহনত। সময় দৃশ্যমান বস্তু নয়, অদৃশ্য তবে সফলতা আর ব্যর্থতার গল্পে সময় জড়িত ওতপ্রোতভাবে।  

জীবনের চাকা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঘুরবে। যে সফল সে ততোটুকু সময়ই বাঁচবে যতটুকু সময় তার জীবনের মাঝে ছিল, যে ব্যর্থ সে-ও ততটুকু সময় পর্যন্ত বাঁচবে যতটুকু সময় তার জীবনের মাঝে ছিল। 

হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন- হে মানুষ! তুমিতো দিনের সমষ্টি। একটি দিন বা মুহূর্ত চলে যাওয়ার অর্থ তোমার জীবন সমষ্টির একটি অংশ শেষ হয়ে যাওয়া। একথা দিবাকরের মতো পরিষ্কার- মুহূর্ত বা দিনের গত হওয়া মানে মানুষ ছোট হওয়া। 

কোনো লেখক সময়ের উদাহরণ দিয়েছিল বাতাসে রাখা বরফের দ্বারা। বাতাসে রাখা বরফ দ্বারা; কাছে নিলেও গলবে, না নিলেও গলবে। এখন যে তার দ্বারা উপকার নিতে চায় তার উচিৎ যতদ্রুত সম্ভব উপকার নিয়ে নেওয়া। যত সময় দেরি করবে বরফ গলে গলে শেষ হয়ে যাবে।

পৃথিবীর বুকে যারা সময়ের পর সময়ে যুগের পর যুগে শতাব্দির পর শতাব্দিতে খ্যাতি ও সফলতার গল্প এঁকেছেন; তাদের সবাই সময় নামক বরফকে নিঃশেষিত হবার আগেই কাজে লাগিয়েছেন। আবার এই সময়কে অপচয় করে কতো মানুষ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে; তার সঠিক হিসাব পৃথিবীও রাখেনি। 

বুঝা গেল, সফল আর ব্যর্থতার মূল উপাদান হলো সময়ের সঠিক ব্যবহার। সময়ের মূল্যায়ন শুধু আমাদের কথাবার্তায় নয় আমাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতেও আছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। 
কোরআন ঘোষণা করছে-
 
وَالْعَصْرِ () إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ () إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ()  

তরজমা : শপথ সময়ের! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মাঝে রয়েছে; তবে তারা নয় যারা ঈমান এনেছে আমলে সাহেল করেছে এবং অন্যকে সত্যের উপদেশ ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে। (সূরা আসর)

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাক জীবনীতেও পাই সময়কে মূল্যায়ন করার মহাব্রত। নবীজি (সা.) সময়কে কিভাবে নিতেন এর সাধারণ একটি উদাহরণ এই দোয়াটি, যা তিনি প্রতিদিন সকালে পড়তেন-

 عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى ، قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، إِذَا أَصْبَحَ ، قَالَ : اللَّهُمَّ اجْعَلْ أَوَّلَ يَوْمِي صَلاحًا ، وَأَوْسَطَهُ فَلاحًا ، وَآخِرَهُ نَجَاحًا ، أَسْأَلُكَ خَيْرَ الدُّنْيَا والْآخِرَةِ ، يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ " .

তরজমা : হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা রায়িআল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ যখন সকালে ঘুম থেকে উঠতেন তখন এই দোয়া পাঠ করতেন, যার অর্থ : হে আল্লাহ আজ দিনের প্রথমাংশকে আমার জন্য উপকারী করুন, দিনের মধ্যাংশকে আমার জন্য সফল করুন, দিনের শেষাংশকে আমার জন্য শুভ করুন। (মুসান্নাফে আবী শাইবা) এই হাদীস দ্বারা বুঝতে পারলাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে দিনের প্রতি অংশকে মূল্যায়ন করতেন। এর জন্য নিয়মিত দোয়া পাঠ করতেন। 

আজকে আমাদের যুবসমাজকে সময় অপচয়ের রোগে গ্রাস করে নিয়েছে। এই রোগ এখন মরণব্যাধি ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। কনো ভাবেই এই ব্যাধি থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা যাচ্ছেনা। কেউ জেনে, কেউ না জেনে এই ব্যাধিতে আক্রান্ত। এই ব্যাধি যদি আমরা এখনই রোধ করতে না পারি, তাহলে আমাদের পুরো সমাজব্যবস্থার অস্তিত্ব ধ্বংসের মুখে পড়বে। আস্তে আস্তে এই মরণব্যাধি ক্যান্সার- শিশু, কিশোর-কিশোরী, শিক্ষক-শিক্ষাঙ্গন, মসজিদ-মাদরাসা ও ইবাদতখানায় প্রবেশ করেছে। ফলে অবক্ষয়ের কাল শুরু হয়ে গেছে। 

আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম, যাদের হাতে দেশ ও দশের ভাগ্য তারাই আজ জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে অযথা অকর্ম ও অর্থহীন কাজে। ফেইসবুক টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আজ সময় কাটানো আর জীবন নষ্টের উদাহরণ। সময় অপচয়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থের অপচয় মেধার অপচয় অন্যদের অপচয়ও এর সঙ্গে জড়িত। এই বিষয়ে এখনই দেশ নেতৃবন্দের উচিৎ, এখনই লাগাম টানা, এগুলো নিয়ন্ত্রণ করুন। তাহলে জাতি নিয়ন্ত্রিত হবে। 

আমাদের প্রিয়নবী (সা.) এই সব বিষয়ে চিন্তা-ফিকির করে পুরো জাতির উদ্দেশ্যে একটি পরামর্শ দিয়েছেন। হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে, পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয় আগমনের আগে গনিমত মনে করো; বার্ধক্যের আগে যৌবনকে, অসুস্থতার আগে সুস্থতাকে, দরিদ্রতার আগে সচ্ছলতাকে, কর্মব্যস্ততার আগে অবকাশকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা) 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সতর্কবাণী পুঙ্খানুপুঙ্খ আমলে নিয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম। ফলে তাদের জীবন হয়েছে বারিত ও মানিত, স্মরিত ও দ্যোতিত। দুনিয়া তাদের মাথায় পড়িয়েছে সফলতার রাজমুকুট। পেয়েছেন  সন্তুষ্টির সার্টিফিকেট ‘রাযিআল্লাহ ওরাযুআনহু’ এর মতো পৃথিবী সেরা গৌরব। ওই সব ভাগ্যবান মানুষের প্রথম কাতারের একজন হলেন হজরত আবু বকর ছিদ্দিক রাযিআল্লাহ আনহু। তিনি সময়কে গুরুত্ব দিয়ে কি বলেছেন, শুনুন- “সময়ের চক্র যদিও বিস্ময় কিন্তু মানুষের আলসেমি আরো বেশি বিস্ময়।” 

মানুষের উচিত তার জীবন থেকে চলে যাওয়া ওই অতীত দিনের জন্য আফসোস করা, যে দিনটিতে তার কোনো নেক আমল করা হয়নি। আরেক তারকা পুরুষ হলেন হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযিআল্লাহ আনহু। তিনি বলেন- “আমার কাছে অসহ্য লাগে যখন কোনো লোককে দেখি যে, সে দ্বীনের কাজেও ব্যস্ত না দুনিয়ার কাজেও ব্যস্ত না।” 

হজরত আলী রাযিআল্লাহ আনহু বলেন- “দিনগুলো হলো তোমার জীবনের খাতা; এর সংরক্ষণ করো নেক আমল দ্বারা।” 

আরেকটি হাদিস উল্লেখ করে শেষ করছি- “দু’টি নিয়মাত দ্বারা উপকার উঠাতে অনেকে ব্যর্থ হয়, একটি হলো সচ্ছলতা আরেক হলো অবসর।” (বোখারি ৬০৪৯)। 

কবি বলেছেন,

যে জন দিবসে মনের হরষে
জ্বালায় মোমের বাতি,
আশু গৃহে তার দখিবে না আর
নিশীথে প্রদীপ বাতি। 

আজকে যে অযথা কথা ও কাজে সময় নষ্ট করছে, অচিরেই এমন একদিন আসবে যে, সে এই সময়ের জন্য দুঃখ কান্না করবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে