শত বছর পার হলেও এসব হত্যাকাণ্ড অমীমাংসিতই রয়ে গেছে

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭,   ১১ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

শত বছর পার হলেও এসব হত্যাকাণ্ড অমীমাংসিতই রয়ে গেছে

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৩৩ ৭ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৫:১৫ ৭ এপ্রিল ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

পৃথিবী তার জন্মলগ্ন থেকেই ইতিহাস সৃষ্টি করে আসছে। মানুষ তার নানা কর্মকাণ্ড দিয়ে গড়েছে ইতিহাসের নানা অধ্যায়। ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়ের মধ্যে অপরাধ আর অপরাধীরা বেশ খানিকটা জায়গাজুড়েই রয়েছে।

যুগে যুগে এমন অনেক অপরাধ রয়েছে যেগুলো ইতিহাস তৈরি করেছে। তবে তার কারণ রয়ে গেছে আজো অজানা।তেমনই ইতিহাস সৃষ্টি করা কিছু অমীমাংসিত অপরাধের কথাই থাকছে আজকের লেখায়-  

নিউ গেট মনস্টার

১৭৮৮ সালের মে মাসে প্রথম তার হামলার শিকার হন মারিয়া স্মিথ নামের এক নারী। তিনি লন্ডনের এক ডাক্তারের স্ত্রী ছিলেন। মারিয়া জানান, রাতের বেলা এক বন্ধুর বাসা থেকে বের হয়েই বিপদে পড়েন তিনি। দরজার সামনেই তাকে একা পেয়ে অপরিচিত এক লোক অকথ্য ভাষায় গালাগালি এবং লাঞ্চিত করে। এমনকি তার স্তন ও ঊরুতে ছুরি দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়। এর পরের দিন থেকে অনেক নারীই এমন হামলার শিকার হতে থাকেন। 

জনমনে শুরু হয়ে যায় আতঙ্ক। লন্ডনের বাতাসে ভেসে বেড়াতে থাকে দীর্ঘকায় এক ব্যক্তির কথা। সে রাস্তাঘাটে কোনো বড় ঘরের নারীকে একা পেলেই নোংরা ভাষায় গালি দিতে শুরু করে। মাঝে মাঝে তাদের উপর হামলাও চালায়। ছুরি বা তীক্ষ্ম কোনো জিনিস নারীদের শরীরে গেঁথে দেয়। পত্রপত্রিকায় শুরু হয় এই অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা। পত্রিকার বিভিন্ন শিরোনামে তার নাম দ্য মনস্টার এবং লন্ডন মনস্টার দেয়া হয়।

লন্ডন মনস্টারের প্রতীকী ছবিএই হামলাকারীর প্রধান লক্ষ্য হলো নারীদের পশ্চাদ্দেশ ও উরু। এই দুই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশিবার আঘাত হেনেছে সে। তবে কয়েকবার নারীদের মুখ বরাবরও হামলা চালায় সে। তবে প্রতিবারই কোনো সাহায্য আসার আগেই নির্বিঘ্নে নিজের কাজ সেরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় অপরাধী। ফলে মাত্র দুই বছরেই এমন অন্তত ৫০ জন নারীর উপর আক্রমণ ঘটানো সম্ভব হয় তার পক্ষে। শহরের মানুষ যখন ভয়ে-আতঙ্কে দিশেহারা। ঠিক তখন লন্ডন মনস্টারকে ধরিয়ে দেয়ার বিপরীতে বিশাল অংকের অর্থ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। 

রাতের বেলা সশস্ত্র বাহিনী শহরের অন্ধকার রাস্তাগুলোতে টহল দিয়ে বেড়াতে থাকে, যেন অপরাধীকে হাতেনাতে ধরা যায়। তবে কিছুতেই কাজ হয় না। এমনকি ‘বো স্ট্রিট রানার্স’ নামের লন্ডনের পুলিশ বাহিনীও ব্যর্থ হয় লন্ডন মনস্টারকে ধরতে। মনস্টার সন্দেহে রাইনউইক উইলিয়ামস নামের একজন ফুল বিক্রেতাকে চিহ্নিত করা হয়। তবে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো প্রমাণ ছিল না। এমনকি তার মালিক তার চরিত্র সম্পর্কে ভালো বলেছিলেন। তিনি বলেন, উইলিয়ামস এমন কাজ করতে পারেন না।

আদালতে জিজ্ঞাসাবাদের পর সে স্বীকার করে, সত্যিই একদিন কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে অ্যান নামের এক নারীর উপর হামলা চালিয়েছিল সে। এছাড়া আর কোনোদিন কোনো নারীর উপর হামলা চালায়নি এবং তাকে যে লন্ডন মনস্টার বলা হচ্ছে, সেটাও সত্য নয়। দুই দফা বিচার চললো রাইনউইকের। হামলার শিকার অন্য নারীরা তাকে চিনতে পারল না। তার বিরূদ্ধে কোনো অপরাধের সত্যতা না মিললেও তাকে নিউগেট জেলখানায় ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলো। কারাগারে থেকেই সে তার কৃত্রিম ফুল বানানোর কাজে পারদর্শিতা অর্জন করে। 

১৭৯৬ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পায় রাইনউইক। এরপর তিনি বিয়ে করেছিলেন এবং তার একটি পুত্র সন্তান হয়। তবে আসলে রাইনউইক কি সত্যিই মনস্টার ছিল কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। তাহলে কে ছিল মনস্টার? তা আজো রয়েছে অজানা। সন্দেহ নেই যে উইলিয়ামস অপরাধে নির্দোষ ছিলেন। তাহলে আসল ‘মনস্টার’ কে ছিলেন?

রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডের দুই পুত্ররাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডের দুই পুত্রের মৃত্যু

১৪৮৩ সালের এপ্রিলে রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ড মারা যান। সেসময় তিনি দুটি পুত্র সন্তান রেখে যান। রাজার দুই পুত্রের একজনের বয়স ছিল ১২ অন্যজন মাত্র ৯ বছর বয়সী। তারাই ছিল রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডের পরে সিংহাসনের উত্তরসূরী। তবে রাজার ভাই রিচার্ড দুইজনকেই অবৈধ্য বলে ঘোষণা করে। সে দাবি করে রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডের সঙ্গে এলিজাবেথ উডভিলের বিবাহ বৈধ ছিল না। তাই এই দুই রাজকুমারের কেউই সিংহাসনে বসতে পারবে না। 

রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ড মারা যাওয়ার আগে তার ভাই রিচার্ডকে রাজ্যের লর্ড প্রটেক্টরের দায়িত্ব দিয়ে যান। তবে তাতে সন্তুষ্ট ছিল না রিচার্ড। কিছুদিন পরই রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডের দুই শিশু পুত্র নিখোঁজ হয়। তারা রিচার্ডের সঙ্গে লন্ডন টাওয়ারে ঘুরতে যায়। এরপর তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, চাচা রিচার্ডের হাতেই তারা প্রাণ হারিয়েছে। 

রিচার্ডের নির্দেশে তার দুই সহযোগী মাইলস ফরেস্ট এবং জন ডাইটন এই জঘন্য অপরাধটি করেছিল। তবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, রিচার্ড সিংহাসনে বসলেও ভাইয়ের পুত্রদের নিয়ে তার সন্দেহ ছিল। সে ভেবেছিল পরবর্তীতে তারা সিংহাসন দখল করতে পারে। তাই তাদের হত্যা করেছিল রিচার্ড। 

জিল ডান্ডো টিভি উপস্থাপক জিল ডান্ডো হত্যা 

১৯১৭ সালে সমারসেটে জন্ম নেয়া জিল ডান্ডো পেশায় ছিলেন একজন টিভি উপস্থাপক। সাংবাদিক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেয়ার পরে তিনি বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলেন। জিল সংবাদ উপস্থাপনার পাশাপাশি শিল্পী হিসেবেও বেশ পরিচিত ছিলেন। ১৯৯৫ সালে তিনি ক্রাইমওয়াচের উপস্থাপক হিসাবে যোগদান করেন। সেখানে কাজ করতে গিয়ে অনেক অপরাধীকে তিনি প্রকাশ্যে এনেছিলেন। এর ফলে অপরাধীরা ধরা পরে এবং তাদের যোগ্য শাস্তি হয়। 

চার বছর পরে, ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে জিলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ডানডো পশ্চিম লন্ডনের ফুলহামের বাড়িতে প্রবেশের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। গুলি করার আগে বন্দুকধারী তার মাথায় রিভলবার দিয়ে আঘাত করে। জিলের চিৎকার শুনে এক প্রতিবেশী বেরিয়ে আসে। তখন তিনি ছয় ফুট লম্বা এবং প্রায় ৪০ বছর বয়সী একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষকে দেখেছিলেন। ধারণা করা হয়, জিলকে কোনো পেশাদার খুনি হত্যা করেছিল। এছাড়াও অনেকে মনে করেন জিলকে তার পুরনো প্রেমিক হত্যা করে থাকতে পারে।

ক্রাইমওয়াচের করা আপিলের পরে ২০০১ সালে জিলকে হত্যার অভিযোগে ব্যারি জর্জ নামে এক স্থানীয় ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়। তার পোশাকে আগ্নেয়াস্ত্রের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। ফলে আংশিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল তাকে। ২০০৮ সালে একটি বিচারের পর ব্যারি জর্জ মুক্ত হয়। তবে সত্যিই জর্জ জিলের হত্যাকারী ছিল কিনা তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়নি। এমনকি এখনো জিলের প্রকৃত হত্যাকারীকে চিহ্নিত করা যায় নি। অমীমাংসিতই রয়ে গেছে জিল হত্যা রহস্য। 

জ্যাক দ্য রিপার

১৮৮৮ সালে লন্ডনে পরপর পাঁচজন নারীর খুন বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। যাদের হত্যা করা হয়েছিল ছুরি বা ধারালো কিছু দিয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে। যার বর্ননায় রীতিমত গায়ে কাটা দেবে আপনার। ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার বলা হয় তাকে। ১৮৮৮ সাল থেকে ১৮৯১ সাল, পূর্ব-লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেলের আশপাশ জুড়ে সর্বমোট এগারোটি খুনের ঘটনা ঘটিয়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার জ্যাক দ্য রিপার। পত্রিকায় এ নামেই তাকে পরিচয় করেছিল বিশ্ববাসীর কাছে।

জ্যাক দ্য রিপারএছাড়াও রিপার উইচপেল খুনি এবং লেদার অ্যাপ্রন নামেও পরিচিত। এই খুনগুলো যখন লন্ডনজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা আর আতঙ্কের ঝড় বইয়ে দিল, তখন এসব খুনের দায়-দায়িত্ব স্বীকার করে জ্যাক দ্য রিপারের স্বাক্ষরযুক্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছিল লন্ডনের সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির কাছে। মূলত এরপর থেকেই মিডিয়ার কাছে ব্যাপক পরিচিতি পায় জ্যাক দ্য রিপার নামটি। তবে এ নামটির মতো আতঙ্ক এর আগে কেউ ছড়াতে পারেনি।

তার চেয়েও বড় বিষয় এই খুনি ছিল সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। জ্যাক দ্য রিপার যাদের হত্যা করেছেন, তাদের বেশিরভাগই ছিল পতিতা। এই অপরাধী যৌন কার্যের সময় ভিকটিমকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করত। কেন পতিতাদেরকেই এই সিরিয়াল কিলার খুন করেছে তা কেউই জানে না। এমনকি কে এই জ্যাক দ্য রিপার। তাও রয়েছে এখনো অজানা। তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি কখনোই। ম্যালভিল ম্যাকনাগটেন নামের তৎকালীন চিফ কনস্টেবল জ্যাক দ্য রিপার হিসেবে তিনজন ব্যক্তিকে সন্দেহ করেন। 

এর মধ্যে প্রধান হলেন- এম জে ড্রুয়িট নামে এক ব্যারিস্টার যিনি পরবর্তীতে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন। দ্বিতীয়জন এরন কসমিনিস্কি নামের এক পোলিশ ইহুদি এবং তৃতীয়জন মাইকেল ওস্ট্রং নামের একজন উন্মাদ লোক। তবে এর সপক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ ছিল না। ডিটেকটিভ ফেডারিক এভারলিন জ্যাক দ্য রিপার হিসেবে সন্দেহ করেন সেভেরাইন ক্লোসোস্কি এলিস জিওর্গি চেপম্যানকে। তবে এটিও প্রমাণ করা যায়নি। 

এছাড়া আরো কয়েকজন ব্যক্তিকে জ্যাক দ্য রিপার হিসেবে সন্দেহ করা হলেও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি কে এই জ্যাক দ্য রিপার? বিগত ১২০ বছর ধরে জ্যাক দ্য রিপার ও তার হত্যাকাণ্ডগুলোকে ঘিরে রচিত হয়েছে অজস্র গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা এমনকি ভিডিও গেমস। শুধু তাই নয়, জ্যাক দ্য রিপার যেসব স্থানে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছিল, সেসব স্থান দেখার জন্য সারা বিশ্ব থেকেই মানুষজন আসেন পূর্ব-লন্ডনে।

জিল দ্য রিপার 

জিল দ্য রিপার শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েল মাঝে মধ্যে অপরাধের আসল জগতে প্রবেশ করেছিলেন। তিনিই জিল দ্য রিপারকে আবিষ্কার করেছিলেন। জিল দ্য রিপার নামে খ্যাত এই নারী একজন ধাত্রী ছিলেন। তিনি তার কাজের পাশাপাশি অনেক নির্দোষ নারীকে হত্যা করেছিলেন। তবে কেন তিনি এমন কাজ করতেন তা জানা যায়নি।   

সূত্র: হিস্ট্রিএক্সট্রা

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস