Alexa শতবর্ষী ‘গায়েবি দেউল’ অযত্নে থাকলেও গায়ে জমেনি শ্যাওলা

ঢাকা, সোমবার   ২০ জানুয়ারি ২০২০,   মাঘ ৬ ১৪২৬,   ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

শতবর্ষী ‘গায়েবি দেউল’ অযত্নে থাকলেও গায়ে জমেনি শ্যাওলা

হারুন আনসারী, ফরিদপুর প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:৩০ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:৩৮ ৮ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

লাল রঙা একটি সুউচ্চ দালান। এতে নেই কোনো দরজা জানালা। চতুর্দিকে তার দেয়ালের প্রাচীর। বিস্তৃত জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা ১২ কোণ বিশিষ্ট একটি স্থাপনা। ভূমি থেকে প্রায় ২০ ফুট পর্যন্ত সমানভাবে ওপরে উঠে গেছে। এটি একটি দেউল। প্রায় ৮০ ফুটের মত উচ্চতা হবে এর। দেউলের দেয়ালে আঁকা দেব-দেবী ও জীব-জন্তুর চিত্রকলা। বলছি মথুরাপুর দেউলের কথা। 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক কোঠাবিশিষ্ট বিশাল এই দেউলটির নির্মাতা কে তার সঠিক কোনো তথ্য জানা নেই কারো। তবে অত্র অঞ্চলে জনশ্রুতি আছে, মোঘল সম্রাট-এর সেনাপতি সংগ্রাম সিংহ ভূষণার রাজা (বর্তমানে মাগুরা জেলার তৎকালীন রাজা) মুকুন্দরাম রায়কে ফতেহগঞ্জপুরে যুদ্ধে পরাজিত করে বিজয়ের স্মারক হিসেবে এই দেউলটি নির্মাণ করেন। তবে কেউই নিশ্চিত নয় দেউলটি কার। তাই অনেকে গায়েবি দেউল বলেও জানে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হলো, শত শত বছর ধরে অযত্নে পড়ে থাকা এই দেউলের গায়ে সামান্য শ্যাওলাটুকুও জমেনি।

দেউলের অবস্থান

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার গাজনা ইউনিয়নের মথুরাপুর গ্রামে অবস্থিত এই দেউলটি। তাই এর নাম মথুরাপুর দেউল। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মধুখালী বাজার থেকে মধুখালী-রাজবাড়ী ফিডার সড়কের দেড় কিলোমিটার উত্তরে এটি। আবার মধুখালী-বালিয়াকান্দি আঞ্চলিক সড়কে মধুখালী সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে গাজনা ইউনিয়নে সড়কের পশ্চিম দিকে অবস্থিত এটি। এর বিপরীত দিক দিয়ে বয়ে গেছে চন্দনা নদী।

এক ঐতিহাসিক নিদর্শন এটিদেউল কথন

মথুরাপুরের এই ঐতিহাসিক দেউলকে ঘিরে স্থানীয় অধিবাসীদের নিকট হতে জানা যায় অনেক তথ্য। মথুরাপুর গ্রামের সন্তান যিনি একটি পাটকলের কর্মকর্তা মোঃ সেলিমুজ্জামান এই দেউলটি সম্পর্কে ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, দেউলটির গাঁয়ে অনেক নকশা ও মুর্তি আঁকা রয়েছে। সেখানে লক্ষণের তৈরি মুর্তিও রয়েছে। সেই থেকে অনেকের ধারণা এটি পাল বংশের আমলের। 

তবে প্রচলিত আরেকটি গল্পও রয়েছে, রাজা মথুরা নামে একজন রাজা ছিলেন। যিনি এটি তৈরি করেন। তবে রাজা মথুরার ব্যাপারে আর কিছুই জানা নেই কারো। আবার এটি মোঘল আমলে যুদ্ধক্ষেত্রের ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল বলেও অনেকে মনে করেন। 

সেলিমুজ্জামান বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুজা করতেন। এছাড়া সেখানে মেলাও হতো। তবে এখন আর এসব হয়না। তার মতে, এই দেউলটি দেশের প্রাচীন স্থাপনার একটি অনন্য কীর্তি। এটিকে কেন্দ্র করে এখানে পর্যটনভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠা সম্ভব।

মথুরাপুর দেউলের লাগোয়া উত্তর দিকের প্রতিবেশী ফরিদপুর চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা রায়হান শিকদার বলেন, ছোটবেলায় দেখেছি দেউলে একটি ছোট সাইনবোর্ড ছিল। সেখানে উল্লেখ ছিল যে এটি মোঘল সাম্রাজ্যের আগে সেনাপতি মানসিংহের স্মৃতিস্তম্ভ। সেটি এখন নেই। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে একটি বড় সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সেখানে এর ঐতিহাসিক বিবরণ লেখা রয়েছে।

তিনি জানান, অনেকে এই দেউলটিকে একটি গায়েবি স্থাপনা বলে থাকে। তবে প্রকৃত অর্থে এটি একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এই দেউলটি প্রতিদিন অনেক পর্যটক দেখতে আসেন। তবে এখানে আসা দর্শণার্থীরা দীর্ঘসময় কাটাতে এসে বিপাকে পরেন। সেখানে নেই টয়লেট। বাধ্য হয়ে আমাদের বাড়িতেই তারা ধর্ণা দেন। এজন্য আমরা প্রতিনিয়ত একটি বিড়ম্বনায় পড়ি। এখানে কোনো শেড বা ছাউনিও নেই। বৃষ্টি এলে দর্শনার্থীদের দাড়ানোর কোনো জায়গা থাকেনা। গাড়ি পার্কিংয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই। 

এক ক্ষবিশিষ্ট দেউলদেউলের কাঠামো

দেউলটি বারো কোণ বিশিষ্ট এবং মাটি থেকে প্রায় ২১ দশমিক ২ মিটার উঁচু; যার ভেতর একটি ছোট কক্ষ রয়েছে। এর গঠন-প্রকৃতি অনুসারে একে মন্দির বললে ভুল হবে না। এটি একটি রেখা প্রকৃতির দেউল। ষোড়শ শতাব্দীর স্থাপনাগুলোর মধ্যে মথুরাপুর দেউল সম্ভবত একমাত্র রেখা প্রকৃতির দেউল। এটি বারো কোণ বিশিষ্ট একটি ভবনের মতো স্থাপনা। দেউলটিতে দুইটি প্রবেশপথ আছে। একটি দক্ষিণমুখী, অন্যটি পশ্চিমমুখী।

এটি তৎকালীন ভবনগুলোর মধ্যে একমাত্র বারো কোণবিশিষ্ট কাঠামো। বারোটি কোণ থাকায় ওপর থেকে দেখলে এটিকে তারার মতো দেখা যায়। দেউলটির উচ্চতা ৮০ ফুট। স্থাপনাটির মূল গঠন উপাদান চুন-সুরকির মিশ্রণ। দেউলের বাইরের দেয়ালটি লম্বালম্বিভাবে সজ্জিত, যা আলোছায়ার সংমিশ্রণে এক দৃষ্টিনন্দন অনুভূতির সৃষ্টি করে। 

পুরো স্থাপনায় টেরাকোটার জ্যামিতিক ও বাহারি চিত্রাঙ্কন রয়েছে। রামায়ণ কৃষ্ণলীলার মতো হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র, গায়ক, নৃত্যকলা, পবন পুত্র বীর এবং যুদ্ধচিত্রও এই দেউলের গায়ে খচিত রয়েছে। প্রতিটি কোণের মাঝখানে কৃত্তিমুখা স্থাপন করা রয়েছে। তবে দেউলটির কোথাও কোনো লেখা পাওয়া যায়নি। বাংলার ইতিহাসে এর নির্মাণশৈলী অনন্য বৈশিষ্ট্য বহন করে। 

দেউলের গাঁয়ে আঁকানো বিভিন্ন নকশাউইকিপিডিয়ার তথ্যানুসারে, সংগ্রাম সিং নামক বাংলার এক সেনাপতি এটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৬৩৬ সালে ভূষণার বিখ্যাত জমিদার সত্রাজিতের মৃত্যুর পর সংগ্রাম সিংকে এলাকার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং তৎকালীন শাসকের ছত্রছায়ায় তিনি বেশ ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। এলাকার রীতি অনুসারে, তিনি কাপাস্তি গ্রামের এক বৈদ্য পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেন এবং মথুরাপুর বসবাস শুরু করেন। অন্য এক সূত্র মতে, সম্রাট আকবরের বিখ্যাত সেনাপতি মানসিং রাজা প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসেবে এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন। সে অনুযায়ী, মথুরাপুর দেউল একটি বিজয়স্তম্ভ। তবে সূত্রটির সত্যতা নিরূপণ সম্ভব হয়নি।

দেউলের বর্তমান অবস্থা

দেউলটি রক্ষণা-বেক্ষণের জন্য সেখানে একজন কেয়ারটেকার রয়েছেন। রায়হান শিকদার বলেন, শত শত বছরের প্রাচীন এই দেউলটি দীর্ঘকাল অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকলেও এর গায়ে কোনোদিন শ্যাওলা পড়েনি। তবে ২০০০ সালে যেই সংস্কার কাজ করা হয়েছে সেগুলো নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। তিনি জানান, দেউলের সঙ্গেই অনেক পুরনো একটি কালিমন্দির ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরপর মন্দিরটি ভেঙে যায়। সেটি আর সংস্কার করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও পুত্রবধুসহ অনেক দেশবরেণ্যরা ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি দেখতে সেখানে গিয়েছেন। এখনো দেশ বিদেশের অনেক পর্যটক সেখানে যান দেউলটি দেখতে। দেশে এমন স্থাপনা আরো দু’টি স্থানে থাকলেও এটিই সেরা। এজন্য এই স্থাপনাটিকে ঘিরে সরকার আরো উন্নয়নমূলক কাজ হাতে নিতে পারে। এতে এই স্থানটি একটি অন্যতম পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস