Alexa শকুন্তলার প্রণয় উপাখ্যান

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৬ ১৪২৬,   ২১ মুহররম ১৪৪১

Akash

শকুন্তলার প্রণয় উপাখ্যান

 প্রকাশিত: ১৭:২২ ৩১ আগস্ট ২০১৮   আপডেট: ১৭:২২ ৩১ আগস্ট ২০১৮

উদভ্রান্ত হয়ে বনের একপাশ থেকে আরেক পাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে এক রাজা। হঠাৎ সে দেখল, একটা বাচ্চাছেলে বিশাল সিংহের মুখ হাঁ করিয়ে তার দাঁত গুণছে। সাংঘাতিক ব্যপার তো! কৌতূহলী হয়ে সামনে এগিয়ে বাচ্চাটির পরিচয় জানতে চাইল আগন্তুক । “ভরত আমার নাম। রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার পুত্র আমি”-বাচ্চাটির মুখে এ কথা শুনেই রাজা জড়িয়ে ধরেন তাকে। এবার ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক ।  

হিন্দু পুরাণ মহাভারতে রচিত হয়েছে রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার প্রণয় উপাখ্যান। ঋষি বশিষ্ঠের হাতে ক্ষমতা, রাজত্ব সবকিছু হারিয়ে নিজেও ঋষির মত জীবনযাপন শুরু করেন রাজা বিশ্বামিত্র। সেই সঙ্গে বশিষ্ঠের ওপর প্রতিশোধ নিতে তিনি শুরু করেন কঠোর তপস্যা। কঠিন ধ্যানের মধ্য দিয়ে তিনি যখন বশিষ্ঠ বধের ব্রহ্মাস্ত্র লাভের কাছাকাছি চলে এসেছেন, তখনই দেবরাজ ইন্দ্র অপ্সরা মেনকাকে পাঠায় তার ধ্যান নিবৃত্ত করতে। মেনকার সৌন্দর্যে মহর্ষি বিশ্বামিত্র বিমোহিত হয়ে পড়েন, তাঁর এত বছরের সাধনা ভেঙ্গে যায়।

বিশ্বামিত্রের ঔরসে মেনকার গর্ভে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে কন্যাশিশু। কিন্তু এবার বিশ্বামিত্রের চৈতন্যোদয় হয়; বশিষ্ঠকে পরাস্ত করবার জন্য তাঁর এতদিনের সমস্ত সাধনা, তপস্যা ভেস্তে গেছে । ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে সে,  নিমিষে ত্যাগ করেন মেনকা এবং তাদের সদ্যোজাত সন্তানটিকে। মেনকাও মনের দুঃখে বনের মাঝে মালিনী নদীর ধারে শিশুটিকে ফেলে ফিরে যায় স্বর্গে।

বাচ্চাটির মুখে এত মায়া  ছিল যে, বনের পশুপাখিরাও তাকে ভালবেসে ফেলল। অইটুকু মানব শিশুকে কী খাওয়াতে হয় তারা তা জানে না, শুধু শিশুর চারপাশে বসে তাকে পাহারা দিতে লাগল এবং সূর্যের তাপ থেকে বাঁচাতে ডানা দিয়ে আগলে রাখল। মহামুনি কন্ব সে সময় নদীতে স্নান করতে আসেন। তিনি পশুপাখি দ্বারা পরিবৃত শিশুটিকে দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং নিজের আশ্রমে নিয়ে আসেন। কন্ব শিশুর নাম দিলেন শকুন্তলা। শকুন্ত শব্দের অর্থ পক্ষী। আর শকুন্তলার অর্থ হচ্ছে, পক্ষীর দ্বারা সুরক্ষিত। কেউ কেউ বলে, একটা শকুন তার পাখার নিচে মেয়েটিকে লুকিয়ে রেখেছিল বলে কন্ব মুনি তার নাম দেন শকুন্তলা অর্থাৎ শকুনের তলা থেকে পাওয়া। তপোবনে কন্ব মুনির আশ্রমেই বেড়ে উঠতে থাকল শকুন্তলা। বনের প্রকৃতি, পাখপাখালী আর প্রানীরাও যেন শকুন্তলার রূপে মোহান্বিত। ফুলের মালার অলংকার সারা গায়ে জড়িয়ে রাখে সে, আর ছোট ছোট হরিণ শাবকের সঙ্গে দিনভর ছোটাছুটি।

আস্তে আস্তে শকুন্তলা হয়ে উঠলো রূপে-গুণে এক পূর্ণাঙ্গ যুবতী। একদিন গান্ধারের রাজা দুষ্মন্ত মৃগয়ায় এলেন সে অঞ্চলে। এক হরিণের পেছনে ধাওয়া করতে করতে দুষ্মন্ত দলছুট হয়ে ঢুকে পড়লেন ঋষি কন্বের আশ্রম এলাকায়। ক্লান্ত দুষ্মন্ত তেষ্টা নিবারণের আশায় আশ্রমের ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন। ঋষি কন্ব তাকে সমাদরে বসিয়ে অতিথি আপ্যায়নের নির্দেশ দিলনে সকলকে। আশ্রমের নারীরা জলখাবারের আয়োজন নিয়ে দুষ্মন্তের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আর তখনই তাঁর চোখে পড়ল শকুন্তলাকে। বলা হয়নি, ঋষি কন্বের আশ্রম এলাকায় কিন্তু শিকার নিষিদ্ধ ছিল। বোধহয় চতুর হরিণটি সে কথা জেনেই দুষ্মন্তের আক্রমণ থেকে বাঁচতে সে এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু সেদিনের পর থেকে এ এলাকাই হয়ে গেল রাজা দুষ্মন্তের শিকারের প্রিয় জায়গা! শিকার সে করত না কিছুই, তবে অন্য সবাইকে বিভিন্ন এলাকায় শিকারে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে আশ্রমের চারপাশে ঘুরে বেড়াত। আহারে প্রেমিকমন!

শকুন্তলা কখন সখীদের সঙ্গে পানি তুলতে আসে, কখন ঘাটে বসে গল্পগুজবে মশগুল, কখন ফল কুড়াচ্ছে-এসবই দূর থেকে দুষ্মন্ত সারাদিন দেখত। শকুন্তলাও ঠিক বুঝতে পারছিল সব। দুজনেই দুজনকে দেখছে দূর থেকে, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছেনা। চোখের ভাষাতেই যেন সারাদিনের আলাপ হয়ে যায় দুজনের। কিন্তু এভাবে কতদিন! শেষ পর্যন্ত শকুন্তলার সখীদের সহযোগিতায় শুরু হয় গোপনে প্রেমপত্র বিনিময়। আরো কিছুদিন পর দুষ্মন্ত, শকুন্তলাকে বিয়ে করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। ঋষি কন্বের সামনে উপস্থিত হয়ে নিজেদের ভালবাসার কথা ব্যক্ত করে সে। ঋষি কন্ব রাজি হয়ে তাদের বিবাহের সমস্ত আয়োজন করে। গান্ধর্ব মতে মালাবদলের মধ্য দিয়ে তাদের বিয়ে সুসম্পন্ন হয়।

এদিকে দুষ্মন্তের রাজ্যে তখন অচলাবস্থা প্রায়। বারবার দূতেরা এসে রাজধানী হস্তিনাপুরে শত্রু আক্রমণের কথা জানাতে লাগল। অবশেষে একদিন সত্যি তাকে নিজের রাজ্যে ফিরে যেতে হয়। বিদায়বেলা কথা দেন যত দ্রুত সম্ভব ফিরে আসবেন, শকুন্তলাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন রাণীর বেশে। আর আঙ্গুল থেকে একটি রাজকীয় আংটি খুলে শকুন্তলাকে পরিয়ে দিয়ে যান।  

উদাস শকুন্তলা পড়ে থাকে আশ্রমে, কোন কিছুতে তাঁর আর মন নেই। দিনরাত সে স্বামীর ফেরার আশায় দিন গুনতে থাকে। একদিন কন্ব মুনির আশ্রমে বেড়াতে এলো দুর্বাসা মুনি। শকুন্তলার পাশ দিয়েই হেঁটে গেলেন দুর্বাসা, স্বামীচিন্তায় মগ্ন শকুন্তলা তাকে খেয়ালই করলেন না। রেগে গিয়ে দুর্বাসা তাকে অভিশাপ দিল, যার চিন্তায় তন্ময় হয়ে শকুন্তলা ঋষিকে অবহেলা করেছে, সে-ই তাকে দিব্যি ভুলে যাবে। আর্তনাদ করে উঠল শকুন্তলা। নিজে ক্ষমা প্রার্থনা করল, অনুরোধ করল তাঁর সখীরাও। ঋষির তাতে মন গললো। কিন্তু অভিশাপ যে ফিরিয়ে নেয়া যায় না! তবে অভিশাপ কাটানোর একটা উপায় ঋষি ঠিকই বের করে ফেললেন। দুষ্মন্তের দেয়া কোন উপহার যদি তাকে দেখানো যায়, তবেই ফিরবে তার স্মৃতি। তৎক্ষণাৎ সে চিনতে পারবে নিজের স্ত্রীকে।


 
কিছুদিন পর শকুন্তলা বুঝতে পারল তার গর্ভে লালিত হচ্ছে এক নতুন প্রাণ। গর্ভবতী শকুন্তলা এবার আর থাকতে পারল না। কন্ব মুনিকে নিয়ে স্বামীকে খোঁজার আশায় নিজেই চলল দুষ্মন্তের রাজধানী অভিমুখে। যাত্রাপথে পড়ল এক নদী। আর এখানেই তাদের প্রণয়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটা ঘটল। সে নদীতে স্নান করতে গিয়ে কখন যে শকুন্তলার হাত থেকে খুলে আংটিটা জলে পড়ে গেল সে নিজেও তা বুঝতে পারল না।
 
যথাসময়ে শকুন্তলা পৌছলো রাজধানীতে। সরাসরি সে চলে এল দুষ্মন্তের রাজদরবারে। কত মাস পর সে দেখতে পেল স্বামীকে! ব্যাকুল হয়ে শকুন্তলা সব কিছু খুলে বলতে লাগল দুষ্মন্তকে। নিজেদের প্রথম পরিচয়, আশ্রমের সুখের দিন কিছুই বাদ গেল না।কিন্তু সেই যে ঋষি দুর্বাসার অভিশাপ! দুষ্মন্তের মনে নেই কিছুই। সে সবকিছুই অস্বীকার করল। হাতে তো আর তাঁর দেয়া আংটিটিও নেই যা দেখিয়ে দুষ্মন্তের স্মৃতি ফেরাবে শকুন্তলা! রাগে, অপমানে শকুন্তলা ফিরে আসে। কন্বের আশ্রম থেকে বেড়িয়ে একা থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কিছুদিন পর শকুন্তলার কোল আলো করে আসে এক পুত্রসন্তান।

এদিকে শকুন্তলার সে আংটি গিলে ফেলে এক মাছ। অনেক বছর পর সে মাছ যে জেলের কাছে ধরা পড়ে তিনি মাছের পেটে পান সে রাজকীয় আংটি। আংটিতে দুষ্মন্তের নাম লেখা দেখেই সে ছুটে যায় রাজার  দরবারে। আংটিটাকে একবার দেখেই দুর্বাসার অভিশাপ শেষ হয় এবং দুষ্মন্তের সব কিছু মনে পড়ে যায়। দুষ্মন্ত ছুটে চলে আসে কন্বেরর আশ্রমে। কিন্তু সেখানে তো তখন আর কেউ থাকে না।সমস্ত বন চষে বেড়াতে থাকে সে।

এভাবে ঘুরতে ঘুরতেই দুষ্মন্ত পেয়ে যায় ভরতকে। ভরতই দুষ্মন্ত অর্থাৎ পিতাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। বহুবছর পর আবার চোখাচোখি হয় দুষ্মন্ত আর শকুন্তলার। এবার কেবল ভালবাসা নয়; একজনের চোখ জুড়ে ছিল অভিমান আর অন্যজনের অনুশোচনা। দুষ্মন্ত ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের স্ত্রী-সন্তানকে। পরবর্তীতে তাদের ঘরে আরো তিনটে পুত্রসন্তানের জন্ম হয়।বলা হয়ে থাকে, তাদের প্রথম পুত্র ভরতই জয় করে সমগ্র ভারত ভূখণ্ড।তাই তারঁ বিজিত অঞ্চল ‘ভারতবর্ষ’ নামে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে ভরতের বংশেই প্রতাপশালী পান্ডবদের জন্ম হয়।

(শকুন্তলা এবং দুষ্মন্তের এ উপাখ্যানের বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে।আগ্রহ থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘মহাভারতের কথা’, কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানশকুন্তলম’, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শকুন্তলা’ প্রমুখ)

ডেইলি বাংলাদেশ/এসজেড