ল্যাপটপের টুকিটাকি

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

ল্যাপটপের টুকিটাকি

আয়েশা পারভীন ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:৪১ ১২ জুন ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ল্যাপটপ আজ শোভা পাচ্ছে সকলের হাতে হাতে। তবে একসময় কেউ ভাবেনি এটি এতটা জনপ্রিয় হবে। আস্ত একটি কম্পিউটার এর কাছে হেরে যাবে। মূলত এককালের ডেস্কটপের জায়গা দখল করে নিয়েছে আজকের ল্যাপটপ। বহনযোগ্যতায় সহায়ক এই ল্যাপটপ একটা সময়ে বিলাসিতার অংশ হয়ে থাকলেও এখন কিন্তু বেশ দরকারী কাজে ব্যবহৃত হয় এটি। নোটবুক, আল্ট্রাবুক, ক্রোমবুক কিংবা অল-ইন-ওয়ানের মত নানাভেদের ল্যাপটপ এখন ব্যবহৃত হচ্ছে সকল ধরণের মানুষের হাতে হাতে।

ল্যাপটপ কী?

মূলত ল্যাপ শব্দের অর্থ কোল আর টপ অর্থ ওপর, ল্যাপটপ অর্থ কোলের উপর। ল্যাপটপ হল বহনযোগ্য ব্যক্তিগত কম্পিউটার যা দেখতে ঝিনুক আকৃতির এবং ভ্রমন উপযোগি। আগে ল্যাপটপ এবং নোটবুক উভয়কে পূর্বে ভিন্ন ধরা হত কিন্তু বর্তমানে তা মানা হয় না। ল্যাপটপ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষায় এবং ব্যক্তিগত বিনোদনের কাজে।

নোটবুক:

নোটবুক মূলত ল্যাপটপের পুরনো সংস্করণ। কম্পিউটার শ্রেণীর মধ্যে এটি একটি ছোট, হালকা এবং কম দামি কম্পিউটার যা ২০০৭ সালে আলোর মুখ দেখে। নেটবুক কম্পিউটার ট্যাবলেট কম্পিউটার এবং ক্রোমবুকের (একটি বহনযোগ্য নেটওয়ার্ক কম্পিউটার) একটি অংশ। বর্তমানে অফিসের কাজে ব্যবহার করার জন্য এর কোন বিকল্প নেই। মূলত ল্যাপটপেরই আরেকটি নাম হচ্ছে নোটবুক। শুরুর দিকে ল্যাপটপ নামে এটি পরিচিতি লাভ করলেও একটা সময় ল্যাপটপের আকৃতি একটি নোটবুকের পাতার মত ছোট হয়ে যায়। তখন থেকেই ল্যাপটপকে নোটবুক হিসেবে ডাকা হয়। রাশিয়ার মত দেশে ল্যাপটপকে সম্বোধন করতে এখনো নোটবুক শব্দের প্রচলন আছে।

আল্ট্রাবুক:

আল্ট্রাবুক হল ল্যাপটপের চেয়ে ছোট, সামান্য ওজন ও অবিশ্বাস্য রকমের পাতলা একটি ডিভাইস। মূলত আল্ট্রাবুক হলো ল্যাপটপের এক বিপ্লবের নাম। অন্য যেকোনো সাধারণ কম্পিউটারের সঙ্গে যোজনে যোজনে টক্কর দিতে সক্ষম এটি। আল্ট্রাবুকের ওজন কম হওয়ায় এসব ল্যাপটপ স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বহন করা যায়। এইচপি, লেনোভো, ডেল, আসুসের মত জনপ্রিয় কোম্পানিগুলো তাদের তৈরিকৃত আল্ট্রাবুকের জন্য জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেছে। তবে আল্ট্রাবুকের মত ল্যাপটপগুলো তুলনামূলক ছোট আকারের হওয়ায় এর পরিপূর্ণ কাঠামো ও যন্ত্রাংশ একত্রীকরণেও নির্মাতাদের বাড়তি খরচ হয়, এ কারণে আল্ট্রাবুকের বাজারদামও কিছুটা বেশি হয়। ভাল মানের আল্ট্রাবুকগুলোর দাম ৬০ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লাখ টাকারও হতে পারে।

অল-ইন-ওয়ান ল্যাপটপ:

অল-ইন-ওয়ান ল্যাপটপের আবির্ভাব ঘটে ট্যাবলেটের আবিষ্কারের পরপরই। এসব ল্যাপটপের প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে পুরোপুরি টাচ স্ক্রিন। এর সঙ্গে কখনো কখনো যুক্ত হয় মূল যন্ত্রাংশ থেকে পর্দা আলাদা করে ট্যাবলেটের মত ব্যবহার করার সুবিধাও। এই সুবিধাকে বলা হয় কনভার্টিবল উইথ টাচস্ক্রিন। এটি দেখতে স্টাইলিশ ও যুগোপযোগী হওয়ার জন্য তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বেছে নিচ্ছে এসব অল-ইন-ওয়ান ল্যাপটপ। লেনোভোর ইয়োগা, মাইক্রোসফটের সারফেস, এইচপির স্পেক্টর হলো তেমনই কিছু অল-ইন-ওয়ান ল্যাপটপের উদাহরণ।

ল্যাপটপ চালানোর নিয়ম:

আমাদের মধ্যে এখন ল্যাপটপ কম-বেশি সকলেই চালাতে পারে। তবে সঠিকভাবে এটি পরিচালনা করা না হলে খুব দ্রুতই কমে আসতে পারে ল্যাপটপের কার্যক্ষমতা। আর ল্যাপটপের কার্যক্ষমতা বাড়াতে চাইলে প্রথমে চলে আসবে সঠিকভাবে ল্যাপটপের ব্যবহার। ল্যাপটপ চালানোর সঠিক নিয়মগুলোর মধ্যে যেগুলো না জানলেই নয়, সেগুলো হলো-

ল্যাপটপের স্থান:

আমাদের মধ্যে অনেকেই ল্যাপটপ বিছানার উপর রেখে কাজ করতে পছন্দ করি। তবে চমকে দেয়া বিষয়টি হচ্ছে, বিছানা-কুশনের মত সমতল জায়গায় ল্যাপটপ চালনা করলে এটি ল্যাপটপের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, প্রায় প্রতিটি ল্যাপটপের নিচের অংশে একটি কিংবা দুটি ফ্যান থাকে, যা ল্যাপটপের ভেতরের গরম বায়ু নিঃসরণ বা ভেন্টিলেশনে সহায়তা করে। বিছানা কিংবা কুশন পুরোপুরিভাবে এই ভেন্টিলেশন প্রক্রিয়ায় বাঁধা সৃষ্টি করে, কেননা তুলা দ্বারা তৈরিকৃত এসব বস্তু বায়ু আটকে রাখে। তাই কোলের উপর, টেবিলের ন্যায় কোনো স্থানে রেখে ল্যাপটপ চালানো অধিক নিরাপদ।

কী-বোর্ড ও টাচপ্যাড:

আমার মেজচাচা ছিলেন অদ্ভুত রকমের এক মানুষ। তিনি যখন কম্পিউটারের কী-বোর্ড টাইপিং করে, খুব স্বাভাবিক থাকে ব্যাপারটা। লেখা শেষ হওয়ামাত্র তার যখন এন্টার বাটন চাপার সময় আসে, তখন সে খুব সজোরে এন্টার বাটন প্রেস করেন। এমন অনেকেই রয়েছে যাদের ডেস্কটপ কম্পিউটারের এন্টার ও স্পেসবার বাটনটি খুব প্রিয়। এন্টার ও স্পেসবারের প্রতি এমন ভালবাসাই ল্যাপটপের জন্য কখনো কখনো কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। ল্যাপটপের কী-বোর্ড থাকে অত্যন্ত পাতলা, তবে অত্যন্ত শক্তিশালী। শক্তিশালী কী-বোর্ড থাকার কারণে সামান্য চাপেই ল্যাপটপের কী-বোর্ড সাড়া দিয়ে থাকে।

টাচবারের সঠিক ব্যবহারের কথা বললে বলাই বাহুল্য যে, টাচপ্যাড খুব সংবেদনশীল একটি অংশ কেননা টাচবারের নিচে থাকে হাজারো মোশন সেন্সর। শুধুমাত্র ২-৩ টি আঙ্গুল দিয়ে টাচবার পরিচালনা করাই শ্রেয়।

ব্যাটারি ও চার্জিং:

এবার আসা যাক ব্যাটারির দিকে। ভালো মানের একটি ল্যাপটপের ব্যাটারির কার্যক্ষমতা ১৪-১৬ ঘন্টার মতো হয়ে থাকে এবং দীর্ঘদিনের ব্যবহারে খুব একটা সমস্যাও হয় না। তবে সমস্যার কথা যখন উঠলো, সাথে সাথে তখন চলে আসে ব্যাটারি চার্জের ব্যাপারটা। ব্যাটারি চার্জ দেয়া নিয়ে কয়েকটি মিথ রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো, সারারাত ল্যাপটপ চার্জ দিয়ে রাখলে ল্যাপটপের ব্যাটারি ওভারচার্জড হয়ে যায়। বাস্তবে দেখা যায়, এখনকার বাজারের অত্যাধুনিক ল্যাপটপগুলোতে এমন এক প্রযুক্তি রয়েছে, যার কাজ হচ্ছে ব্যাটারি ফুল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ল্যাপটপের চার্জ অফ করে দেয়া। অর্থাৎ তোমার ল্যাপটপের ব্যাটারি সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ আর চার্জ হবেনা। এতে ব্যাটারির বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয় না। তবে অনেকসময় বৈদ্যুতিক গোলযোগ সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকির কারণে রাতভর চার্জ দেয়া এড়িয়ে যাওয়া যেতে পারে।

ল্যাপটপ অন-অফ:

একটা গবেষণায় দেখা গিয়েছে ২৭ শতাংশ ল্যাপটপ ব্যবহারকারী সঠিকভাবে ল্যাপটপ অন-অফ করেনা, যার কারণে ল্যাপটপের আয়ুষ্কাল খুব দ্রুতই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। দেখা যায়, কাজ শেষ হয়ে গেলে ল্যাপটপটা সুন্দরমত ভাঁজ করে হয়তো বিছানার পাশে রেখে দিই। জেনে রাখা ভাল, ভাঁজ করামাত্র প্রতিটি ল্যাপটপ বন্ধ হয়ে যায় না, বরং স্লিপ মোডে চলে যায়। ল্যাপটপ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করে কেবলমাত্র ব্যাটারি সেভিং এর কাজের জন্য স্লিপমোড ব্যবহার করা উচিত। কাজ শেষ হয়ে গেলে পাওয়ার বাটন না চেপে অপারেটিং সিস্টেম থেকে শাট ডাউনের সাহায্যে ল্যাপটপ অফ করা উচিত।

ল্যাপটপ ব্যবহারের বিধিনিষেধ:

১. সবসময় খেয়াল রাখা উচিত, খাবার ও পানি থেকে ল্যাপটপ দূরে রাখা। শুকনো খাবার যেমন ল্যাপটপের কীবোর্ড অচল করে দিতে পারে, তেমনি পানি হচ্ছে ল্যাপটপের যম। কোনোসময় ল্যাপটপের অভ্যন্তরে পানি পড়ে গেলে প্রথমেই ল্যাপটপটিকে বৈদ্যুতিক সংযোগ হতে বিছিন্ন করতে হবে এবং উঁচু কোনো স্থানে খাঁড়াভাবে অন্তত ২৪ ঘন্টা রেখে দিতে হবে।

২. ল্যাপটপ চালানোর পূর্বে অবশ্যই হাত পরিষ্কার করে নেয়া ভাল। তৈলাক্ত বা ভেজা হাত টাচপ্যাড নষ্ট করতে দারুণ পারদর্শী। যাদের হাত ঘামিয়ে ওঠার সমস্যা রয়েছে তাদের উচিত, কিছুক্ষণ পর পর টিস্যু বা রুমাল দিয়ে হাতটা মুছে নেয়া।

৩. ফিফায় যেকোনো একটি ম্যাচে হেরে গেলে কিংবা মারাত্মকভাবে উইন্ডোজ হ্যাং করলে অনেকসময় মনে হয়, সামনের ল্যাপটপটিকে ছুঁড়ে ফেলে দিই। মনে রাখতে হবে, দোষটা কিন্তু কোনো যন্ত্রের হতে পারেনা। তাই কোনোক্রমেই ল্যাপটপকে আঘাত করা যাবেনা। সামান্য আঘাতের কারণে ল্যাপটপের স্ক্রিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে, নষ্ট হয়ে যেতে পারে গোটা কম্পিউটারটিই।

৪. ল্যাপটপের জন্য অবশ্যই ল্যাপটপ ক্যারিয়ার ব্যবহার করা উচিত। যেনতেন ব্যাগে ল্যাপটপ নিয়ে চলাফেরা করলে ল্যাপটপের উপর যেমন বাহিরের চাপ পড়ার ঝুঁকি থাকে, ঠিক তেমনি ল্যাপটপের বাহিরের অংশে বিভিন্ন আঁচরও পড়তে পারে। তাই এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

৫. ল্যাপটপের উপর কোনোক্রমেই ভারী কোনো বস্তু রাখা যাবেনা। ভারী বস্তু কখনো কখনো ল্যাপটপের স্ক্রিনের মারাত্মক ক্ষতি করে, যা পরবর্তীতে কালো পর্দা, ল্যাপটপ অন না হওয়া, ল্যাপটপের স্ক্রিনে ফাটল ধরার মত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

৬. প্রতিটি ল্যাপটপেই আসল লাইসেন্সড অপারেটিং সিস্টেম থাকে, যা ডেস্কটপ কম্পিউটারে আলাদা করে ইন্সটল করতে হয়। জেনুইন অপারেটিং সিস্টেম থাকার কারণে একটি অবশ্যকর্তব্য হলো, প্রতিনিয়ত ল্যাপটপের অপারেটিং সিস্টেম হালনাগাদ করা, হোক সেটা ম্যাক ওএস অথবা উইন্ডোজ। এছাড়াও ভাইরাসের মত শত্রুর সাথে যুদ্ধে প্রস্তুত থাকতে অ্যান্টিভাইরাসের প্রয়োজনীয়তা তো অতুলনীয় !

৭. অনেক সময় দেখা যায়, ল্যাপটপ প্রচন্ড ধীরগতিসম্পন্ন হয়ে পড়ে। এর একটা কারণ হতে পারে, অপারেটিং সিস্টেমে কিছু অবাঞ্ছনীয় ফাইল জমে থাকা। এসব ফাইল মুছে ফেলার জন্য উইন্ডোজের স্টার্ট মেনুতে গিয়ে Run ওপেন করতে হবে। এরপর টাইপ করতে হবে “recent” । ওকে ক্লিক করামাত্র অনেকগুলো ফাইল চলে আসবে এবং একে একে সবগুলো ফাইল delete করতে হবে।

এভাবে recent এর বদলে temp, %temp% , Prefetch টাইপ করেও একই কাজ করতে হবে।

৮. বেশিরভাগ ল্যাপটপেই প্রসেসর, র্যা ম কিংবা গ্রাফিক্স কার্ড- কোনোটাই পরিবর্তনযোগ্য না। তাই এসব যন্ত্রাংশের কখনোই “ওভারক্লক” করা উচিত না।

৯. ল্যাপটপ অন না হলে করণীয়-

বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে পেছন থেকে ল্যাপটপের ব্যাটারিটি খুলে কিছুসময় রেখে দেয়া।

অনেক ল্যাপটপের পাওয়ার বাটন ৩-৪ সেকেন্ড চেপে ধরে রাখলে ল্যাপটপ রিসেট নেয়। তবে প্রয়োজনীয় তথ্য অন্যস্থানে সংরক্ষিত না থাকলে ল্যাপটপ রিসেট দেয়া উচিত না।

ল্যাপটপ চার্জশূন্য থাকলে অনেকসময় এটি বুট নেয় না।

১০. ল্যাপটপের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ৬০-৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি গেলেই ল্যাপটপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। নতুবা ল্যাপটপে সার্কিট পুড়ে যাওয়ার মতও খারাপ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

১১. বছরে অন্তত একবার সার্বিক ল্যাপটপের সার্ভিসিং করানো উচিত। এতে তোমার ল্যাপটপ অনেকবছর টেকসই হবে।

কল্পনা করো তো কম্পিউটার-ল্যাপটপবিহীন একটা দুনিয়া? কল্পনা করতে কষ্ট হচ্ছে? হওয়ারই কথা! এরকম কল্পনা করতে না চাইলে আজই যত্ন নেয়া শুরু করে দাও তোমার ল্যাপটপটিকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ