লোক দেখানো ইবাদতের একটি আশ্চর্য ঘটনা 

ঢাকা, রোববার   ২৯ মার্চ ২০২০,   চৈত্র ১৫ ১৪২৬,   ০৪ শা'বান ১৪৪১

Akash

লোক দেখানো ইবাদতের একটি আশ্চর্য ঘটনা 

নুসরাত জাহান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৫৬ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ধর্মব্যবসায়ী শব্দটিকে আমরা কেউ ভালো মনে করি না। অর্থাৎ ধর্মকে পুঁজি করে যারা নিজের আখের গোছাতে চায়। সামান্য পার্থিব স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করে, তাদের কেউ ভালো দৃষ্টিতে দেখে না। ধর্মীয় অনুসরণের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মহান আন্তাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যশ-খ্যাতি, ধন-সম্পদ, পদ মর্যাদা এগুলোর কোনো কিছুই উদ্দেশ্য বানানো উচিত নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ধর্মকে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা অতীতেও করা হয়েছে। এখনো থেমে নেই। এমনি একটি ঘটনা নিম্নে তুলে ধরা হলো।

খেলাফতের মসনদে সমাসীন ন্যায় ও ইনসাফের প্রতীক, বিখ্যাত উমাইয়া শাসক হজরত উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.)। তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর জীবন যাপনকারী। অত্যন্ত ইবাদতগুজার ও দুনিয়াবিমূখ ব্যক্তি।

তার শাসনামলে হিলাল ইবনে আবি বুরদাহ নামক এক ব্যক্তি মনে মনে ফন্দি আঁটল, খলীফা যেহেতু ইবাদতগুজার ইবাদতবন্দেগী অনেক পছন্দ করেন। খলীফা যে মসজিদে নামাজ আদায় করেন সেখানে গিয়ে আমিও যদি প্রচুর ইবাদত বন্দেগী করে তার দৃষ্টিআকর্ষণ করতে সক্ষম হই, তাহলে আর আমাকে পায় কে। আমার ইবাদতে খুশি হয়ে তিনি নিশ্চয়ই আমাকে বড় কোনো পদে নিয়োগ দেবেন।

যেই কথা সেই কাজ। সে গিয়ে খুবই একাগ্রচিত্রে বিরামহীনভাবে নামাজ তেলাওয়াত জিকির ইত্যাদিতে মশগুল হয়ে গেল। কারো সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলতো না।  লোকেরা তো অবাক! এই বুযুর্গ দরবেশ কোত্থেকে এলেন?

অল্পদিনেই তার সুনাম, সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে খলীফারও তা কর্ণ গোচর হলো। খলীফা তার ইবাদতের একাগ্রতায় মুগ্ধ হয়ে এক সহকর্মীকে বললেন, লোকটা তো অনেক একাগ্রচিত্তে তন্ময় হয়ে ইবাদত করছে। আমার মনে হয়, এই ইবাদতের পেছনে তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। খালিছ আল্লাহর জন্যই ইবাদত করছে।

খলীফার সহকারীর নাম আলা ইবনে মুগীরা। তিনি বললেন, আমিরুল মুমিনীন! এত তাড়াতাড়ি কাউকে বিশ্বাস করবেন না। তার মনে কী আছে, তা আজই বের করার ব্যবস্থা করছি।

ওইদিন মাগরিবের পর নামাজ শেষে যে যার যার বাড়ি চলে গেলেন। হেলাল নফল নামাজ পড়ছিলেন। আলা ইবনে মুগীরা আস্তে আস্তে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। পাশে গিয়ে নিচু স্বরে বললেন, দুই রাকাত পড়ে তাড়াতাড়ি সালাম ফিরিয়ে দাও। জরুরি কথা আছে।

সে তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করল। আলা ইবনে মুগীরা এদিক ওদিক তাকিয়ে যেন অতি গোপন কথা বলছেন এমনভাবে বললেন; কাছে এসো। জানো তো, দেয়ালেরও কান আছে। কেউ শুনে ফেলতে পারে। 
সে কাছে আসলে তিনি প্রায় ফিসফিস করে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, তোমার তো জানা আছে আমি আমিরুল মুমিনীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক। আমি কোনো অনুরোধ করলে তিনি সাধারণত প্রত্যাখান করেন না। আমি যদি আমিরুল মুমিনীনের নিকট সুপারিশ করে তোমাকে ইরাকের গভর্নর বানিয়ে দেই, তাহলে কেমন হয়?

হেলালের চোখ দু’টো মুহূর্তেই লোভে চকচক করে উঠল। মনে মনে বলল, যাক, আমার এতদিনের পরিশ্রম তাহলে বৃথা যাচ্ছে না। এবার আমার স্বপ্ন সত্যি হতে চলল। কল্পনার চোখে ভেসে উঠল ইরাকের গভর্নরের রাজপ্রাসাদ। সেবায় নিয়োজিত কর্মচারিরা সবাই তটস্থ হয়ে আছে। এলাকার গণ্যমান্য লোকেরা আমীর বলে সম্মান জানাচ্ছে। দস্তরখানে নানা মুখরোচক শাহী খাবার। মাস শেষে রাজকীয় বেতন। এসব ভেবে স্বপ্নের জগতে হারিয়ে গিয়েছিল। আলা ইবনে মুগীরার কথায় বাস্তবে ফিরে এলো।

কি হলো, কোথায় হারিয়ে গেলেন? না, ঠিক আছি। তা আপনি যখন এতো করে বলছেন, আমি কীভাবে রাজী না হয়ে পারি বলুন। আপনি আমিরুল মুমিনীন এর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই।

তা তো বুঝলাম, কিন্তু আপনাকে ইরাকের গভর্নর বানিয়ে দিলে আমার কী লাভ? আমি কী পাব?

আপনিই বলুন, কী চান আপনি? 
পুরো এক বছরের বেতন ১ লক্ষ ২০ হাজার দিরহাম আমাকে দিতে হবে। কি রাজী?
আমি রাজী। 
উঁহু, মুখের কথায় আজকাল কেউ বিশ্বাস করে না। দেখা যাবে তুমি গভর্নর হওয়ার পর আমাকে চিনতেও পারছ না। রাজী থাকলে লিখিত দাও যে গভর্নর হওয়ার পর আমাকে ১ লক্ষ ২০ হাজার দিরহাম দিতে তুমি বাধ্য থাকবে।

হেলাল তখন ক্ষমতার নেশায় বিভোর। ভালো-মন্দ চিন্তা করার মানসিক অবস্থা ছিল না।
তৎক্ষণাৎ এই কথাগুলো লিখে নিচে নিজের নাম দস্তখত করে দিল। 
আলা ইবনে মুগীরা মোটেও দেরি করলেন না। কাগজটি নিয়ে তৎক্ষণাৎ খলীফার চোখের সামনে মেলে ধরলেন।

এই যে আমীরুল মুমিনীন! আপনি যাকে খাঁটি ইবাদতগুজার মনে করেছিলেন তার আসল উদ্দেশ্য নিজ চোখেই দেখুন। এ জন্যই এত লম্বা লম্বা নামাজ, তেলাওয়াত, জিকির করা হচ্ছিলো। থলের বিড়াল এখন বেরিয়ে এসেছে। তাই বলেছিলাম, এতো তাড়াতাড়ি কাউকে ভালোর সনদ দেবেন না।

উমর ইবনে আব্দুল আযীয (রা.) হেলালের এহেন উদ্দেশ্যে যারপরনাই বিস্মিত হলেন! ভাবলেন, মানুষের মন এতো ছোট? সামান্য পার্থিব ক্ষমতার লোভে চিরস্থায়ী ইবাদতগুলোকে নষ্ট করছে। তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হলেন। ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হয়ে গেলেন।

সূত্র : প্রতিভার গল্প

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে