লুয়াং প্রেবাং

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৫ ১৪২৭,   ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

লুয়াং প্রেবাং

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:৪২ ২৩ জুন ২০২০  

ছবি: আন্তর্জাল

ছবি: আন্তর্জাল

“ভোরের দিকে এলেম, যেখানে মিঠে শীত সেই পাহাড়ের খাদে;
সেখানে বরফ-সীমার নীচেটা ভিজে-ভিজে, ঘন গাছ-গাছালির গন্ধ।
নদী চলেছে ছুটে, জলযন্ত্রের চাকা আঁধারকে মারছে চাপড়।
দিগন্তের গায়ে তিনটে গাছ দাঁড়িয়ে, 
বুড়ো সাদা ঘোড়াটা মাঠ বেয়ে দৌড় দিয়েছে”। -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (তীর্থযাত্রী) 

বিমানবন্দর থেকে হোটেল। কাছেই। টালি আর কাঠের তৈরি হোটেল। বাংলো ধরনের। বিকেলের আলো এসে পড়েছে এর চূড়ায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ এর কথা মনে পড়ে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলেই যেন বহু জন্মের প্রাচীন ইতিহাস ডালপালা মেলে চোখের সামনে এসে দাঁড়াবে! 

ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দিয়েই বলল, “শহরের নামী হোটেলগুলোর একটা। ‘প্রিন্সেস ডেলা হোটেল’। 
বললাম, "ডেলা কি কারো নাম?"
"আমাদের আগের রাজার মেয়ে। তিনিই এই হোটেলের মালিক। তার নামেই হোটেলের নাম”! 
হয়ত বা ডাক নাম। আমি চমৎকৃত। জিজ্ঞেস করলাম, “রাজা কই?” নৈর্ব্যক্তিক বদনে সে বলল, “নির্বাসনে। এখন বেঁচে নেই।"

লাওসের ইতিবৃত্ত থেকে জানা যায়, লাওসের এক রাজ্যচ্যুত শাসক তার পুত্র ফানাংকে নিয়ে কম্বোডিয়ার রাজা জয়বর্মণের (১৩২৭-৫৩ অব্দ) আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফানাং বয়োপ্রাপ্ত হলে জয়বর্মণ নিজের  কন্যার সাথে বিয়ে দেন এবং তাকে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পন করেন।

ফানাং লাওসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো একত্রিত করে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।পরবর্তীতে তিনি লাওসে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। অনেকটা সম্রাট অশোকের মত। লাওসে রাজা ফানাং ও তার স্ত্রীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম এখনও সগর্বে  বিরাজ করছে। 

দীর্ঘদিন থাইল্যান্ড ও তৎপরবর্তীতে ফ্রান্সের অধীনে থাকার পর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর লাওস স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পৃথিবীর বুকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু ফরাসি উপনিবেশবাদের অপচ্ছায়া তাদেরকে ছাড়ে না। ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয়বারের মত ফরাসিরা লাওস আক্রমণ করে দখল করে নেয়। লাওসকে ফ্রেঞ্চ প্রোটেকটরেটের মর্যাদা দেয়া হয়।

 লাওসের জনগণ পুনরায় স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৫৩ সনে ‘দিয়েন বিয়েন ফু’তে ভিয়েতনামীদের হাতে ফরাসিদের চূড়ান্ত পতনের পর জেনেভা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়া স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু শান্তি এই অঞ্চলে অধরাই রয়ে যায়। ১৯৬৪ সালে পুনরায় আমেরিকানদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে লাওস।

লাওসের শেষ রাজার নাম সাভাং ভাথানা ( Savang Vatthana), যিনি  ফরাসি উপনিবেশকে ধারণ করেছিলেন। কিন্তু রাজ পরিবারেরই অপর সদস্য প্রিন্স সউফানোভং (Souphanouvong) ভিয়েতনামের কম্যুনিস্ট পার্টির সহায়তায় ‘প্যাটেট লাও’ নামক পার্টির জন্ম দেন এবং দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করেন। 

শুরু হয় ইন্দোচীনের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের  ‘গোপন যুদ্ধ’ (Secret war)। কমিউনিস্টরাও উত্তর-পূর্ব লাওসকে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে আক্রমণের স্প্রিংবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। লাওসের পূর্বাংশ জুড়ে বিশাল এলাকা ব্যবহৃত হয় দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াতে কমিউনিস্ট গেরিলাদের রসদ সামগ্রী সরবরাহের পথ হিসেবে। এটাই ইতিহাসের বিখ্যাত বা কুখ্যাত ‘হোচি মিন ট্রেইল’ নামে পরিচিত।

বিনিময়ে আমেরিকান বিমান বাহিনী লাওসের ওপর দিয়ে বোমার বৃষ্টিপাত শুরু করে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩ অব্দি। এই এক দশকের ভেতরে আমেরিকা লাওসের ভূমিতে ১,৮৯৮,২৬০ মেট্রিক টন বোমা ফেলে। ধারণা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ এবং প্রশান্ত মহাসাগর থিয়েটারে সম্মিলিতভাবে আমেরিকার নিক্ষেপ করা বোমার পরিমাণের চেয়ে এই পরিমাণ ছিল বেশি এবং পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বোমা নিক্ষেপের ইতিহাস। লাওসের প্রতিটি ব্যক্তির বিপরীতে নিক্ষিপ্ত বোমার পরিমাণ ছিল দুই টন। তবে এই বোমার প্রায় এক তৃতীয়াংশই অবিস্ফোরিত রয়ে যায়। ফলে লাওসের অনেক জায়গাই এখনও মনুষ্য বসবাস বা গমনাগমনের জন্যে অযোগ্য! 

এর পরেও কমিউনিস্টরা বিজয়ী হয়। ২৩ আগস্ট, ১৯৭৫ তারিখে প্যাথেট লাও ভিয়েনতিয়েন দখল করে। প্রিন্স সউফানোভং নিজেকে লাওসের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন। ১৯৭৭ সালে রাজা সাভাং ভাথানা, রানী, দুই রাজপুত্র এবং আরো কয়েকজনকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অজ্ঞাত স্থানে নির্বাসনে প্রেরণ করা হয়। রাজ প্রাসাদকে পরিবর্তিত করা হয় জাদুঘরে। 

রাজ পরিবার সম্পর্কে  সম্পর্কে আর তেমন কিছুই জানা যায়নি। শুধুমাত্র ১৯৭৮ সালে সরকার কর্তৃক ঘোষণা দেয়া হয় যে, রাজা সাভাং ভাথানা, রানী Khamphoui এবং Crown Prince Vong Savang মৃত্যু বরণ করেছেন ম্যালেরিয়া রোগে। পৃথিবীর অনেক পরাক্রমশালী সম্রাট বা রাজাদেরই অন্তিম পরিণতির মত। সম্রাট নেপোলিয়ন, মুঘল শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ এবং বর্তমান সময়েরও অনেকের মত। 

আমি হোটেলের রিসেপশনে দাঁড়িয়ে চেক ইন করছি। হঠাৎ আমার ঠিক পেছন থেকে স্পষ্ট বাংলায় উচ্চারণ, “দেশ থেকে কবে আসলেন?” 

আমি ভীষণ অবাক। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি কাল শ্মশ্রু মণ্ডিত, ধবল ফর্সা বর্ণের মাঝ বয়সী একজন! আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন।

নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, “দেশ থেকে নয়, কম্বোডিয়া থেকে এসেছি। ওখানে জাতিসংঘের হয়ে কাজ করছি। আপনি?” 

ভদ্রলোক নিজ থেকেই পরিচয় দিলেন। নাম এন্ড্রু জ্যাকসন। ব্রিটিশ নাগরিক। এখানে ইউনিসেফের প্রধান। 
বললেন, “আমি অনেক বছর বাংলাদেশে ছিলাম। আপনাদের উড়ির চরে যে ফ্লাড এবং সাইক্লোন সেলটারগুলো করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই আমার তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়েছিল”।

একটু থামলেন। পরিস্কার বাংলায় কথা বলছেন! আমি বিস্মিত। বললাম, “আপনি তো দেখি খুব সুন্দর বাংলায় কথা বলেন।”

তিনি আবারও শুরু করলেন, “আপনাদের দেশে থাকতে রীতিমত গল্প করতে পারতাম। এখন ভুলে যাচ্ছি। ক’দিন থাকবেন আপনি এখানে?” 

আমি তিন চারদিন থাকব-জানাতেই তিনি প্রস্তাব করলেন, “আমার স্ত্রী এবং সন্তানেরা দেশে (লন্ডনে) বেড়াতে গেছে। ফিরবে এক মাস পর। আপনার হোটেলে উঠার দরকার কি? আপনি বরং আমার সাথে আমার বাংলোয় চলেন। অনেকদিন পর মন খুলে বাংলায় কথা বলব আপনার সাথে!”

আমি আপ্লুত। বিনীতভাবে তাকে বললাম, “আমি আপাতত এখানেই উঠতে চাচ্ছি। পরে আপনার বাসায় যাব”। 
তিনি বললেন, “সন্ধার পর আমি আসব আপনাকে নিতে। রাতে ডিনার করবেন আমার সাথে।”
 
বুঝতে পারলাম প্রকৃতপক্ষে তার ভেতরে কাজ করছে বাংলায় কথা বলার আকুলতা! জীবনানন্দ দাশের ওপরে পৃথিবী বিখ্যাত গবেষক ক্লিন্টন বি সিলি’র নাম মনে পড়ে গেল। দেশ-কালের  দূরত্ব অনেক সময়ে কোন ফ্যাক্টরই নয়। আমি রাজী হয়ে গেলাম।

সারা বিকেল। ঘুরে বেড়ালাম পায়ে হেঁটে হেঁটে। একা একা। রাস্তার পাশেই একটু পর পর দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ মন্দির বা প্যাগোডা। উঁচুনিচু আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। ছোট ছোট পাহাড়। গাঢ় সবুজে ঢাকা। পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলেছে ঝর্ণা অথবা খাল। স্বচ্ছ জলের নীচে নুড়ি পাথর বিছানো। পাড়ের ওপরে টঙের মাচান। মাচানের ওপরে স্থাপন করা হয়েছে খাবারের রেস্টুরেন্ট অথবা আবাসিক হোটেল। নামকিন নদীর জলের ওপরে বাঁশের তৈরি সাঁকো। দুই দুই করে শিশু বা কিশোর বৌদ্ধ মঙ্করা পার হয়ে যাচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাচ্ছে শিশু মঙ্করা। যেন বা স্বর্গের সিঁড়ি বেঁয়ে! 

বিকেলের অনির্বচনীয় আলোতে লুয়াং প্রেবাংকে আমার নিকটে মনে হয় তীর্থস্থান।
“মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি, 
না এলেই ভালো হত অনুভব করে;
এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে”। - জীবনানন্দ দাশ

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ