লিংকন হত্যাকান্ড

ঢাকা, সোমবার   ২০ মে ২০১৯,   জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪২৬,   ১৪ রমজান ১৪৪০

Best Electronics

লিংকন হত্যাকান্ড

সৌমিক অনয়

 প্রকাশিত: ১৫:২৫ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৫:২৫ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান পৃথিবীর পরাশক্তিদের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নাম সকলের প্রথমে আসে।সামরিক শক্তি থেকে শুরু করে বিজ্ঞান সকল ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র প্রথম।কিন্তু দেড়শ বছর পূর্বে দেশটি এমন ছিল না।যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নের পিছনে এবং পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত ঘটাতে যে সকল ব্যক্তিদের নিরলস পরিশ্রম রয়েছে তাদের মধ্যে আব্রাহাম লিংকন অন্যতম।তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম রাষ্ট্রপতি।মার্কিন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি। দাসত্ব প্রথা অপসরণ থেকে শুরু করে মার্কিন গৃহযুদ্ধ সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে লিংকন এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান।কিন্তু আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের এই কারিগরের ভাগ্যে লেখা ছিল অকাল মৃত্যু তাও আবার এক মার্কিনের হাতেই। তো কীভাবে ঘটেছিল লিংকন হত্যাকান্ড? আর এর পিছনের কারণই বা কী ছিল?

আব্রাহাম লিংকন এর জন্ম হয়েছিল কেন্টাকি প্রদেশের হার্ডিং কাউন্টিতে ১৮০৯ সালের  ১২ ফেব্রুয়ারি। প্রেসিডেন্ট হবার পূর্বে একজন স্বশিক্ষিত আইন ব্যবসায়ী সঙ্গে একজন ভাল বক্তাও ছিলেন তিনি। যা তার রাজনৈতিক জীবনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।১৮৬০ সালে লিংকন রিপাবলিকানদের প্রেসিন্ডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৮৬১ সালে বিপুল ভোটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।প্রেসিডেন্টে পরিণত হবার পরই লিংকন দাশপ্রথা নিধনে কাজ শুরু করে।কিন্তু সাদা চামড়ার মার্কিনরা কৃষ্ণাঙ্গদেরকে দাশপ্রথা থেকে মুক্তি দিতে রাজি ছিল না।তাছাড়াও দক্ষিণের প্রদেশগুলো একজন উত্তরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে মেনে নিতে পারছিল না। তাই দক্ষিণের ৭টি প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন ত্যাগ করে কনফেডারেট স্টেট অফ আমেরিকা গঠন করে।পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ইউনিয়ন নৌবহরে কনফেডারেটদের আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেলে দেয় গৃহযুদ্ধের দিকে।লিংকন নিজেকে একজন ভাল সামরিক কুশলী হিসেবেও প্রমান করেন।লিংকন দক্ষতার সঙ্গে কনফেডারেটদের পরাজিত করেন এবং ১১ এপ্রিল ১৮৬৫ সালে ৪ বছরব্যাপী চলা গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি টানেন। এদিকে, যুদ্ধ সমাপ্ত হলেও লিংকন এর বিপদের সমাপ্তি ঘটেনি। যুদ্ধ সমাপ্তির মাত্র ৩ দিন পরে ১৪ এপ্রিল ,১৮৬৫ সালে লিংকন তার স্ত্রী’র সঙ্গে নাটক দেখা অবস্থায় একজন অভিনেতা তার সিঙ্গেল শটে পয়েন্ট ৪৫ ক্যালিবার পিস্তল থেকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে লিংকনের মাথায় গুলি করে  এবং পরের দিন প্রথম প্রহরে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কে করেছিল লিংকনকে হত্যা? এর পিছনের কারণই বা কী ছিল?

লিংকন হত্যাকারীর নাম ছিল জন উইকিলিস বুথ। পেশায় একজন সফল অভিনেতা ছিলেন তিনি। জন্মগতভাবে দক্ষিণের হলেও জন বসবাস করতেন উত্তরে। গৃহযুদ্ধের সময় জন তার পেশাগত কারণে যুদ্ধে যোগ দেয় না।জন্মগতভাবেই তিনি কনফেডারেটদের সমর্থক ছিলেন। তাই শেষ দিকে যুদ্ধের মোড় ঘুরাতে জন এবং তার ৬ জন সহযোগী প্রেসিডেন্টকে অপহরণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।এর জন্য তারা ২০ মার্চ ১৮৬৫ সাল ঠিক করেন।কিন্তু তারা যেখান থেকে লিংকনকে অপহরণ করবেন বলে ঠিক করেন লিংকন সেখানে উপস্থিত হন না। ফলে তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এবং এর দু’দিন পরেই ইউনিয়ন সৈন্যদের হাতে রিচমন্ডের পতন হয়।অবশেষে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে জন লিংকনকে হত্যা করেন।লিংকনকে গুলি করে বুথ প্রসেডেন্টাল বক্স থেকে স্টেজে লাফ দেয় এবং ভার্জিনিয়ার স্টেট মটো চিৎকার করে বলেন।স্টেজে লাফ দেয়ার সময় বুথ পায়ে আঘাত পায় এবং ঐ অবস্থায় পালিয়ে যায়। বুথ পালিয়ে ছদ্দবেশ ধারণ করে এবং একজন কনফেডারেট গোয়েন্দার সহায়তায় পায়ের চিকিৎসা করেন।পরবর্তীতে বুথ প্রায় ৮ দিন পলাতক অবস্থায় থেকে ভার্জিনিয়াতে যান।সেখানে এই ষড়যন্ত্রের আরেকজন সহযোগী হেরল্ডের সঙ্গে একটি ফার্ম হাউজে আশ্রয় নেয়।অপরদিকে, বুথকে গ্রেফতারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ম্যানহান্ট শুরু হয়।প্রায় ১০ হাজার সৈন্য এবং পুলিশ বুথকে ধরার জন্য মাঠে নামেন।অবশেষে প্রেসিডেন্ট হত্যার ১০ দিন পর সৈন্যরা সেই ফার্মহাউজের ঠিকানা পেয়ে ২৫ এপ্রিল সৈন্যরা ফার্মহাউজটি ঘেরাও করে এবং বুথকে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।কিন্তু বুথ অস্বীকৃতি জানালে সৈন্যরা ফার্ম হাউজটিতে আগুন জ্বলিয়ে দেয়।আগুন জ্বলালে হেরল্ড ফার্ম হাউজটি থেকে বের হয়ে যায়।পরবর্তীতে সৈন্যরা ফার্মহাউজে প্রবেশ করে এবং বুথকে অর্ধমৃত অবস্থায় গ্রেফতার করে। রাজধানী ওয়াশিংটনে নিয়ে আসার সময় বুথ মৃত্যুবরণ করে।

হেরল্ডের সহায়তায় পুলিশ বুথের অন্য চার জন সহযোগীকে গ্রেফতার করে।গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন ছিলেন ম্যারি স্টুয়ার্ট। অচিরেই হত্যার কারণ জানতে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল।এই তদন্ত কমিটি ১৮ জুন তাদের রিপোর্ট পেশ করে।রিপোর্টে বলা হয় লিংকন হত্যার পেছনের কারণ ছিল হত্যাকারীদের কনফেডারেট স্টেট এর প্রতি অনুগত্য। কিন্তু বুথকে গোপনে সমাহিত এবং বুথের লাশ কবর থেকে গায়েব হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট মানে না।তারাপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হত্যার পিছনের কারণ হিসেবে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র আছে বলে মনে করে। যা ২০১৩ সালে প্রমাণিত হয়।কিন্তু ষড়যন্ত্র কী ছিল তা এখন ও অমীমাংসিত। অবশেষে ৭ জুলায় লিংকন হত্যার সকল সহায়তাকারীর ফাসি কার্যকর করা হয়।ম্যারি স্টুয়ার্ট ছিলের‌্যযুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম নারী যার মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। প্রেসিডেন্ড লিংকন মারা যাওয়ার পর তার মৃতদেহের পোস্টমর্টাম করা হয়। রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে মস্তিস্কের ক্ষতি এবং রক্তক্ষরণ দেখানো হয়। প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর সংবাদে পুরো যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ জাতি যাদের মুক্তির জন্য লিংকন কাজ করেছিল ভেঙে পড়ে।মৃত্যুর ৩দিন পর লিংকন এর মৃতদেহ ওয়াশিংটনের রতুন্ডা চার্চে সাধারন মানুষের জন্য রাখা হয়।অবশেষে ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্টের মরদেহ একটি ট্রেনে করে স্প্রিং ফিল্ডে নিয়ে যাওয়া হয়।যেখানে প্রসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে সমাহিত করা হয়েছিল।প্রেসিডেন্টের মৃতদেহবাহী ট্রেনের দু’পাশে প্রেসিডেন্টকে সন্মান জানানোর জন্য লাখ লাখ শোকাহত মানুষ জড়ো হয়। আব্রাহাম লিংকন এর মৃত্যুর পরের দেড়শ বছরে যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দেশে পরিনত হলেও মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাসিডেন্টের মৃত্যু রহস্য আজো অমীমাংসিত।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস

Best Electronics