Exim Bank
ঢাকা, শনিবার ২৩ জুন, ২০১৮
Advertisement

লজ্জিত হওয়ার শিক্ষা চাই

 রনি রেজা ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১২:৫২, ১১ মার্চ ২০১৮

৪৮৮ বার পঠিত

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

আমি সংগত কারণেই ধর্ষণ, নারী নির্যাতনের সংবাদ এড়িয়ে যাই। হোক খবর পড়ার সময় বা প্রকাশের সময়। এর অনেকগুলো কারণ আছে। প্রথমত, পড়তে ভালো লাগে না। কষ্ট, ক্ষোভ, লজ্জা চেপে ধরে। নিজের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়। এর রোধে কিছুই করতে পারছি না। কোনো প্রতিকার পদক্ষেপ নিতে পারিনি। না আমি। না রাষ্ট্র। এ কষ্ট কুড়ে কুড়ে খায়।  এক ধরনের আতঙ্ক অনুভব করি। থাকে অসহায়ত্বও। প্রতিটি খবর পাঠের সময় মনে হয় নির্যাতিত আমাকে ধিক্কার দিচ্ছে। গালি দিচ্ছে। সব শেষে আমার অসহয়াত্বের প্রতি করুণার হাসি নিক্ষেপ করছে। পরের কারণটি পূর্ব অভিজ্ঞতার ফল।

ইতিপূর্বে দেখেছি খবর প্রকাশ হওয়ার পর তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ বা তৎপড়তা থাকলেও পরে তা মিইয়ে যায়। হারিয়ে যায় পরের ঘটনার গর্ভে। উদাহরণ অসংখ্য। তনু, রিশা, খাদিজার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। আবার কিছু বিচার প্রক্রিয়া আশা জাগায়। কিছুদিন আগেই রূপা হত্যার বিচার হয়েছে। ফলে আশার প্রদিপে তেলের সঞ্চার ঘটেছে। এখনো যেগুলোর বিচার হয়নি; হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এরপরও কেন বেড়ে চলছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন? মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নারী নির্যাতনের সংখ্যা ৯১৯৬ টি। এর মধ্যে ৬৮ ভাগ ঘটনা নথিভুক্তই হয়নি। এর আগের চিত্রগুলোও ভয়াবহ। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১৫৮ জন। এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ২০ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ২ জন। ২০১৪ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৬৬ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২২৭ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৬৬ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১২ জন। ২০১৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮১৪ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৬ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৭১ জন,ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৬ জন। ২০১২ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮০৫ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৯৭ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৭৫ জন,ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০ জন। ২০১১ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭১১ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৩৯ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৯০ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৩ জন।২০১০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৫৯ জন, এর মধ্যে নারী ও শিশু সহ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২১৪ জন, ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ৯১ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৭ জন। এখানে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় নারী নির্যাতনের সংবাদ আসলে খুব কম সংখ্যকই সংবাদ মাধ্যমে আসে। আর এ বছর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে দেখা যায়, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ৭৪১ নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

এর মধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৭৬ এবং জানুয়ারিতে মাসে ৩৬৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই হিসাবই বলে দেয় নারী নির্যাতনে নানা ধরনের আইন করা হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ার কারণে কমছে না নারী নির্যাতন। এ পরিসংখ্যানগুলো আমাদের বড় বড় অর্জনকে ম্লান করে দেয়। উদ্যম হারায় তারুণ্য। আমরা লজ্জিত হই। কিন্তু অবাক করার বিষয় লজ্জিত হওয়ার ক্ষমতাটুকুও নিজের হারিয়ে ফেলেছি। হর হামেশা প্রতিদিনই নির্যাতন, ধর্ষণের খবর আর পাঁচটি সাধারণ ঘটনার মতোই পড়ে যাচ্ছি। একটু শিহরণ জাগছে না। বরং অনেকে ঘটনাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালায়। ধর্ষীতা বা নির্যাতিতার ত্রুটি খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সর্বশেষ ৭ই মার্চে বাংলামোটরে এক শিক্ষার্থীর নির্যাতনের ঘটনায় অনেকের নির্লজ্জতা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। নগ্নভাবে ঘটনাকে মিথ্যা বানানোর পায়তারা করেছেন অনেক বুদ্ধিজীবী নামধারী। যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় তারা প্রত্যকেই দেখেছেন নিশ্চয়ই। উদাহরণের প্রয়োজন নেই। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে বুধবার বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভা ছিল। ক্ষমতাসীন দলটির বিভিন্ন ওয়ার্ড শাখা এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগের মত সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে মিছিল নিয়ে ওই জনসভায় যোগ দেন। বাংলামোটরে এরকম একটি মিছিলের মধ্যে পড়ে একদল যুবকের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা এক তরুণী ফেইসবুকে পোস্ট করলে তা ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, কলেজ থেকে ফেরার সময় এই জনসভার কারণে বাস না পেয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাংলামোটরে আসার পর একটি মিছিলে থাকা একদল যুবক তাকে ঘিরে ফেলে যৌন নিপীড়ন করে।

তিনি ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, ১৫-২০ জন যুবক তাকে যৌন নিপীড়ন শুরু করলে এক পুলিশ সদস্য তাকে উদ্ধার করে একটি বাসে তুলে দেয়। ক্ষোভের সঙ্গে ওই তরুণী লেখেন, এরপর তিনি বাংলাদেশেই থাকবেন না।

প্রথমে পোস্টটি পাবলিক থাকলেও পরে তা ‘অনলি মি’ করে দেন ওই শিক্ষার্থী।

এর ব্যাখ্যায় আরেক পোস্টে তিনি লেখেন- পোস্টটি রাজনৈতিক উসকানিমূলকভাবে শেয়ার করা হচ্ছিল বলে তিনি তা ‘অনলি মি’ করেছেন। এ বিষয়য়ে বৃহস্পতিবার রমনা থানায় একটি মামলা করেছেন তার বাবা। রাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তারা বুধবার রাতেই ওই তরুণীর বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে এসেছেন। বাংলামোটরে শিক্ষার্থীকে হয়রানির ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পাওয়ার পর জড়িতদের চিহ্নিত করার চেষ্টাও চলছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের আইডেনটিফাই করার চেষ্টা হচ্ছে, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনারাও জানতে পারেন, কারা কারা এতে জড়িত।

`অপরাধী যে দলেরই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা, থানায় মামলা দায়ের ও সর্বশেষ তৎপরতায় আশা করা যায়, এর একটা কিছু হবে। কিন্তু নির্যাতনের পর থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের আগ পর্যন্ত যে নগ্ন পক্ষপাত হয়েছে। তার বিচার কে করবে? বুধবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে বেশ কয়েকটি স্ট্যাটাস চোখে পড়ে। যেগুলোতে ঘটনা মিথ্যা বলে দাবি করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার মেয়েটি ৭ই মার্চকে কলঙ্কিত করতে এ অপপ্রচার করেছেন বলেও দাবি করেছেন অনেকে। কেউ কেউ তাদের দাবির পক্ষে যুক্তিও দিয়েছেন। এমন ঘটনাও নতুন নয়। তবে এবার কিছু মুখোশধারীদের নগ্নতায় একটু বেশিই লজ্জিত হয়েছি। এরাই সব সময় প্রকাশ্যে-গোপনে ঘটনার ভেতর বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। যা ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে। এরাও নির্যাতনকারী থেকে কম অপরাধী নয়। এদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা সময়ের দাবি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এর দায় ভার পুরোপুরি লেখকের। ডেইলি বাংলাদেশ-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বাধিক পঠিত