Alexa লক্ষ্মীপুরের ৩ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েরই বেহাল দশা

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৫ ১৪২৬,   ২০ মুহররম ১৪৪১

Akash

লক্ষ্মীপুরের ৩ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েরই বেহাল দশা

 প্রকাশিত: ২০:৫৩ ২২ অক্টোবর ২০১৭  

রাজীব হোসেন রাজু, লক্ষ্মীপুর: জেলার ৫টি উপজেলা ও ৬টি থানার মধ্যে মাত্র ৩টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এ জেলার অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ছিল আলাদ্বীনের আশ্চর্য প্রদীপ আর অমূল্য রত্নের চেয়েও বেশী আকর্ষণীয়। তবে বর্তমানে এ তিন বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের কাছে এখন গলার কাটা আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া অন্য কিছু নয়।

বিদ্যালয় তিনটি হলো লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, রামগঞ্জ সরকারি এম ইউ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। বর্তমানে এই তিনটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারি এই তিনটি বিদ্যালয়ের দুটি লক্ষ্মীপুর শহরের উপকণ্ঠে। অপরটি রামগঞ্জ উপজেলার প্রাণ কেন্দ্রে। এই তিনটি বিদ্যালয়ের পড়ালেখা করছেন জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন বিভাগ ও অফিসের সর্বোচ্চ কর্ণধারদের সন্তানরা। আর এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায়ও রয়েছেন তারাই। অথচ এই তিনটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট দূর করতে কারো যেন কোন মাথা ব্যাথা নেই।

অনুসন্ধানকালে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৪৬০ জন ছাত্র-ছাত্রীর জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৬ জন। ১৭ জন শিক্ষকের মধ্যে এখানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৬ জন। এই বিদ্যালয়ে ইংরেজির শিক্ষক নেই ৫ বছর ধরে। গণিতের শিক্ষক নেই দুই বছর ধরে। আর বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই ছয় বছর ধরে। সহকারী প্রধান শিক্ষক নেই বহু বছর ধরে। এই বিদ্যালয়ে অফিস সহকারির পদও শূন্য। পাঠদানের পাশাপাশি অফিস সহকারীর কাজও করতে হয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ছিল মাত্র ৪ জন। এক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র দুই জন। সর্বসাকুল্যে এখন শিক্ষক সংখ্যা মাত্র ৬ জন।

এ দিকে চলতি বছর এ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে ৭০ জন, পাশ করেছে মাত্র ১৪ জন। গত বছর পরীক্ষা দিয়েছিল ৬৫ জন, পাশ করেছিল মাত্র ২৪ জন। আর এর আগের বছর পরীক্ষা দিয়েছিল ৭১ জন পাশ করেছিল ২৫ জন। বর্তমানে অভিভাবকরা তাদের ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যত চিন্তা করে অন্য বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করছেন। ১৯১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ১৯৮৭ সালে সরকার জাতীয়করণ করার পর এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান দিন দিন নিম্মগামী হতে থাকে। যা এখন চরম বিপর্যয়ে পৌঁছেছে। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট নিয়ে মাউসিতে আলোচনা হলেও কাজের কাজ কোন কিছুই হয়নি।

অপর দিকে লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৩ জন শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ২৩জন। এই বিদ্যালয়ে পদার্থ, রসায়ণ, জীব বিজ্ঞান, উচ্চতর গণিতের শিক্ষক নেই দীর্ঘদিন ধরে। এর মধ্যে রসায়নের শিক্ষক নেই গত ১৭ বছর ধরে। দুই শিফট এর এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে এক হাজার দুইশত জন। এদের বড় একটি অংশ এই জেলার কর্ণধারদের সন্তান। চলতি বছর এই বিদ্যালয় থেকে ২৪৫ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছে ২১৫জন। জিপিএ -৫ পেয়েছে মাত্র ৩২জন। অথচ এই বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রোণতে ভর্তি কৃত ছাত্র-ছাত্রীর যোগ্যতা জিপিএ -৫।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক তাহের আহাম্মদ জানান, শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় সারাদেশের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় গুলোতেই চরম শিক্ষক সংকট চলছে। হাতিয়া সহ কোন কোন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মাত্র একজন শিক্ষকও কর্মরত আছেন।

এদিকে লক্ষ্মীপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদের সংখ্যা ৫২ জন। এর মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ২২ জন। এ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির যোগ্যতা জিপিএ-৫। ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে এই বিদ্যালয়ে জিপিএ -৫ ছাত্রীদের থেকে মাত্র ২৪০ জন ছাত্রী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রীরাই এই বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকেন। চলতি বছর এই বিদ্যালয় থেকে ২৩০ জন ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১৯০ জন। জিপিএ -৫ পেয়েছে মাত্র ৩০জন। এই বিদ্যালয়গুলোতে নিষিদ্ধ প্রাইভেটের ছড়াছড়ি থাকলেও যেন দেখার কেউ নেই। সরকারি এই তিন বিদ্যালয়ের ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকরা শিক্ষক সংকটকেই দায়ী করেছেন।

অভিভাবকদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, এই সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে অভিভাবকরা ইচ্ছা করলেও দুই টাকা কম দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। ব্যাংকের মাধ্যমে সব টাকাই তাদের দিতে হয়।

মোহাম্মদ আলী নামের লক্ষ্মীপুর বালিকা বিদ্যালয়ের এক অভিভাবক জানান, সরকারি এই বিদ্যালয়গুলো মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করে বোকা বানিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছে। তারা ভর্তি করছে জিপিএ -৫ দের মধ্য থেকেও মেধাবীদের। আর বের করে দিচ্ছে ফেল করিয়ে দিয়ে। এই যদি হয় তাহলে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়িয়ে লাভ কি?

অপরদিকে নিজাম উদ্দিন নামের একজন অভিভাবক জানান, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আমাদের জন্য প্রাইভেট বিদ্যালয় অনেক ভালো। এখানে বোকাদের মেধাবী করতে কাজ করে শিক্ষকরা।

অনুসন্ধান আরো জানা যায়, জেলার সরকারি এই বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান কার্যক্রম অন্য বিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক কম হয়ে থাকে। এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র, জেএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র ও পিএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র হওয়ার কারণে লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ ও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠদান হয়ে থাকে মাত্র ৮০/৮৫ দিন। যেখানে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদান হয়ে থাকে ১৪০ দিন। আর প্রাইভেট বিদ্যালয়গুলোতে এই পাঠদানের পরিমাণ ১৯০ দিন থেকে প্রায় ২০০দিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরকে/আরএইচআর/এসআই