লকডাউন আইসোলেশন কোয়ারেন্টাইন : ইসলাম যা বলে

ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৩ ১৪২৭,   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

লকডাউন আইসোলেশন কোয়ারেন্টাইন : ইসলাম যা বলে

হাবীবুল্লাহ সিরাজ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:৪৮ ৫ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৯:৫৩ ৫ এপ্রিল ২০২০

মানুষের নিরাপত্তা, জীবনের নিশ্চয়তা প্রদানকে ইসলাম অবশ্যই গুরুত্ব দেয়। আর বাস্তবতার আলোকে এসব বিষয় অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

মানুষের নিরাপত্তা, জীবনের নিশ্চয়তা প্রদানকে ইসলাম অবশ্যই গুরুত্ব দেয়। আর বাস্তবতার আলোকে এসব বিষয় অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক! ইতোমধ্যেই নভেল করোনাকে বৈশ্বিক মহামারী বলে আখ্যায়িত করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। এই মহামারি থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্যসংস্থা বিভিন্ন উপায় উপরকণ ও পদ্ধতির কথা বলছে।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য বারবার সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে সতর্ক করা হচ্ছে। এই সতর্কতার জন্য সবাইকে যার যার ঘরে অবস্থান করার জন্য সরকারি নির্দেশ জারি করছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ। মানুষের সংস্পর্শে এই করোনা ছড়ায়। তাই সরকার কিভাবে মানুষের সংস্পর্শ, একত্রিত হওয়া, জামাতবদ্ধ হওয়া, বাতিল করা যায় সেই লক্ষ্যে লকডাউন কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন এর নির্দেশনা দিয়েছে। এই লকডাউন কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশন পদ্ধতি সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?

আরো পড়ুন>>> করোনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে জরুরি ৪ আমল

এই সব পরিভাষা সম্পর্কে ইসলামের কনসেপ্ট বুঝতে হলে মহামারি সম্পর্কে ইসলামের কনসেপ্ট কী আগে বুঝতে হবে। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ভারী বৃষ্টির দরুন মসজিদে জামাত আদায় না করে বাড়িতে পড়ার দৃষ্টান্ত আছে। এই ইসলাম একটি বাস্তববাদী ধর্ম। ইসলাম সদা বাস্তবতা বুঝে সেই বাস্তবতার আলোকে চলতে বলে। এ যুক্তিতেই আজানে নামাজের জন্য আহ্বান জানানো এবং ‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ ‘সাল্লু ফি বুয়ুতিকুম’ বলে ঘরে বা বাড়িতে নামাজ পড়ার উৎসাহ দেয়াকে সমর্থন করা যায়। কারণ মানুষের নিরাপত্তা, জীবনের নিশ্চয়তা প্রদানকে ইসলাম অবশ্যই গুরুত্ব দেয়। আর বাস্তবতার আলোকে এসব বিষয় অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দেখুন- 

عَنْ نَافِع ، قَالَ : " أَذَّنَ ابْنُ عُمَرَ فِي لَيْلَةٍ بَارِدَةٍ بِضَجْنَانَ ، ثُمَّ قَالَ : صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ ، فَأَخْبَرَنَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَأْمُرُ مُؤَذِّنًا يُؤَذِّنُ ، ثُمَّ يَقُولُ عَلَى إِثْرِهِ : " أَلاَ صَلُّوا فِي الرِّحَالِ " فِي اللَّيْلَةِ البَارِدَةِ ، أَوِ المَطِيرَةِ ، فِي السَّفَرِ .

অর্থ : হজরত নাফে’ থেকে বর্ণিত ইমাম বুখারি বলেন, দাজনান নামক স্থানে বৃষ্টির রাত্রে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর আজান দিতেন  صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ বলে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মুয়াজজিনকে প্রবল বৃষ্টি ঘূণিঝড় বা সফরের রাত্রিতে আদেশ দিতেন তুমি তোমার আজানে বলে দিও যে صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ অর্থাৎ তোমরা তোমাদের আবাস্থলে নামাজ আদায় করো। (বুখারি : হাদিস নম্বর ৬৬৬, মুসলিম : হাদিস নম্বর ৬৯৭)।

উল্লিখিত হাদিস থেকে আমরা হোমকোয়ারেন্টাইনের সমর্থন পাই। কারণবশত ঘরে নামাজ পড়া ইসলাম সম্মত। এখন আমরা অন্য একটি হাদিস নিয়ে আলোচনা করবো,

الطَّاعُونُ آيَةُ الرِّجْزِ ، ابْتَلَى اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهِ نَاسًا مِنْ عِبَادِهِ ، فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ ، فَلَا تَدْخُلُوا عَلَيْهِ ، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا ، فَلَا تَفِرُّوا مِنْهُ

অর্থ : ‘মহামারী হচ্ছে একটি আজাবের নিদর্শন। আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। সুতরাং তোমরা যদি কোথাও মহামারির সংবাদ শোনো তাহলে কিছুতেই সেখানে যাবে না। আর যদি তোমাদের বসবাসের শহরে মহামারি দেখা দেয় তাহলে সেখান থেকে পলায়ন করবে না। (মুসলিম : হাদিস নম্বর ৪২২৭)।

এখন আমরা লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, ও আইসোলেশন এর প্রত্যেকটি সম্পর্কে ইসলামের কনসেপ্ট কি জানবো-

লকডাউন পদ্ধতি :

চলাফেরা একেবারে বন্ধ করে দেয়া। এটি ব্যক্তি পর্যায়ের কোনো আইন নয়। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ কারণবশত সব নাগরিকের চলাফেরা ও স্থানান্তর বন্ধ করে দিতে পারে। এই লক্ষ্যে সড়ক নৌ রেল ও আকাশপথসহ সব পথে সব ধরণের যান চলাচল বন্ধ করে দেবে; যেন কোনো নাগরিক এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে না পারে। শহর লকডাউনের অর্থ হলো শহরের সীমানার বাইরে কেউ যেতে পারবে না, বাইরের কেউ শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। 

عَنْ أُسَامَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : إِنَّ هَذَا الطَّاعُونَ رِجْزٌ سُلِّطَ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ ، أَوْ عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ ، فَإِذَا كَانَ بِأَرْضٍ فَلَا تَخْرُجُوا مِنْهَا فِرَارًا مِنْهُ ، وَإِذَا كَانَ بِأَرْضٍ فَلَا تَدْخُلُوهَا

অর্থ : হজরত ওসামা বর্ণনা করেন; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মহামারী আল্লাহর একটি সতর্কতা। তোমাদের পূর্বের ও বনী ইসরাইলের উপর পতিত হয়েছিল। তোমরা যখন কোনো এলাকায় মহামারী প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়েও যেও না।(মুসলিম : হাদিস নম্বর ৪২২৮)।

এ হাদিসের আলোকেই আউনুল মাবুদ গ্রন্থের লেখক বলেন, মহামারি আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং তা থেকে পলায়ন উভয়টাই শরীয়তে হারাম। কারণ হলো, ‘মহামারী আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করার দ্বারা আল্লাহ তায়ালার ক্ষমতার সামনে নিজের সাহসিকতা প্রদর্শনী বুঝা যায়। আবার আক্রান্ত এলাকা থেকে পলায়ন করার অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহর হাত থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা যা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।

কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি :

স্বেচ্ছায় ঘরে আবদ্ধ থাকাকে কোয়ারেন্টাইন বা হোম কোয়ারেন্টাই বলে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বাইরে না যাওয়া। এই কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি রাসূলের জামানায় ছিল। কিন্তু এই শব্দে ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহামারী কবলিত অঞ্চলের মানুষের জন্য কোয়ারেন্টাইনের আদেশ দিয়েছিলেন। হাদিসে এসেছে- 

عن عائشة -رضي الله تعالى عنها- قالت: سألتُ رسول الله ﷺ عن الطاعون فأخبرني أنه: عذاب يبعثه الله على من يشاء، وأن الله جعله رحمة للمؤمنين، ليس من أحدٍ يقعُ الطاعونُ فيمكث في بلده صابراً محتسباً، يعلم أنه لا يصيبه إلا ما كتب الله له إلا كان له مثل أجر شهيد

অর্থ : হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহামারি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘মহামারি হলো আল্লাহ প্রদত্ত একটি আজাব। যাদের ওপর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা হয় এ আজাব পাঠান। পরবর্তীতে তিনি তা ঈমানদারদের জন্য নিজ অনুগ্রহে রহমতে রূপান্তর করেন এভাবে যে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি মহামারি আক্রান্ত এলাকায় থাকে এবং নিজ বাড়িতে ধৈর্য সহকারে সওয়াবের নিয়তে এ বিশ্বাস নিয়ে অবস্থান করে যে, আল্লাহ তায়ালা ভাগ্যে যা রেখেছেন তার বাইরে মহামারি তার কিছু করতে পারবে না তাহলে তার জন্য রয়েছে একজন শহিদের সাওয়াব।’ (বুখারি : হাদিস নম্বর ৩৩১৫, রিয়াসুস সালিহিন : হাদিস নম্বর ৩৩)।

উল্লিখিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, কোয়ারেন্টাইন শরীয়ত সম্মত। কারণবশত বৃহৎ স্বার্থে কোয়ারেন্টাইন বা হোম কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি অবলম্বন করা বা আইন করে জনগণের চাপিয়ে দেয়া শরীয়ত পরিপন্থী নয়। বরং হোমকোয়ারেন্টাইন থাকার মধ্যে বিশাল সওয়াবের কথা বর্ণিত উল্লিখিত হাদিসে। তবে এর মধ্যে ৩টি শর্ত থাকতে হবে। ক. সবর তথা ধৈর্যের সঙ্গে অবস্থান খ. পরকালের সাওয়াবের আশা থাকা গ. আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক ভাগ্যে যা লেখা রয়েছে তা ব্যতীত কোনো ক্ষতি হবে মর্মে বিশ্বাস থাকা।

আইসোলেশন পদ্ধতি :

আইসোলেশন হলো সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, সংস্পর্শে না যাওয়া। আক্রান্ত ব্যক্তি, আক্রান্ত সন্দেহ ব্যক্তি, আক্রান্ত এলাকা বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পশে থেকে আসা ব্যক্তি নিজেকে ঘরের মধ্যে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বন্দি রাখা। এই সময় কোনো মানুষ তার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। আর এটি পালনে ইসলামের কোনো বিধি-নিষেধ নেই। কেননা এতে নিজে যেমন নিরাপদ থাকা যায় তেমনি পরিবারের অন্যরাও নিরাপদ থাকতে পারে। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এ ধরনের কাজের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : لَا يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ 

অর্থ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা অসুস্থ উটকে সুস্থ উটের সঙ্গে মিশিও না।’ (মুসলিম : হাদিস নম্বর ৪২৩৫)।

এই হাদিস থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় আইসোলেশন এর। রাসূল (সা.) উটের বেলা বলছেন তোমরা অসুস্থ উটকে আইসোলেশনে রাখো অর্থাৎ তাকে অন্য উটের সঙ্গে মিশতে দিও না। যদি এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে রোগকে প্রতিহত করা যায় তাহলে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা আবশ্যক এবং ইসলামও এই কথা বলে। 
একটি ঘটনা উল্লেখ করি। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. খেলাফতের সময় ফিলিস্তিনে ‘আমওয়াস’ নামক মহামারির প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে মিসর বিজেতা সাহাবি হজরত আমর ইবনুল আস রাযি. সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এক ভাষণ দেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন-‘যখন এ ধরনের মহামারি দেখা দেয় তখন তা আগুনের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তিনি (উপস্থিত) সবাইকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে পাহাড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাদের প্রতি এ মর্মে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেন যে- কেউ কারো সঙ্গে মিশতে পারবে না। অতঃপর তারা পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে দীর্ঘ দিন পাহাড়ে অবস্থান করেন। আর আক্রান্তদের অনেকে শাহাদাতবরণ করেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা মহামারি তুলে নিলে সাহাবি আমর ইবনুল আস রাযি. জীবিতদের নিয়ে সুস্থ শরীরে শহরে ফিরে আসেন।’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৭/১৭৪ ও তারিখে দিমাশক)।

উল্লিখিত হাদিস ও ঘটনা সামনে নিয়ে আমরা বলতে পারি আইসোলেশন শব্দটি যদিও আমাদের কাছে নতুন, কিন্তু এর কার্যক্রম নবীযুগ থেকে শুরু হয়েছে। আইসোলেশন পদ্ধতি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বরং পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করে। তবে হ্যাঁ, আইসোলেশন পদ্ধতি জারি করার দ্বারা যদি দেশের বৃহত্তর কোনো স্বার্থ নষ্ট হয় তাহলে এটা জায়েয হবে না। বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সব দেশে লকডাউন আইসোলেশন কোয়ারেন্টাইন জারি করা হয়েছে জাতির বৃহৎ স্বার্থে। সুতরাং এটা মানা সব মুসলমান ও নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে