Alexa রোহিঙ্গা প্রভাবে চাপে সীমান্তের অর্থনীতি

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৭ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ২ ১৪২৬,   ১৭ সফর ১৪৪১

Akash

রোহিঙ্গা প্রভাবে চাপে সীমান্তের অর্থনীতি

 প্রকাশিত: ১৮:০৭ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭   আপডেট: ১৪:৩১ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

রোহিঙ্গাদের প্রভাবে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির অর্থনীতি প্রবল চাপে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের জোগান দিতে যে সরবরাহ ছিল তা দিয়ে এখন তার দ্বিগুণের বেশি মানুষের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।

এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনি সামর্থ্যবান রোহিঙ্গারাও চড়া দামে পণ্য কিনতে পারছেন না।

ওই অঞ্চলে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৬ বাংলাদেশির আপন বাসভূম। শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পেয়েছে আরও অন্তত চার লাখ বার্মিজ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে উখিয়া-টেকনাফে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছে দেশি-বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগের হাজার হাজার নারী-পুরুষ। সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফে সারাক্ষণই যেন গণসম্মেলন। হঠাৎ করে এত সংখ্যক মানুষের জন্য বাড়তি খাদ্য চাহিদা যোগ হয়েছে।

অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো উখিয়ার এলাকাতে থাকায় সেখানেই রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল গড়তে দরকার হচ্ছে কাঠ-বাঁশ-পলিথিন থেকে শুরু করে গৃহস্থালি তৈজসপত্রের। দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চাহিদা পূরণে চাপ পড়ছে স্থানীয় বাজারে। এ সুযোগে পাগলা ঘোড়ার মতো হু হু করে বাজার দর বাড়িয়েছে এখানকার কতিপয় অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। আর্ত মানবতার জন্য সারা দেশের মানুষের মন কাঁদলেও সব কিছু দেড়গুণ-দ্বিগুণের মতো দাম বাড়িয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো আরও সমস্যায় পড়ছে। রোহিঙ্গা প্রভাবে চাপে পড়েছে সীমান্তের অর্থনীতি। বাড়তি এ চাহিদার জোগান দিচ্ছে দেশি-বিদেশি এনজিও, বিভিন্ন পর্যায়ের সাহায্যে থেকে।

কক্সবাজারের টেকনাফ, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া সীমান্ত হয়ে আসা রোহিঙ্গা নাগরিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা-নির্যাতন-অগ্নিসংযোগের কারণে তাদের সবাই প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছেন। বেশিরভাগের ক্ষেত্রে সঙ্গে এসেছে শুধু পরনের কাপড়। কেউ কেউ সামান্য বার্মিজ মুদ্রা আনতে পারলেও কক্সবাজারে এ মুহূর্তে তা অচল। পানির দরে এগুলো বিক্রি হচ্ছে। পরে এগুলো চোরাই পণ্যের দেনা শোধে ব্যয় হচ্ছে।

মংডু থেকে এসে টেকনাফ শহরে আশ্রয় নেওয়া মৌলভী আতাউল্লাহ বার্মিজ মুদ্রা দেখিয়ে আমাদের সময়কে বলেন, জমিজমা অনেক ছিল। কিন্তু আসার সময় কয়েক লাখ টাকা নিয়ে এসেছেন। মিয়ানমারের এক হাজার টাকায় এদেশে ৭৫ টাকা মেলে। সে হিসেবে ওই লাখো পরিমাণ টাকায় বাংলাদেশে হাজার টাকা। যার মধ্যে অনেক টাকা তিনি নাফ নদী পেরিয়ে আসতে ট্রলারে দিয়ে এসেছেন। হাতে ছিল এ পরিমাণ টাকা। এটাই তার সম্বল। মিয়ানমারের হত্যা-নির্যাতন শুরু হওয়ার আগে টেকনাফে এসব মুদ্রা লেনদেন হতো। কিন্তু এখন তা অচল।

টেকনাফ বাজার ঘুরে দেখা গেছে কেজিপ্রতি বড় সাইজের আলুর দাম ৩০ টাকা। ছোট সাইজের লাল আলু ৫০ টাকা। বরবটি ৬০ টাকা। ঝিঙা ৩০ টাকা। বেগুন ৫০ টাকা। করলা ৪০ টাকা। শাকের আঁটি ১৫ টাকা। লইট্যা-চাষের পাঙ্গাস ছাড়া সব ধরনের মাছের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৫০-১০০ টাকা।

উখিয়ার কুতুপালং বাজারে কেজিপ্রতি বড় সাইজের আলুর দাম ৩৫ টাকা। ছোট সাইজের লাল আলু ৫০ টাকা। ৩০/৩৫ টাকার বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা, করলা ৩৫-৪০ টাকা। স্থানীয়রা জানান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে সবুজ শাক-সবজির দারুণ চাষাবাদ হয়। এতে সারা দেশের তুলনায় এ এলাকায় কম দামে বিক্রি হয় তরকারি। কিন্তু বাজার দরে আগুন ধরিয়েছে স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী।

শাহপরীর দ্বীপে প্রতি পিস কলার দাম রাখা হচ্ছে ১০ টাকা। নিম্নমানের পণ্য সামগ্রী বিক্রি ছাড়াও বাড়ানো হয়েছে অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের দাম।

পাহাড় কিংবা সমতলে আশ্রয়স্থল তৈরিতে রোহিঙ্গাদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বাঁশ ও পলিথিন বা ত্রিপল। জাতিসংঘ শরণার্থী কমিশন (ইউএনএইচসিআর) থেকে কিছু রোহিঙ্গা ত্রিপল পেলেও বাঁশ ও পলিথিন কিনতে বাধ্য হয় রোহিঙ্গারা। কুতুপালং ঘুরে দেখা গেছে রাস্তার পাশে বসা স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা একেকটি বড় আকারের একটি বাঁশ বিক্রি করছে ৪০০ টাকায়। কঞ্চি বাঁশ ৮০-১০০ টাকায়। অথচ এসব বাঁশের অধিকাংশই প্রকৃতির দান সরকারি পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা। লবণ চাষে ব্যবহৃত পুরনো ও নরম পলিথিন বিক্রি হচ্ছে আড়াইশ টাকা দরে। সামান্য বৃষ্টিতেই ফুটো হচ্ছে ঘরের চাল হিসেবে ব্যবহৃত এ পলিথিন। বাড়ানো হয়েছে হাঁড়িপাতিল, থালা, বালতি, বদনাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্রের মূল্য। কুতুপালংয়ের বাজারে আড়াইশ গ্রাম ওজনের হাঁড়িপাতিল বিক্রি হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক ২০০ টাকায়। অথচ এর দাম হওয়ার কথা ছিল অর্ধেক।

নাফ নদী পেরিয়ে শাহপরীর দ্বীপে আসতে ট্রলার বা নৌকা ভাড়া আকাশচুম্বী। নদী পারাপারে রোহিঙ্গাদের জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায় করছে স্থানীয় জেলে নৌকার মালিকরা। আবার অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে নৌকাডুবি হচ্ছে। শাহপরীর দ্বীপ থেকে টেকনাফ। সেখান থেকে কুতুপালংয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোয় আসতে ট্রাক-পিকআপ প্রতি রিজাভ নেওয়া হচ্ছে ৫ হাজারের মতো। কুতুপালং ক্যাম্প থেকে উখিয়ায় যেতে টমটমে আগে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ছিল ১০ টাকা। এখন আদায় করা হচ্ছে দ্বিগুণ। সিএনজি ভাড়া বেড়েছে দ্বিগুণ। টেকনাফ থেকে মেরিন ড্রাইভে আগে সিএনজি রিজার্ভ ভাড়া ছিল ১ হাজার টাকা। এখন আদায় করা হচ্ছে দ্বিগুণ। বাড়ানো হয়েছে বাস ভাড়া। কাঁচাবাজারের মতো গণপরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি করায় অসহায় রোহিঙ্গারা যেমন বিপাকে পড়ছে, তেমনি সমস্যায় পড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা, স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্যসেবী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা সহায়তার হাত বাড়ানো মানুষগুলো। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ নিয়ে মাইকিং করা হলেও কাজের কাজ অশ্বডিম্ব।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএ