Alexa রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে হবে বুঝেশুনে-পরিকল্পিতভাবে

ঢাকা, রোববার   ১৮ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ৩ ১৪২৬,   ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে হবে বুঝেশুনে-পরিকল্পিতভাবে

 প্রকাশিত: ১১:১৪ ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭   আপডেট: ২০:২৯ ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ওই পাড়ে বন্দুকের নল থেকে ধেয়ে আসা বুলেট। এই পাড়ে ভিনদেশি সীমান্তরক্ষীদের রক্তচক্ষু। সোস্যালমিডিয়া, দেশী-আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে অসহায় রোহিঙ্গাদের ছবি। যে কারো বিবেককেই নাড়া দিতে বাধ্য। তবু প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা ছুটে আসছে বাংলাদেশে। আমাদের বিজিবি’র সদস্যরা তথা সরকার মানবিকতার তাগিদেই কিছু বলছে না। স্থানীয় বেশিরভাগ বাসিন্দাও তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে এসব অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রতি। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা ভিড় করছে বাংলাদেশের টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি কিংবা ঘুমধুমের মতো ৩৭টি পয়েন্টে।

ছবি: এভাবেই রোহিঙ্গাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজিবি সদস্যরা। তবু কতটুকুইবা পারছে। আল জাজিরা।

জাতিসংঘের এক হিসেবে দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সরকারের ‘ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে’ করা সাম্প্রতিক সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড়লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা জানান, এই সংখ্যা কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নয়। এটা তিন লাখেও পৌঁছাতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য ব্যাপারটা বেশ বিব্রতকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। না পারছে ঘোষণা দিয়ে সীমান্ত খুলে দিতে, না পারছে এসব অসহায় মানুষগুলোকে তাড়িয়ে দিতে। তবু, যতটা সম্ভব করছে বাংলাদেশ সরকার। এরমধ্যেই জাতিসংঘের মহাসচিব ধন্যবাদ জানিয়েছেন ঢাকাকে। তুরস্ক বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।

এত কিছুর পরেও কিছুতে কিছু হচ্ছে না। শান্তিতে নোবেল জয়ী মিয়ানমারের এখনকার দণ্ডমুণ্ডে কর্তা সুচি তার অবস্থানে অনড়। এশিয়ার অন্যতম মোড়ল দুই দেশ ভারত আর চীনকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমার সরকার নিজেদের ‘কাজ’ করে যাচ্ছে ঠিকভাবেই।

ছবি: নানান ঝড় সামলে, মিয়ানমার সেনাদের বন্দুকের নল ফাঁকি দিয়ে, বিজিবি’র বাধা পেরিয়ে কোনো মতে আসছে রোহিঙ্গারা। 

এই যখন অবস্থা তখন বাংলাদেশ কী করবে? কিংবা আমাদের সরকারের অবস্থান কী হবে? আবার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হবে কিংবা সেই সামর্থ্য আমাদের আছে কিনা! রোহিঙ্গা ইস্যুতে এই প্রশ্নগুলো নীতিনির্ধারকদের ঘুমে ব্যঘাত ঘটাচ্ছে বলা বাহুল্য। কিন্তু নির্ঘুম রাত কাটলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। সব কিছু হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবেই। এরমধ্যেই টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের পাহাড় কাটতে সাহায্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ মিলেছে। রোহিঙ্গারা তাদের ইচ্ছামতো পাহাড় কাটছে, বনবিভাগের বন উজাড় করে খুপড়িঘর বানাচ্ছে।

আমি বলছি না তাদের ঘর ভেঙে দিতে, বলছি না খোলা আকাশের নিচেই তাদের রাখার ব্যবস্থা করতে। বলছি না যারা এসে পড়েছে এখনই তাদের পিটিয়ে বিদায় করতে। তাহলে ‘সুচি’ আর আমাদের মধ্যে পার্থক্য রইল কোথায়?

বলছি; একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে তাদের পুনর্বাসন করতে। এরপর জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক অন্যান্য মহলের মাধ্যমে হোক আর যেভাবেই হোক তাদের ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেটা করতেই হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারাও তা-ই চাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, ‘এটা (বাংলাদেশ) আমাদের দেশ না। মিয়ানমার আমাদের দেশ। আমরা সেখানে গিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই।’

ছবি: কাঁটাতার ডিঙিয়েও সীমান্ত পার হচ্ছে রোহিঙ্গারা।

আশংকাজনক হচ্ছে, শুধু সীমান্তেই নয়; রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়ছে চট্টগ্রামশহরসহ সারাদেশে। শংকা আরও আছে। সবারই জানা কথা এই মিয়ানমার থেকেই আসে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা। এসব রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইয়াবার মতো মাদক চলে আসছে কিনা সেটাও নজরদারি রাখা উচিৎ। মোদ্দাকথা তাদের যতটা সম্ভব সাহায্য করা হোক। কিন্তু আগে নিজের ঘর সামলাতে হবে। রোহিঙ্গাদের এভাবে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া কিংবা খুঁটি গেড়ে বসা আটকাতে হবে পরিকল্পিতভাবে।

সীমান্তে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো সরকারি কমিটি কিংবা উচ্চপর্যায়ের কোনো সংগঠন দেখা যায়নি। যারা মিয়ানমার থেকে নতুন করে আসা এসব রোহিঙ্গাদের তালিকা করে তাদের নিয়ে কোনো ক্যাম্পে কিংবা নির্দিষ্ট একটা জায়গায় রাখবে। এখানে বলে রাখি, যেসব তথ্য কিংবা পরিসংখ্যান দিচ্ছি তার সবই ইউএনএইচসিআর এর প্রতিবেদন থেকে নেয়া। সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে আছে কিনা? শরণার্থী সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের নিদৃষ্ট কোনো অধিদফতর বা সংস্থা আছে বলে জানা নেই। থাকলে কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তারা কাজ করে সেটাও অজানা। এটা একরকম উদাসীনতাই। এসব ঠিক করতে হবে এখনই। এখন না হলে কখন? না হলে কী হবে?

হবে অনেক কিছুই। এই রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাজনীতি হবে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হবে। তাদের ব্যবহার করে মিছিল-মিটিং-পিকেটিং সব হবে। ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করা হবে এই রোহিঙ্গাদের। অতীতে তা-ই হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলীর রায়ের পর দেখেছি রোহিঙ্গাদের কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। মানুষ অভাবে পড়লে সব করে, সব পারে। বেঁচে থাকার জন্য পারতে হয়। ইদানিং জঙ্গী ইস্যু মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। কিছুদিন পরপরই এখানে সেখানে জঙ্গি আটকের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অসহায় এসব রোহিঙ্গারা যে ওই দলে ভিড়বে না, গ্যারান্টি কী? ভয় কিংবা আশংকা যাই বলেন, তা এখানেই। এই মানুষগুলো কী খাবে? কোথায় থাকবে? তখন এদের কোনো অপকর্মে ব্যবহার করা হবে না তারইবা গ্যারান্টি কী? সামনেই জাতীয় নির্বাচন এটাও মাথায় রাখতে হবে।

ছবি: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা।

লজ্জাজনক হলেও সত্যি, গত ৩০ বছরে বিভিন্ন সরকারের আমলে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে তারা নানান অপরাধেও জড়াচ্ছে। যার দায়ভার অফিসিয়ালি আমাদের ওপরই বর্তেছে। দেশের বাইরে অনেক ক্ষেত্রেই রোহিঙ্গাদের জন্য আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। এই জায়গাতেও খটকা আছে। এসব রোহিঙ্গারা যে বিদেশ যাচ্ছে টাকা কোথায় পাচ্ছে?

অনেকেই হয়তো জানেন, বাংলাদেশে ২৪ আগস্টের আগ থেকেই রোহিঙ্গারা আশ্রিত অবস্থায় থাকছে সরকারি সহযোগিতায়। জাতিসংঘের এক হিসেবে এর আগে থেকেই রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার। তবে সরকারিভাবে ১৯৭৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ৫০ হাজারের কিছু বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয় বাংলাদেশ। এরপর ১৯৯১ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কিছু রোহিঙ্গাকে তাদের নিজদেশে ফেরত পাঠানো হয়। ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৩৬ হাজার ৫৯৯ জনকে ফেরত নেয় তারা। ২০০৫ সালে হুট করেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সরকারি উদ্যোগে কক্সবাজারের দুইটি শরণার্থী শিবিরে ৩৩ হাজারের মতো রোহিঙ্গার নাম নিবন্ধন করা হয়। ২০০৫ সালের পর থেকে সীমান্তের নানান পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। সাম্প্রতিক সহিংসতার আগে গত বছরেও নতুন করে প্রায় ৭০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। মানে রোহিঙ্গাদের স্রোত থেমে নেই।

১০ বছর পরের কথা চিন্তা করুন। রোহিঙ্গারা গেড়ে বসলে বাংলাদেশেই তাদের বংশ বৃদ্ধি হবে। এই পর্যায়ে আপনি চাইলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের ইতিহাস মনে করে নিতে পারেন। এই রোহিঙ্গারা একসময় জনসংখ্যায় ভারি হবে, বেকারত্ব বাড়বে। সবচে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যাতে আবার ফিরে না যায় তার জন্য মিয়ানমার সেনারা তাদের সীমান্তে মাইন পুঁতে রেখেছে। এরপরই তাদের সরকার থেকে ঘোষণা দেয়া হল, প্রমাণ না হলে তারা সব রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে না। তাদের লক্ষ্য পরিষ্কার, মিয়ানমার সরকার চাইছে রোহিঙ্গারা এখানেই থাকুক।

আশংকা আরও আছে-আমাদের দেশে সব কিছু নিয়েই রাজনীতি হয়; দেদারসে চলে দুর্নীতি। বিএনপি তো ঘোষণা দিয়েই দিয়েছে-“সরকার রোহিঙ্গাদের ‘আশ্রয়’ দিতে ব্যর্থ। এমনকি কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও ব্যর্থ সরকার।” ফেসবুকে খোলা হয়েছে বিভিন্ন ইভেন্ট। যেগুলোতে রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ে করে এইদেশে আশ্রয় দেয়ার একটা হিড়িক শুরু হয়েছে। পুরো ইস্যুটাকে একটা ধর্মীয় ইস্যু বানানোর চেষ্টাও করছে অনেকে। ব্যাপারটা এমন, মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অত্যাচার করা হচ্ছে। তাহলে বাংলাদেশেও বৌদ্ধ ধর্মের লোকদের মেরে ফেলতে হবে।

‘এই বিষয়গুলোর কিছুই ঘটবে না।’ এমনটাই প্রত্যাশা। তবে ব্যাপারগুলো সত্যি যদি ঘটে তা হলে একটা ভয়াবহ সহিংসতা কিংবা বিশৃঙ্খলা কিন্তু আসন্ন।

ছবি: নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা বসতি তোলার জন্য পাহাড়ের মাটি কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করছে। রয়টার্স  

পুনশ্চঃ এখনকার বাস্তবতা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না। মিয়ানমারি ‘মগ’ বর্বরতায় আমরা পড়েছি। মানবিকতার পরীক্ষা চলার সমান্তরালেই সরকারকে একটা কাজ অবশ্যই শুরু করে দেওয়া উচিৎ- তাহলো এদেশে ঢুকে পড়া সব রোহিঙ্গার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ছবি নিয়ে একটি ডাটাবেস তৈরি করা। এটা কঠিন কোনো কাজ নয়। স্বল্পতম সময়ে মোটামুটি সাফল্যের সঙ্গে ভোটার আইডিকার্ড তৈরির অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার সদস্যদের এই কাজে সম্পৃক্ত করা যায়। এর সাথে এসব রোহিঙ্গাদের কোনোভাবেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে দেয়া যাবে না। বিষয়টি সরকার ভেবে দেখবে আশা করি।

লেখক: রাকিব হাসান। সংবাদকর্মী।

[email protected]

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ

Best Electronics
Best Electronics