রোমাঞ্চকর লাউয়াছড়ায় ঈদ ভ্রমণ

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

রোমাঞ্চকর লাউয়াছড়ায় ঈদ ভ্রমণ

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:৫২ ৩০ মে ২০১৯  

রোমাঞ্চকর লাউয়াছড়া

রোমাঞ্চকর লাউয়াছড়া

হুমায়ূন আহমেদের সিনেমা ‘আমার আছে জল’ সিনেমাটি দেখেছেন? সে সিনেমার বনের দৃশ্যগুলো খুবই নজর কাড়ার মতো। যারা সিনেমাটি দেখেছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, ‌‘সিনেমায় দেখা বনের দৃশ্য খুব নজর কেড়েছিল কি?’ বিশেষ করে ‘আমার আছে জল’ গানটির দৃশ্য। সিনেমাটির ৫২:৪৭ সেকেন্ডের দৃশ্যে যখন হলুদ রঙের পোশাকে বিদ্যা সিনহা সাহা মিম এসে দাঁড়ায় একটি রেললাইনের সামনে! মনে আছে বনের ভেতরের সেই রেইলাইনটির কথা?

মিম যখন সেই রেলপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলো, চেয়ে থেকে আমি সে দৃশ্যে রেললাইন আর বনের সৌন্দর্যই দেখছিলাম শুধু! চারদিকে সবুজের সমারোহ, নিঃশব্দ! সিনেমায় দেখা সে দৃশ্যের শ্যুটিং হয়েছিলো সিলেটের কমলগঞ্জের এই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেই। সিনেমায় দেখা দৃশ্যের চেয়ে বাস্তবের দৃশ্যটা আরো বেশি সবুজ, আরো অনেক বেশিই সুন্দর। যা এখানে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

শুধু লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেখার জন্যই আমার এই যাত্রা। প্রথমেই গেলাম ছোট্ট শহর শ্রীমঙ্গল। সেখান থেকেই গাড়ি নিয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। যখনই কমলগঞ্জের রাস্তায় প্রবেশ করি তখন থেকেই শুরু হয় মুগ্ধতা। দৃষ্টিজুড়ে সবুজ, উটের পিঠের মতো টিলা, মনোরম চা বাগান, পাখির কিচিরমিচির শুনছিলাম যাত্রা পথেই। দুই পাশে ঘন বন রেখে তার মাঝের একটু পর পর বাঁক নেয়া রাস্তা ধরে যখন গাড়ি চলতে থাকে তখন বেশ ভিন্ন এক অনুভূতি তৈরি হয় ভেতরে।

আমার আছে জল গানটির শুটিং স্পট

শ্রীমঙ্গল থেকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার। আর ঢাকা থেকে ১৯৬ কিলোমিটার। আগে থেকেই জানি, এই বনের অনন্য আকর্ষণ হচ্ছে বিরল প্রজাতির উল্লুক। মোট ১৬টি উল্লুক পরিবার হাজারো পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। উল্লুক গিবনস লেজহীন বন্য প্রাণী, অনেকটা বানরের মত। ভারত, চীন, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশসহ ৪ টি দেশে ওদের প্রজাতি সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করছে। আর কোনো দেশে উল্লুকের বসবাসের তথ্য আমার জানা নেই। পাহাড়ের উঁচু ও বড় বড় গাছের ডালে বাস করে এরা। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে উল্লূকের হই-হুল্লা ডাক। অনেক দুর থেকে শুনা যায় উল্লুকের ধ্বনি। যা চুম্বকার্ষনের মতই টেনে নেয় পর্যটকদের।

আমরা যখন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের কাছে পৌঁছালাম তখন পুরোপুরি বিকেল। প্রথমেই টিকেট কেটে নিলাম প্রবেশের জন্য। তারপর সময় নষ্ট না করে ১০ জনের দল ঢুকে পড়লাম বনের সৌন্দর্য অবলোকন করতে। রাস্তায় বেশ ভালো ঝলমলে পরিবেশ রেখে এলেও বনে ঢুকতেই কিছুটা অন্ধকার চোখে পড়লো, পাশাপাশি বেশ শীতল পরিবেশও। ভূতুড়ে কিছু নয়। সবটাই মূলত গাছপালার জন্য।

সঙ্গে আছেন রাহমান নামের একজন গাইড। তার সঙ্গ নিয়েই দেখতে লাগলাম উঁচু-নিচু ও আলো-আঁধারের চোখ ধাঁধানো খেলা, পাখির কিচিরমিচির, ঝিঝি পোকার গান! সব কিছু মিলিয়ে অদ্ভুত জাদুতে বিমোহিত ছিলাম সময়টুকু। এ ছাড়া লাউয়াছড়া উদ্যানের ভেতরেই আছে খাসিয়াপুঞ্জি, পানের বরজ, চা বাগান ও ঝিরি। লাউয়াছড়ার বনের মাঝদিয়ে চলে গেছে ঢাকা-সিলেট রেললাইন। রেললাইনের দুইপাশে গাছগাছালি। এই জায়গাটিও দর্শনার্থীদের কাছে খুব প্রিয়। রেললাইনের পাশ দিয়ে কিছুক্ষণ হেঁটে বেড়াতে পারেন।

জায়গাটি দর্শনার্থীদের কাছে খুব প্রিয়

রেললাইনটা অনেক কারণেই জনপ্রিয়। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’ ছবিটির একটি দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল এই বনে। বন ঘেঁষে যে রেলপথ চলে গেছে, ঠিক সেখানেই হয়েছে ছবিটির কিছু দৃশ্যের শুটিং। ছবিটির একটি দৃশ্য ছিল এ রকম ট্রেন ছুটছে। হঠাৎ চালক খেয়াল করলেন, লাইনের সামনে একপাল হাতি আপনমনে চড়ে বেড়াচ্ছে। ট্রেন থেমে যায়। কামরা থেকে নেমে আসেন নায়ক ডেভিড নিভেন, ব্যাপারটা কী দেখতে। সামনের গ্রামেই তখন হচ্ছিল সতীদাহ। নায়ক ছুটে গিয়ে মেয়েটিকে বাঁচান। মেয়েটি হলো শার্লি ম্যাক্লেইন। ছবির এই অংশটুকুই চিত্রায়িত হয়েছিল লাউয়াছড়ার রেললাইন এলাকায়। আমার বহুবার এই রেললাইন দিয়ে আসা যাওয়া সুযোগ হয়েছে। তবে রেললাইনে হাঁটার সুযোগ হয়েছে এবারই!

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান জীববৈচিত্র্য বিস্ময়কর রকমের সমৃদ্ধ। এখানে প্রায় ১৫৯ রকমের গাছগাছড়া পাওয়া যায়, পাওয়া যায় ধনেশ, বন মোরগ, হরিয়াল সহ প্রায় ১২০ রকমের পাখি। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে আছে লজ্জাবতী বানর, আসামী বানর, শূকর লেজী বানর সহ ৬ প্রজাতির বানর, কমলা পেট কাঠবেড়ালী, খাটাশ, বন বেড়াল, সোনালী শেয়াল, শূকর, মায়া হরিণ, নানা রকম সরিসৃপ ও সাপ। পূর্বে এই জঙ্গলে বাঘ, চিতাবাঘ, শম্বর হরিণ প্রভৃতি দেখা যেত, ৭০ এর দশকের শুরুতেই এরা সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

রেলপথ পার করে কিছু দূর হাটলে বনের গভীরে যাবার বেশ কিছু ট্রেইলের দেখা যায়। এগুলোর একটা ধরে হাঁটা শুরু করেছিলাম আমরা। ভয় নেই মনে, কারণ সঙ্গে তো গাইড আছে! তবুও কোন সময় কি হয় বলা তো যায় না। বনের গহীনে প্রবেশ করে টের পেলাম, প্রকৃতি যে কতটা সুন্দর! কিছুক্ষণের জন্য হলেও ছিলাম এক অন্য আদিম জগতে, পাখপাখালির ডাক আর জঙ্গলের নানা শব্দে রোমাঞ্চিত ছিলাম পুরোটা সময়। তবে ভাগ্যে ছিল না জঙ্গলের ভেতরে বসবাসকারী আদিবাসী খাসিয়া, টিপরা অথবা মনিপুরীদের দেখা পাওয়া। তবে বনের ভেতরের বিচিত্র সব পাখপাখালি আর পশু দেখেছিলাম ঠিকই।

বনের ভেতরে দেখা যায় নানান প্রাণী ও পাখির

আমরা হাঁটছিই! খানিকটা শীতল আর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। কানে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ আর পাখির কিচিরমিচির মিলিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে থাকলাম সবাই। বনের ভেতর থাকা পশু-পাখিদের বিরক্ত না করে নিরবে হাঁটাই উত্তম। বিশেষ করে দূর থেকে প্রাণীদের দিকে ঢিল ছুড়বেন না কখনোই। হাঁটতে হাঁটতে বনের ভেতরের অন্ধকার বাড়তেই থাকলো। পথগুলো অস্পষ্ট হতে থাকলো। তাই আমরা যত দ্রুত সম্ভব পথ চললাম শেষের দিকে। পথে দেখা পেলাম ছোট আকারের হরিণের। দু-একটা সাপেরও দেখা পাওয়া গেলো। দূরে একপাশে চোখে পড়লো বানরের দল।

বিশালাকার গাছ ও ছোটবড় গুল্মলতায় ছেয়ে থাকা বনের ভেতর সরু মাটির রাস্তা, হিমশীতল পরিবেশ, আলো-ছায়ার অদ্ভুত মায়াজাল, অসংখ্য পাখির বিচিত্র ডাকে অদ্ভুত শব্দের মিশ্রণ, তার সাথে পায়ের নিচে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মুড়মুড়ে শব্দ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম পুরোটা সময়।

এই বনটি পায়ে হেঁটে ঘুরে আসতে ৩টি পথ রয়েছে সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য। একটি আধা ঘণ্টার পথ, একটি এক ঘণ্টার পথ ও অন্যটি ৩ ঘণ্টার পথ। এছাড়াও আরো কিছু পথ ধরে এখানকার কর্মরত লোক ও আশেপাশের কিছু লোকজন চলাচল করেন। তবে ভ্রমণকারীদের সেসব পথ এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।

বনের আঁধার

আধ ঘণ্টার ট্রেকিং : এ পথটির শুরু রেললাইন পেরিয়ে হাতের বাঁ দিক থেকে। এ পথের শুরুতে উঁচু উঁচু গাছগুলোতে দেখা মিলতে পারে কুলু বানরের। নানা রকম গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে তৈরি করা এ হাঁটা পথটিতে চলতে চলতে জঙ্গলের নির্জনতায় শিহরিত হবেন যে কেউ। এ ছাড়া এ পথের বড় বড় গাছের ডালে মৌসুম ভেদে দেখা মিলবে বুনো অর্কিড। নির্দেশিত পথে হাতের বাঁয়ে বাঁয়ে চলতে চলতে এই ট্রেইলটির শেষ হবে ঠিক শুরুর স্থানেই।

এক ঘণ্টার ট্রেকিং: এক ঘণ্টার ট্রেকিংয়ের শুরুতেই দেখা মিলবে বিশাল গন্ধরুই গাছ। এ গাছের আরেক নাম কস্তুরী। এগাছ থেকে নাকি সুগন্ধি তৈরি হয়। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলবে ঝাওয়া, জগডুমুর, মুলী বাঁশ, কাঠালি চাঁপা, লেহা প্রভৃতি গাছ। আরো আছে প্রায় শতবর্ষী চাপলিশ আর গামারি গাছ। এ ছাড়া এ পথে নানারকম ডুমুর গাছের ফল খেতে আসে উলস্নুক, বানর, হনুমান ছাড়াও এ বনের বাসিন্দা আরো অনেক বন্যপ্রাণী। ভাগ্য সহায় হলে সামনেও পড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলতে পারে মায়া হরিণ আর বন মোরগের।

তিন ঘণ্টার ট্রেকিং: তিন ঘণ্টার হাঁটা পথটি আরো বেশি রোমাঞ্চকর। এ পথের বাঁয়ে খাসিয়াদের বসত মাগুরছড়া পুঞ্জি। এ পুঞ্জির বাসিন্দারা মূলত পান চাষ করে থাকেন। ১৯৫০ সালের দিকে বনবিভাগ এ পুঞ্জি তৈরি করে। এ পথে দেখা মিলবে বিশাল বাঁশবাগান। এ বাগানে আছে কুলু বানর আর বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর। লজ্জাবতী বানর নিশাচর প্রাণী। এরা দিনের বেলায় বাঁশের ঝারে ঘুমিয়ে কাটায়। এ ছাড়া এ পথে দেখা মিলবে নানান প্রজাতির পাখির, আর পথের শেষের দিকে দেখা মিলতে পারে এ বনের অন্যতম আকর্ষণ উলস্নুক পরিবারের। এরা বনের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোতে দলবদ্ধভাবে বাস করে।

বনে হাঁটলেই কানে আসে শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ

নির্দেশনা

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানটি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। ঢাকা থেকে যেতে হলে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হতে পারে ট্রেন। কমলাপুর স্টেশন থেকে সিলেটগামী ট্রেনে উঠে নামবেন শ্রীমঙ্গলে, সময় লাগবে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটারের দূরত্বে এই উদ্যান। সিএনজি অথবা রিকশাতে করে খুব কম সময়ে পৌঁছে যেতে পারবেন। আর বাসে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারগামী যেকোনো বাসে উঠে পড়লেই হবে, মৌলভীবাজার শহর থেকেও যেতে পারবেন উদ্যানে সি এন জি অথবা লোকাল বাসে চড়ে। 

শ্রীমঙ্গল অথবা মৌলভীবাজারেই যেকোনো দামে থাকার জন্য হোটেল বা রিসোর্ট পাবেন। আর আগে থেকে বন বিভাগের লাউয়াছড়া বিট অফিসে যোগাযোগ করে যেতে পারলে থাকতে পারবেন জঙ্গলের ভিতরে ফরেস্ট রেস্ট হাউসে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে