রোমাঞ্চকর কিন্তু বিপদজনক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২০ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৭ ১৪২৬,   ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

রোমাঞ্চকর কিন্তু বিপদজনক

 প্রকাশিত: ১৫:৪৭ ২১ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ১৫:৪৭ ২১ জুলাই ২০১৮

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

শহুরে যান্ত্রিক একগুঁয়ে জীবনে মানুষ চায় একটু ভিন্নতা। কিন্তু শহরে একটু ব্যতিক্রমভাবে সময় কাটানোর মতন খুব একটা সুযোগ নেই। ইট কাঠের এই যান্ত্রিকতায় মানুষ পুরো সপ্তাহের কাজের চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চায় ছুটির দিনে। তাই পৃথিবীর যেকোন শহরে ছুটির দিন কাটানোর জনপ্রিয় স্থানগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকে অ্যামিউজমেন্ট পার্কগুলো। নানান ধরণের, নানান গতির বিভিন্ন ধরনের রাইডে ভরপুর এই পার্কগুলোতে দর্শনার্থীরা পায় অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ, ভুলে যায় ক্লান্তি। নতুন করে নতুন উদ্যমে এখান থেকে কাজ করার শক্তি নিয়ে যায় সকলেই।

অ্যামিউজমেন্ট পার্কগুলোতে যে রোমাঞ্চকর রাইডগুলো থাকে তাতে সাধারনত সকল প্রকার সাবধানতা নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু একবার ভেবে দেখুনতো রাইডে উঠার পর তা মাঝ পথে থেমে গেল, কিংবা চেয়ারের সিকিউরিটি বেল্ট খুলে গেল বা রাইড দড়ি ছিঁড়ে পড়ে গেল তখন কি অবস্থাটা হবে! ভাবতেই নিশ্চয় গাঁ শিউরে উঠছে। কিন্তু বাস্তবেই কিছু কিছু রাইডে ঘটেছে এমন ঘটনা। অতি সাবধানতার মাঝেও এসব রাইডে ঘটেছে দুর্ঘটনা।

মানুষকে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার কারণে এই রাইডগুলো জায়গা করে নিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রাইডের তালিকায়। অনেকেই মনে করেন যে এই সকল রাইড  বানানোই উচিত হয়নি। দুর্ঘটনার কারনে অনেক রাইড তাৎক্ষণিক ভাবেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার কিছু রাইড দুর্ঘটনা সত্ত্বেও এখনো চালু আছে। পাঠকদের জানানোর জন্য বিপদজনক এইসব রাইড নিয়ে বিস্তারিত লেখা হল।

ডার্বি রেসার রোলার কোস্টার

রিভ্যেয়ার, ম্যাসাচুসেটস

মৃত্যু ট্রেন নামে পরিচিত এই রাইডটি ১৯১১ সালে চালু করা হয়। অবাক করা বিষয় হল এই রাইডটি ট্রাফিক লাইট আবিষ্কৃত হওয়ারও এক বছর আগে চালু হয়। স্বভাবতই সেসময় এখনকার মতন সাবধানতা অবলম্বন করা হত না। তিন দশক ধরে এই রাইডটি চালু ছিল। এই সময়কালে এই রাইডটি অনেককেই আনন্দ দিয়ে থাকলেও অনেকের জন্যই হয়ে উঠেছিল দুঃখের স্মৃতি। তিন দশকে এই রাইডে তিনজনের মৃত্যু হয়। এছাড়াও অনেকেই আহত হন। ১৯৩৬ সালে ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট এটি বন্ধ করার আদেশ প্রদান করে।

ব্যাটার সি ফান ফেয়ার বিগ ডিপার

লন্ডন, ইংল্যান্ড

১৯৭২ সালের আগ পর্যন্ত বিগ ডিপার রাইডটি ছিল ইউরোপের সফল ও জনপ্রিয় ব্যাটার সি ফানফেয়ার অ্যামিউজমেন্ট পার্কের মূল আকর্ষণ। ১৯৭২ সালের কোন এক ছুটির দিনে আকর্ষণীয় এই রাইডের একটি কার্ট মাঝপথে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার দড়ি থেকে আলাদা হয়ে পরে এবং পেছনের দিকে গড়িয়ে ডক স্টেশনের দিকে যেতে থাকে। ডক স্টেশনে রাইডটিতে যাত্রা শুরু করার জন্য অপেক্ষমাণ আরেকটি কার্টকে পেছনের দিকে দ্রুতবেগে আসা কার্টটি জোড়ে ঢাক্কা দেয়। এই সংঘর্ষে ৫ জনের মৃত্যু হয় এবং ১৩ জন গুরতর আহত হয়। সেই থেকে ব্যাটার সি ফানফেয়ারের মূল আকর্ষণ বিগ ডিপার রাইডটি চিরতরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ব্যাটম্যান দ্যা রাইড-সিক্স ফ্ল্যাগ,

জর্জিয়া

এই রাইডের মজার ব্যাপার হল যারা এই রাইডটিতে চড়েন তাদের জন্য এটি ভয়ংকর নয়। বরং যারা এর নিচ দিয়ে চলাচল করে তদের জন্য এটি ভয়ংকর। কারণ এই রাইডটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে খুবই নিচে প্রায় মাটি ঘেঁষে চলে। যার কারনে এর নীচ দিয়ে হাঁটা মানুষের জন্য এই রাইডটি ভয়ংকর। ২০০২ সালে এই রাইডের নিচ দিয়ে হাঁটার সময় একজন কর্মকর্তার মাথায় রাইডে থাকা দর্শনার্থীর পা দিয়ে আঘাত লাগে এবং মারা যায়। ২০০৮ সালে এক কিশোরের ঠিক একইভাবে মৃত্যু ঘটে।

নটস বেরি ফার্ম পেরিলাস প্লাঞ্জ

বুয়েনা পার্ক, ক্যালিফোর্নিয়া

যেকোন থিম পার্কের অন্যতম আকর্ষণ হল ওয়াটার রাইড গুলো। নানান ধরণের ওয়াটার রাইডের মধ্যে উঁচু থেকে খাড়া পথে দ্রুতবেগে স্লাইড করে নিচে জমা রাখা পানিতে পড়ার রাইডগুলো ছোট বড় সবার কাছেই জনপ্রিয়। এই ধরণের রাইডকে নতুন মাত্রা দেওয়ার জন্য পেরিলাস প্লাঞ্জ রাইডটি চালু করা হয়। এই রাইডের বিশেষত্ব ছিল যে এর স্লাইডটি অত্যন্ত উঁচু ও খাড়া করে বানানো হয়।

২০০১ সালে ৪০ বছর বয়সী লোরি ম্যাসন লর‍্যেজ আর সকলের মতন এই রাইডে চড়ে বসেন। কিন্তু বিপত্তি বাধে যখন তাকে বহনকারী কার্টটি স্লাইড দিয়ে নামতে শুরু করে। স্লাইড দিয়ে নামার সময় তিনি হঠাত তাঁর কার্ট থেকে ছিটকে ১০০ মিটার নিচে মাটিতে পড়ে যান। তাঁর মৃত্যুর পরেও ২০১২ সাল পর্যন্ত এই রাইডটি চালু রাখা হয়।

ওয়াটার ওয়ার্ল্ড বাঞ্জি পাইপলাইন

কনকর্ড, ক্যালিফোর্নিয়া

নাম থেকেই বুঝতে পারছেন নিশ্চয় যে এটি বাঞ্জি জাম্পিং এর একটি রাইড। সাধারণত উঁচু স্থান থেকে শূন্যে লাফ দেওয়াকে বাঞ্জি জাম্পিং বলা হয়। এসময় যিনি লাফ দেন তাঁর কোমরে একটি দড়ি বেধে দেওয়া হয় যার সাহায্যে তিনি লাফ দেওয়ার পর নিচে শেষ বিন্দুতে পৌছে যাওয়ার পর দড়ির সাহায্যে ঝুলে থাকেন এবং তাঁর সাহায্যে উপড়ে উঠে আসেন। কিন্তু এই রাইডে পাইপলাইনের স্লাইডের নিচে একটা ওয়াটারবেড রাখা হয় যাতে মানুষ স্লাইড এর পর তাঁর উপরে পরে।

এই রাইডে যে দূর্ঘটনা ঘটে তাঁর জন্য রাইড কিংবা কতৃপক্ষের কোন দোষ ছিল না। ১৯৯৭ সালে হাই স্কুলের ৩০ জন ছাত্র ছাত্রী এসে এই রাইডে ভীড় জমায়। রাইডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার বার বার নিষেধ সত্ত্বেও তাঁরা লাইন ভঙ্গ করে। ধারণ ক্ষমতার বেশি মানুষ হয়ে যাওয়ায় রাইডটি ভেঙ্গে পড়ে। এই ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয় এবং বাকি সকলেই আহত হয়। যার মধ্যে ১৭ জন হুইল চেয়াড়ে বসে গ্র্যাডুয়েশন শেষ করে।

স্ক্যাড ডাইভ

এই রাইডটি বিভিন্ন পার্কেই ছিল। অনেক দর্শণার্থীর মতে এই রাইডটি চালু করাই উছিত হয় নি। স্ক্যাড হল সাসপেন্ডেড ক্যাচ এয়ার ডিভাইসের সংক্ষিপ্ত রূপ। এই রাইডে ১৫০ ফিট উপর থেকে লাফ দেওয়ার পর মানুষ নিচে একটি জালের উপরে গিয়ে পরে যা মাটি থেকে ৫০ ফিট উপরে রাখা। ভয়ের ব্যাপার হল ১৫০ ফিট উপর থেকে লাফ দেওয়ার সময় কোন সেফটি গিয়ার ব্যবহার করা হয় না। এই রাইডে কোন মৃত্যুর ঘটনা না থাকলেও অসংখ্য হতাহতের ঘটনা আছে। প্রায় সময় লাফ দেওয়ার পরে অনেকে জাল ছিঁড়ে নিচে পরে যায়। আবার অনেকে জালে না পরে একেবারে সোজা মাটিতে গিয়ে পরে।

দ্যা বিগ ওয়ান

ব্ল্যাকপুল, ইংল্যান্ড

দ্যা বিগ ওয়ান রাইডটি ১৯৯৪ সালে চালু করা হয়। শুরুর সময় থেকেই এটি তরুনদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেসময়ে এটিকে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বেশি কুল রাইড বলা হত। এই রাইডটি ঘন্টায় ১২০ কিমি গতিতে চলে। কিন্তু পুরনো এই রোলার কোস্টারটির জন্য এই গতির সাথে তাল মেলানোটা একটু বেশি কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়তো। কারণ ইতিমধ্যে এর কারনে ৪৬ জন হতাহত হয়েছে।

অ্যাকশন পার্ক কায়াক এক্সপেরিয়েন্স

ভারনন, নিউ জার্সি

এই রাইডটির মাধ্যমে অ্যাকশন পার্ক কতৃপক্ষ চেয়েছিলেন দর্শনার্থীদের সাদা পানিতে কায়াকিং এর রোমাঞ্চ উপভোগ করাতে। এখানে কায়াকিং এর জন্য সাদা পানির পুলে বড় বড় কৃত্রিম ঢেঊ তৈরী করা হয়। কিন্তু কতৃপক্ষের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা প্রদানের উদ্দেশ্য সফল হয় নি। একজন দর্শনার্থী তাঁর কায়াকিং বোট নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারের স্পর্শে মারা যায়। পাঠকদের মনেও নিশ্চয় প্রশ্ন আসছে যে পানিতে বৈদ্যুতিক তাঁর কি করে এল! অনুসন্ধানে জানা যায় যে, কায়াকিং করতে আসা মানুষদের আনন্দ দেওয়ার জন্য যে কৃত্রিম ঢেউ তৈরী করা হয় তাঁর জন্য পানির নিচে বিশালাকার ফ্যান বুভার করা হয়। ১৯৮২ সালে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সুপারম্যান, রাইড অফ স্টিল- সিক্স ফ্ল্যাগ

ইংল্যান্ড

আপনি যদি ভেবে থাকেন যে সিক্স ফ্ল্যাগ ইংল্যান্ড পার্কের এই রাইডটি আপনাকে সুপারম্যান হওয়ার অনুভূতি দিবে তাহলে ভুল ভাবছেন। এই কোস্টার রাইডটিতে ২০০১ সালে ২২ জন আহত হন এবং ২০০৪ সালে এক ব্যাক্তি রাইড থেকে ছিটকে মাটিতে পরে মারা যান। তাই এই রাইডে চড়ার আগে দ্বিতীয়বার ভেবে নিন।

অ্যাকশন পার্ক গ্রেইভ পুল

ভারনন, নিউজার্সি

অ্যাকশন পার্কের আরেকটি কলঙ্কময় ওয়াটার রাইড এটি। উঁচু ঢেউ বিশিষ্ট এই পুলটি স্থানীয়দের কাছে গ্রেইভ পুল নামে পরিচিত। এই নামের পেছনে যথার্থতা রয়েছে। বিশাল এই পুলটি প্রস্থে ২৫০ ফিট ও দৈর্ঘ্যে ১০০ ফিট। এর গভীরতা ৮ ফিট। এই পুলে সার্বক্ষণিক ১০ থেকে ১২ জন লাইফগার্ড থাকে। যেখানে অন্য পুলের লাইফগার্ডরা সপ্তাহে ২ থেকে ৩ জনকে উদ্ধার করতো সেখানে গ্রেইভ পুলের লাইফগার্ডরা উদ্ধার করতো ২০ থেকে ৩০ জনকে। কর্তৃপক্ষের অনেক ভাল প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সালে ৩ জনের মৃত্যু ঘটে এই পুলে। এই ওয়াটার রাইডটি এখনো পর্যন্ত চালু রয়েছে।

দ্যা মনোরেল, ডিজনি ল্যান্ড

একাধিক ডিজনিল্যান্ডে অবস্থিত এই মনোরেলের রয়েছে দুর্নাম। এই রাইডটিতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হয়েছে। হতাহতের ঘটনাও কম নয় এই রাইডে। তাই অনেকেই এই রাইডটিকে সবচেয়ে বিপদজনক রাইড মনে করেন।

মাইন্ড ব্লেন্ডার

কানাডিয়ান মল

১৯৮৬ সাল পর্যন্ত এই রাইডটিকে পৃথিবীর সবচাইতে নিরেপদ রাইড মনে করা হত। কিন্তু ১৯৮৬ সালে রাইড চলা অবস্থায় এর একটি কার্টের স্ক্রু ঢিলা হয়ে গেলে কার্টটি উল্টোপথে চলতে থাকে এবং পিলারের সাথে এর সংঘর্ষ হয়। এই ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ