রোজাদারদের ইফতারি করানো বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আমরা মেরে ফেলতে চাইছি?

ঢাকা, রোববার   ১২ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ২৮ ১৪২৭,   ২০ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

রোজাদারদের ইফতারি করানো বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আমরা মেরে ফেলতে চাইছি?

 প্রকাশিত: ১৫:৫০ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭   আপডেট: ১৫:৫৮ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গত রমজান মাসের কথা। ঢাকার সবুজবাগের ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে প্রতিদিন ইফতারের আগে গেলে দেখতে পাওয়া যেত এক অদ্ভুত দৃশ্য। দলে দলে শত শত মানুষ জড়ো হয়েছেন বৌদ্ধ বিহারের গেটের বাইরে, ঠিক বিকেল পাঁচটার সময় ফটক খুলে দেওয়া হচ্ছে, একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু অপেক্ষমাণ রোজাদার মুসলমানদের হাতে তুলে দিচ্ছেন নম্বর লেখা একটি টোকেন, সেই টোকেন নিয়ে মন্দিরের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াচ্ছেন সবাই। তারপর তাদেরকে উন্নতমানের ইফতারীর প্যাকেট বিতরণ করছেন ভিক্ষুরা। আজ প্রায় ৭ বছর ধরে রোজার মাসের ৩০ দিনই প্রতিদিন এভাবে প্রায় ৫০০ জনেরও বেশী রোজাদারকে ইফতার করিয়ে যাচ্ছেন এই বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হয়েও সারা বছর রোজার মাসের জন্য। ক্ষুধার্থ রোজাদারদের ইফতারী করানো তাদের কাছে যেন এক অন্যরকম উৎসব।

এবার সেই একই ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের সামনে দৃশ্যটা দেখে আসি চলুন। সময়টা গত পরশুদিন, সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ। রমজানের পর ৩-৪ মাস পার হয়েছে মাত্র। এখন যদি আপনি বৌদ্ধবিহারের সামনে যান, তাহলে দেখবেন প্রধান ফটক বন্ধ, চারপাশে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রতি শিফটে একজন এসআই’র নেতৃত্বে দশ জন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। চারপাশের অবস্থা দেখে মনে হবে এটি একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা, যেকোন সময় হামলার আশংকায় একেবারে সতর্ক রয়েছেন সবাই।

কী, একটু ধাক্কা লাগলো? নিশ্চয়ই মনে প্রশ্ন জেগেছে, যে বৌদ্ধবিহার থেকে ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে রোজাদার মুসলমানদের বছরের পর বছর ধরে প্রতি রমজানে ইফতারী করানো হয়, সেই বৌদ্ধবিহারে এমন কি ঘটলো যে সম্মানিত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের রীতিমত পাহারা দিয়ে রাখতে হচ্ছে যেন তাদের কেউ আক্রমণ করতে না পারে! সমস্যা কোথায়?

হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। সমস্যা হচ্ছি আমরা। আমাদের অতি অনুভূতিপ্রবণ দুর্গন্ধ ছড়ানো অন্ধ চিন্তা, বিশ্বাস আর বিলীন হতে বসা মনুষ্যত্ব। মিয়ানমারের জাতিগত দাঙ্গায় সে দেশের সেনাবাহিনী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে, সেই খবর শুনে আমরা এতটাই উত্তেজিত হয়ে উঠেছি যে সাত-পাঁচ না ভেবে, প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছি আমাদের দেশের নিরীহ নিরপরাধ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর। আমাদের অন্ধ ধর্মানূভুতি এতোটাই উন্মাদ করে ফেলেছে আমাদের যে, রোহিঙ্গা জাতির মধ্যে স্রেফ মুসলমান না, হিন্দু-বৌদ্ধসহ আরও অনেক ধর্মের অনুসারীই আছে এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বেছে বেছে শুধু মুসলিম রোহিঙ্গা না, সকল ধর্মের অনুসারী রোহিঙ্গাদের উপরেই নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাচ্ছে, এই তথ্যটুকু জানারও প্রয়োজন করিনি। এমনকি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের সাথে সাধারণ বৌদ্ধদের কোন সম্পর্ক নেই, এরজন্য দায়ী মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। পুরো মিয়ানমারেই আরও অনেকগুলো মুসলিম সম্প্রদায় আছে যারা খুব শান্তিপূর্নভাবে বাস করছে, তাদের উপর কখনো কেউ অত্যাচার চালায়নি, এই দুটো অতি গুরুত্বপুর্ণ তথ্যও আমরা জানি না। আমরা যা বিশ্বাস করি তা হচ্ছে মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মারছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধরা (আসলে আর্মি), তাই আমাদের দেশে সংখ্যালঘু বৌদ্ধদের মারা আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের জন্য ফরজ! কত বড় বর্বর পিশাচ হলে কেউ এভাবে ভাবতে পারে!

ধর্মের নামে জিহাদী জোশে আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে গেছি যে আজকে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের, যারা পবিত্র রমজান মাসে অভাবী খেটে খাওয়া রোজাদারদের উন্নতমানের ইফতারী করিয়েছিলেন ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে, আমাদের ইফতারি করানো ছিল তাদের কাছে অকৃত্রিম আনন্দ আর তৃপ্তির বিষয়, সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আজ ২৪ ঘন্টা সতর্ক প্রহরায় নিরাপদ রাখতে হচ্ছে। কারণ ভিনদেশে অচেনা এক সেনাবাহিনী সেই দেশের মানুষ মেরে ফেলেছে, সেই “অপরাধে” আমাদের দেশের এই নিরীহ নিরপরাধ ভালো মানুষগুলোর উপর আমরা যেকোন সময় ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। আমাদের দেশের মানুষকে মেরে ফেলতে পারি ভিনদেশীদের অপরাধে! বেশ কিছু পেইজে প্রচার করতে দেখলাম, আমাদের দেশের নিরীহ বৌদ্ধদের ইসলামের দোহাই মেরে ফেলা নাকি আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। অথচ রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার আর নির্যাতন শুরু হবার পর থেকেই আমাদের দেশের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রায় প্রতিদিনই মানববন্ধন করছেন, স্পষ্ট ও জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, বৌদ্ধ ধর্ম কেবল মানুষ নয়, কোনও প্রাণী হত্যারও পক্ষে নয়। যারা প্রকৃত বৌদ্ধ, তারা কখনই মানুষ হত্যা করতে পারে না। গৌতম বুদ্ধ আমাদের সেই শিক্ষা দেননি।’

তবুও আমাদের বোধোদয় হচ্ছে না। বিবেক পচে গিয়ে মনুষ্যত্বের লাশে মিশে গেছে। অবস্থা এখন এতটাই সঙ্কটাপন্ন যে, বৌদ্ধ মন্দির এলাকায় নিরাপত্তা থাকলেও বাইরে বের হলে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কেউ কেউ বাজে মন্তব্য ও ধাওয়ার শিকারও হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। কমলাপুরের ‘ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহার’-এ সংবাদমাধ্যমের সাথে কথা হয় বৌদ্ধ শ্রমণ দীপ্ত বড়ুয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমি এক ভক্তের বাসায় যাচ্ছিলাম। কদমতলী ৯ নম্বর লেনে যাওয়ার পর কয়েকজন যুবক প্রথমে খুব বাজে ভাষায় গালাগালি করে। এরপর হামলা করবার জন্য ধাওয়া করে। তখন আমি ভয়ে পালিয়ে আসি।’ এরপর থেকে খুব জরুরি কাজ ছাড়া মন্দিরের বাইরে যাওয়া হচ্ছে না বলে জানান তিনি। দীপ্ত বড়ুয়া বলেন, ‘মনের মধ্যে একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। আমাদের বাইরে চলাফেরা করতে সমস্যা হচ্ছে।’

এই ভিক্ষু তো তবুও বেঁচে গেছেন, কিন্তু বেনাপোল বর্ডারের কাছে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রবল হয়রানী, অপমান ও অপদস্থ করা হয়েছে ক’দিন আগেই। হেনস্তার শিকার ওই ভিক্ষুর নাম জ্ঞান মিত্র ভিক্ষু। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি চিকিৎসার জন্য এ বছরের মার্চে ভারতে যাই। মঙ্গলবার বেনাপোল সীমান্ত থেকে দেশে আসি। পানি কিনতে একটি দোকানে গেলে আচমকা কয়েকজন তরুণ আমাকে ঘিরে ধরেন। তারপর একটা গাড়িতে আমাকে তোলা হয়। তাদের শিখিয়ে দেওয়া কয়েকটি বাক্য উচ্চারণ করতে বলেন। ওই সময় তাঁরা পুরো ঘটনা ধারণ করেন।’

জ্ঞান মিত্র বলেন, তাঁরা এ সময় তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করার ভয় দেখাচ্ছিলেন। তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে পরদিনই আবার ভারতে ফিরে যান। এই তিন ধর্মোন্মাদ তরুণ তাকে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে বলছিল মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের জন্য। ‘তুই’ ‘তোকারি’ করে দেওয়া হচ্ছিল মেরে ফেলার হুমকি। অসহায় সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুর চোখে মুখে স্পষ্ট প্রবল আতংকের ছাপ। কি অমানুষিক ভয়ের মধ্যে থেকে তিনি কথা বলে যাচ্ছিলেন কল্পনাও করা যায়না! ইসলাম কি আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে? ইসলামের নামে এমন নিকৃষ্ট অমানূষিকতা চালাতে আমাদের লজ্জা হয় না?

গত ৪০ বছর ধরে আশ্রয় নিতে এসে জমি দখল করে স্থায়ীভাবে থাকছে রোহিঙ্গারা, ইয়াবা সিন্ডিকেটসহ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের একটা বড় অংশ। তবুও ভয়ংকর জঙ্গী ঝুঁকি থাকার পরেও স্রেফ আর্তমানবতার তাগিদে উদারতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত না খুলে দিয়েও মাত্র ১১ দিনে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে। বিশ্বের সামনে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি হয়েছে উজ্জ্বল, নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের আমরা বুকে টেনে নিচ্ছি, আশ্রয় দিচ্ছি, খাবার দিচ্ছি, থাকার জায়গা দিচ্ছি, পাহাড় কেটে বন ধ্বংস করে তাদের জন্য বাড়িঘর বানানো হচ্ছে, ক্ষতি হচ্ছে আমাদের দেশের, তবুও এত ক্ষতি মেনে নিয়েও নিপীড়িত রোহিঙ্গার পাশে আমরা উদাত্ত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়েছি, সবার উপরে স্থান দিয়েছি মানবতাকে। এতটা মানবিক উদার যে দেশের মানুষ, সেই তারাই সম্পুর্ণ বিনা কারণে আমাদের দেশের নিরপরাধ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছেন, এটা ভাবতেও বড় কষ্ট হয়। যদি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অপরাধে এই দেশের বৌদ্ধদের উপরে আমরা ঝাঁপিয়েই পড়ি, তাহলে তাদের মেরে ফেলতে চাই, যদি আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের ভয়ে সংখ্যালঘু বৌদ্ধরা সর্বক্ষণ আতংকিত হয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের সাথে ঐ নির্যাতনকারী হত্যাকারী মিয়ানমারের আর্মির পার্থক্য কোথায় রইল? আমরাও তো ওদের মতই হয়ে গেলাম। রোহিঙ্গাদের জন্য আমাদের যে মানবতা কেঁদে মরে, বৌদ্ধদের বেলায় সেটা ধর্মান্ধ পিশাচ হয়ে যায় কেন? তবে কি আমাদের মানবতাও ধর্মান্ধ হয়ে গেল?

ডেইলি বাংলাদেশ/আর কে