.ঢাকা, রোববার   ২৪ মার্চ ২০১৯,   চৈত্র ১০ ১৪২৫,   ১৭ রজব ১৪৪০

নি য় মি ত ক লা ম

রাষ্ট্রশাসনের ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো

ফকির ইলিয়াস

 প্রকাশিত: ১৪:১৬ ১৩ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৫:০৭ ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

ফকির ইলিয়াস
ফকির ইলিয়াস- কবি, প্রাবন্ধিক। স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন নিউইয়র্কে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা - ১৮। 'কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস','একাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস',' দ্যা এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল', 'আমেরিকান ইমেজ প্রেস'- এর সদস্য।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের একটি মহল খুশি নয়। তারা খুশি নয় এর ফলাফল নিয়েও। ফলাফল কেন এমন হয়েছে- তা নিয়ে অনেক কথাই বলা যাবে। তবে এর মধ্যে যে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, বিএনপি নামের একটি বড় রাজনৈতিক দল, যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের ২৫ জন সদস্যকে মনোনয়ন দিয়েছিল। এরা কেউ পাশ তো করেনই নি, ভালো ভোটও পাননি।

কিন্তু এরপরও একটি ভালো ভোটাংশ পেয়েছে বিএনপি। বিএনপি হয়তো আরও ভালো করতে পারতো। কিন্তু তাদের না না ধরনের দুর্বলতা ছিল। তাদের সংগঠনটি না না ধরনের রাজনৈতিক পাপের ভারে এতোটাই নুয়ে পড়েছে যে, এর ছায়াতলে মানুষ দাঁড়াতেই ভয় পেয়েছেন। ফলে মানুষজন, তাদের বিশ্বাস করতে পারেন নি। বিএনপি চেয়েছিল ডঃ কামাল হোসেনের মতো একজন প্রাক্তন আওয়ামী লীগারের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে। তাদের কোনো সরকার গঠনের এজেন্ডা ছিল

না। ভোটার'রা এতে চরম হতাশ হয়েছেন। এই হতাশা, চলমান উন্নয়নের দিকেই ভোটারকে টেনেছে। আওয়ামী লীগের নিরংকুশ জয়ের এটাও একটি অন্যতম কারণ।

আপনারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর প্রিয় শব্দটি বহুদিন পর শুনেছিলেন ড. কামাল হোসেনের মুখে! ‘খামোশ' বলে তিনি সাংবাদিকদের ধমকি দিয়েছিলেন।

কারণ তার আর কোনো উপায় ছিল না। কিন্তু প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন জানার কথা, 'খামোশ' বললেই মানুষের মুখ বন্ধ করা যায় না।এর প্রমাণ তিনি পেয়েছেন। মজার কথা হচ্ছে, নির্বাচনের দেড় সপ্তাহের মাথায় ড. কামাল নিজেই বলেছেন, 'জামায়াতের ২৫ জন প্রার্থীকে প্রতীক দেয়া হবে, বিষয়টি আমি জানতাম না। দেয়ার পর বিএনপির কাছে আমি ব্যাখ্যা চেয়েছিলাম। তারা বলেছে সবাই ধানের শীষের প্রার্থী। জামায়াতের কেউ নেই।'

জামায়াত প্রশ্নে ভবিষ্যতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কিংবা গণফোরাম কোন পথে হাঁটবে- জানতে চাইলে কামাল বলেন, 'আমাদের বক্তব্য একদম পরিষ্কার যে, জামায়াতকে নিয়ে আমরা রাজনীতি কখনো করিনি। কোনোদিন করার কথা চিন্তাও করিনি। যেটা করেছি। সেটা আমি সঙ্গে সঙ্গে বলেছি যে, এটা তো আমাদেরকে বলা হয়নি যে, জামায়াত থাকবে এটার মধ্যে।' আমার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা পরিষ্কার কোনো কথা নয়।

কারণ, বিএনপি একদিকে ঐক্যফ্রন্টে থেকেছে।অন্যদিকে তারা তলে তলে '২০ দলীয় জোটের' নামে লিঁয়াজো রেখেছে জামায়াতের সঙ্গে। এটা ড. কামাল হোসেনের না জানার কথা নয়। তিনি একটি দলের নেতা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তার না জানার কথা নয়।

নির্বাচন শেষ হয়েছে। মাননীয় মন্ত্রীরা শপথ নিয়েছেন। সরকার পুরোদমে কাজ শুরু করেছে।এর মাঝেই গার্মেন্টস শ্রমিকদের দাবি নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।হঠাৎ এই উত্তপ্ত অবস্থা কেন? কেউ কি এর নেপথ্যে কল-কাঠি নাড়ছে?  বিষয়টি যেমন নজরে রাখা দরকার, তেমনি ন্যায্য দাবি মানার বিষয়েও সরকারের উদারতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে যারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন,রাষ্ট্রশাসনের দায়িত্ব তাদেরই। আমরা দেখছি, একটি মহল এরইমধ্যে শুরু করেছে 'সরকারের মেয়াদ কতদিন?' কী তাজ্জবের কথা! কি মনে করছে তারা! এই সরকারের ডানে-বামে দুদিকেই তাদের শত্রু। মহাজোটের যারা মন্ত্রীত্ব পাননি, তাদের নিয়েও একটি চক্র যড়যন্ত্র শুরু করেছে। তাদের দিয়ে মহাজোটে ভাঙনের চেষ্টাও করা হতে পারে। কারণ যে আ স ম আবদুর রব, একসময় শেখ হাসিনা মন্ত্রী ছিলেন- তিনিই এখন চরম সরকার বিরোধী।

এখন সময় এসেছে, প্রজন্মকে অনুধাবন করার, কারা এই দেশে মানুষের রায়ের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। এবং কেন দাঁড়াচ্ছে। গেল এক বছরে, কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নামে অনেকেই তেল ঢেলেছে আগুনে। তারা প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। আমাদের যে বিষয়টি বার বার শোনতে হয়েছে, তা হলো 'মুক্তিযুদ্ধ না গণতন্ত্র'। অথচ আমরা জানি একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্যই তিরিশ লাখ শহীদ তাদের প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন।

আমি মনে করি, আজকের বাংলাদেশ সেই চেতনা ধারণ করেই এগোচ্ছে। চলমান মন্ত্রী পরিষদে অনেক প্রবীণ ব্যক্তিত্ব বাদ পড়েছেন । এসেছেন নবীনরা। নবীনদের কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। কারণ প্রবীণদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েই একটি তরুণ নেতৃত্ব এগিয়ে যায়। শেখ হাসিনা দেশের ভবিষ্যতই দেখেছেন।

যারা আগামী দিনের রাষ্ট্রকাণ্ডারী, তাদেরকে শাণিত করতেই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। একটি সফল রাষ্ট্রকাঠামোর অন্যতম শর্ত হচ্ছে জননিরাপত্তা ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। এই সরকারকে দাবীটি জানাচ্ছেন গোটা দেশের মানুষ। আমরা জানি, সাধারণ মানুষ সবসময়ই দুর্নীতিবাজদের বিপক্ষে। এমনকি রাজনীতিবিদরাও দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা করেন। তাহলে দুর্নীতি কেন বন্ধ হয় না?  ফুলে-ফেঁপে ওঠা দুর্নীতিবাজদের প্রতিরোধ করতে এখন সামাজিক প্রতিরোধ দরকার।

একই সঙ্গে, দেশ পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারকে সোচ্চার হতে হবে। প্রজাতন্ত্রের সেবক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেই ব্যবস্থা নিতে হবে। যে ক্ষমতাবান, তার পাশে দাঁড়াবে- তাকে চিহ্নিত করতে হবে।

আমরা দেখছি, দুদক অনেক পরিকল্পনার কথাই আমাদের শোনাচ্ছে। এর বাস্তবায়ন দরকার। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ ২০১৯ সালের প্রত্যয়-সরকার যে দৃঢ়তার কথা বলছে,এর পাশে সবাইকে থাকতে হবে।

পুলিশকে ন্যায়ের পথে নিয়ন্ত্রণ, ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ সরকারি দলের নেতাকর্মীদের  কোন্দল দূর করে তাদের মাঝে শৃঙখলা ফিরিয়ে আনা, শেয়ারবাজার ও ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, মেগা প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ করা, সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এই সরকারের অন্যতম ব্রত হওয়া দরকার।

বলার অপেক্ষা রাখে না, মিডিয়াকেই বড় ভূমিকা রাখার জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে হবে। গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে রাখার জন্য যেসব আইন- তা সংশোধন করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে সাংবাদিকদের জন্য। আমরা ভুলে যাচ্ছি না- বিএনপি ঐক্যফ্রন্টের আটজন এমপি যদি শপথ না নেন- তাহলে সরকারের আধিপত্য আরও বাড়বে। তাই তারা যেন বেসামাল হয়ে না উঠেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর