রাত হলেই বসত আসর বুড়িগঙ্গা পাড়ের বিখ্যাত বাড়ির জলসা ঘরে

ঢাকা, শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২০ ১৪২৬,   ০৯ শা'বান ১৪৪১

Akash

রাত হলেই বসত আসর বুড়িগঙ্গা পাড়ের বিখ্যাত বাড়ির জলসা ঘরে

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৬:১০ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১২:৫০ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার দুই বিখ্যাত ব্যবসায়ী একটি বাড়ি কিনেই দেশবাসীকে চমকে দেন। রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাসের বণিক সমাজে বেশ নাম ডাক ছিল। সময়টা ঠিক ১৮৩৫ সাল। নিজেদের সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে মানানসই হবে এমন একটি বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন তারা। 

আর্মেনিয়ান জমিদার আরাতুন ১৮২৫ সালের কাছাকাছি সময়ে একটা বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেন। ১০ বছর বয়সী সেই বাড়িটি নগদ টাকায় কিনে নেন রূপলাল। বাড়িটির নাম রাখেন রূপলাল হাউজ। আচ্ছা তার আগে আপনাদের রূপলালের গল্পটা বলি। 

ছাত্র হিসেবে রূপলাল ছিলেন খুবই মেধাবী। প্রবেশিকা পরীক্ষায় মেধাক্রমের জন্য পেয়েছিলেন ১০ টাকার বৃত্তি। ব্যবসা জীবন শুরু করেছিলেন লগ্নি ব্যবসা করে। তাও একদম পথে পাটের বস্তা বিছিয়ে হকারদের মতো করে। সেখান থেকে নিজের মেধার জোরেই উঠে আসেন ঢাকা শহরের সবচেয়ে ধর্নাঢ্য ব্যবসায়ীদের কাতারে। ইতিহাসের প্রায় সব জাগাতেই রূপলাল দাসকে তার মেধা, পরিশ্রম আর রুচির জন্য অনন্য করে রেখেছে। 

রূপলাল হাউজরূপলাল তার রুচির বড় পরিচয় দিয়েছিলেন তার বাড়িটির সাজসজ্জায়। আর্মেনিয়ান জমিদারের পুরনো বাড়িটি কিনে তিনি নিজের মনের মতো রূপ দেন। মানুষ হিসেবে রূপলাল ছিলেন ভয়াবহ বিলাসী। তিনি তার বাড়ির পুননির্মাণের কাজ করান সেসময়কার কলকাতার বিখ্যাত ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি মার্টিন এন্ড কোংদের হাতে। নির্মাণ কাজ শেষ হতে দীর্ঘসময় লেগেছিল। বিলাসী রূপলাল দশক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপিয়ান স্থাপত্যের সর্বশেষ ডিজাইনগুলোর ছাপ রেখেছিলেন তার শখের বাড়িতে। 

বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর পারে পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত এটি। ৯১ দশমিক ৪৪ মিটার দীর্ঘ দ্বিতল ভবনটি ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক পুননির্মাণ করা হয়। মার্টিন এন্ড কোং কোম্পানির একজন স্থপতি এই বাড়ির নতুন নকশা প্রণয়ন করেন। দুই তলা এই ভবনের কারুকাজ ও নির্মাণশৈলী সত্যিই অভিনব। রূপলাল হাউজের দ্বিতীয় তলায় দুটি অংশে বিভিন্ন আয়তনের মোট ৫০টিরও বেশি ঘর রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কয়েকটি প্রশস্ত দরবার হল। 

ভবনের পশ্চিমের দিকে দোতলায় অবস্থিত নৃত্যশালাটি তৈরি করা হয় অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে। এর মেঝে ছিল কাঠের। পুরো বাড়ি জুড়েই উত্তর-দক্ষিণ পাশে প্রশস্ত বারান্দা রয়েছে। আর এভাবেই রূপলাল হাউজ হয়ে ওঠে ঢাকার বিলাসী ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর জৌলুসে ভরা বাসভবন। এ বাড়ির জলসা ঘরে সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল জনসাধারণের মনে। রাত হলেই গান বাজনার শব্দে মুখরিত হত চারপাশ। 

এই বাড়িতেই ছিল জলসা ঘরশুধু রাত হলেই খোলা হত জলসা ঘরের দরজা। দক্ষিণ এশিয়ার সেরা সংগীত ও নৃত্যশিল্পীরা সেসময় রূপলাল হাউজের জলসা ঘরে আসতেন। একে একে তারা নাচ-গান পরিবেশনের মাধ্যমে ধনী ব্যবসায়ীদের মনযোগ কাড়তেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, ওস্তাদ ওয়ালিউলাহ খান বা লক্ষ্মীদেবীদের সুরে-তালে, শান শওকতে ভরে থাকত এই জলসা ঘর। 

এরই মধ্যে জানা যায়, মহারানি ভিক্টোরিয়া আসছেন ঢাকা সফরে। তখন ঢাকা শহরে মাত্র দু’টি বিলাসবহুল বাড়ি ছিল। আহসান মঞ্জিল আর অন্যটি রূপলাল হাউজ। কিছু ব্রিটিশ সাহেব সরেজমিনে দু’টি বাড়িই দেখে এলেন। রূপলালের বিলাসবহুল জীবন দেখে ব্রিটিশ সাহেবরা একেবারে চুপ হয়ে যান। বিপুল ভোটে জিতে যায় রূপলাল হাউজ। ঠিক হয় সেখানেই থাকবেন রানি ভিক্টোরিয়া। তবে শেষ পর্যন্ত রানির সফর অসমাপ্তই থেকে যায়।

১৮৮৮ সালে ভাইসরয় ডফরিন এর ঢাকা সফরের সময় ব্রিটিশরা রূপলালের জলসা ঘর ভাড়া করেছিলেন। রূপলাল হাউজে সেসময় একজনের থাকার জন্য ভাড়া ছিল ২০০ টাকা। ১৮৯৭ সালে ঢাকায় বেশ বড়সড় একটা ভূমিকম্প হয়। তাতে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় রূপলাল হাউজ। এরপর আবারো প্রচুর খরচ করে বাড়ি মেরামত করেন রূপলাল। দাস পরিবারের সঙ্গে নবাবদের শুরু থেকেই প্রতিপত্তির একটা প্রতিযোগিতা ছিল।  

রূপলাল হাউজের ছাদ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ছিল রূপলালের মতো সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবারের জন্য ধর্মভিত্তিক আতঙ্কের কারণ। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় তাই দাস পরিবার আর এ দেশে থাকার সাহসই পেলেন না। বাড়ি বিক্রি করে চলে চান সীমানা পেরিয়ে ওপার বাংলায়। এরপর থেকেই শুরু হয় রূপলাল হাউজের মালিকানা নিয়ে দলাদলি। 

১৯৫৮ সালে মোহাম্মদ সিদ্দিক জামাল রূপলাল হাউজ কিনে নাম দেন জামাল হাউজ। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাড়িটির শরীরে এখনো এ নামটিই রয়েছে। গত ২০ বছর ধরে রূপলাল হাউজ ছিল মশলার আড়ত। উপমহাদেশের অন্যতম বিলাসবহুল বাড়িটি পরিণত হয় আড়তে। তবে মশলা ব্যবসায়ীদের কবল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর রূপলাল হাউজকে উদ্ধার করেছে অল্প কিছুদিন আগে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস