রাত বাড়লেই বাড়ে ওষুধের দাম

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৪ ১৪২৬,   ১৩ শাওয়াল ১৪৪০

রাত বাড়লেই বাড়ে ওষুধের দাম

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:১৬ ১১ জুন ২০১৯   আপডেট: ২৩:০৮ ১১ জুন ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

লক্ষ্মীপুর সরকারি হাসপাতালে দালালদের উৎপাতে অসহায় রোগী ও স্বজনরা। প্রতিনিয়ত হয়রানীর শিকার হচ্ছেন মানুষ। ডাক্তার ও কর্মকর্তাদের চোখের সামনে চলছে দালালদের অপকর্ম। দেখেও না দেখার ভান করছেন সবাই। হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনার ওষুধ না দেয়ায়, ফার্মেসিগুলো রাখছে গলাকাটা দাম। মজার বিষয় রাত যত বাড়ে, ততোই বাড়ে ওষুধের দাম।

সরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে জেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। আবার এই সব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর সঙ্গে সক্ষতা রয়েছে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সদের। এই কারণে তাদের সম্মতিতে দালালরা সরকারি হাসপাতালগুলোতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

একজন রোগী সদর হাসপাতালের গেটে প্রবেশ করলেই দালালরা পিছু নেই তার। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের চেম্বারের সামনেই দালালদের দৌরাত্মে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন রোগীরা। রোগীদের হাত থেকে প্রেসক্রিপশন ছিনিয়ে নেয়া, তাদের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো ও তাদেরকে অতিরিক্ত টাকা দেয়ার মতো হয়রানি প্রতিনিয়ত ঘটছে। এছাড়া সরকারি প্রতিটি হাসপাতালে মেডিকেল প্রতিনিধিদের অত্যাচার তো রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ডাক্তারের চেম্বারে রোগী ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ না করার নিয়ম থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তারা ডাক্তারের চেম্বারের ভেতরে ও বাহিরে ভিড় করেন। এতে রোগীদের ডাক্তারি সেবা নিতে বেগ পোহাতে হচ্ছে।

জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোর নোংরা পরিবেশ, রোগীদের নিম্মমানের খাবার পরিবেশন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না দেয়াসহ ডাক্তার ও নার্সদের অবহেলের অভিযোগ তো রয়েছেই।

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু। এ সময় তিনি তার পরিচয় দেয়ার পরও কর্তব্যরত নার্স তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। তিনি ঘটনাটি উল্লেখ করে বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে যদি তাদের আচরণ এমন হয় তাহলে সাধারণ রোগী ও রোগীর আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে তাদের আচরণ কেমন হচ্ছে তা সহজে অনুমান করা যায়।

হাসপাতালের আশপাশের ফার্মেসিগুলোতে ওষুধের দাম অতিরিক্ত রাখার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দিনের বেলায় রোগীদের কাছ থেকে ওষুধেদের দামে চুরি করা হলেও রাতের বেলায় তা ডাকাতিতে পরিনত হয়। রাত বাড়লেই ৩০ টাকা দামের একটা সেডিল ইনজেকশন ৩০০ টাকা আদায় করা হয়।

জেলার স্বাস্থ্য সেবার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র সদর হাসপাতাল। এ জেলার অধিকাংশ মানুষ হত-দরিদ্র। প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে কিংবা জেলার বাইরে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা নেয়া এদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এ অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য ১০০ শয্যা বিশিষ্ট লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালই তাদের একমাত্র ভরসা। প্রায় প্রতিদিনই এ হাসপাতালে রোগীদের ভিড় দেখা যায়। হাসপাতালটি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও এতে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগী সব সময় ভর্তি থাকেন এবং আউটডোরে ১ হাজার থেকে ১৫শ' রোগী প্রতিদিনই চিকিৎসা সেবার জন্য আসেন।

অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হওয়ায় প্রতিনিয়তই হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা করে চিকিৎসা দিতে দেখা যায়। হাসপাতালটি ১০০ শয্যা হওয়ায় অতিরিক্ত ভর্তি থাকা রোগীরা খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সুযোগে খাবার সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিদিন ৬০-৭০ জনের বেশি রোগীকে খাবার দেয়না। যে কয়েকজন রোগী খাবার পায় তাও আবার নিম্মমানের। অনেক রোগীর বাড়ি দূরে হওয়ায় পাশ্ববর্তী হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হয়। এ সব হোটেলে অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করতে দেখা যায়। এতে রোগীরা স্বাস্থ্যকর খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা আছিয়া বেগম, মনির হোসেন, ফুলবানুসহ কয়েকজন রোগী জানান, ভালো চিকিৎসা সেবা পাওয়ার আশায় সরকারি হাসপাতালে আসলাম। কিন্তু এখানে সেবার মান ভালো না। এছাড়া হাসপাতালের আশপাশ ও ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব রয়েছে। তাই অধিকাংশ রোগী ডাক্তার দেখাতে আসলেও এ হাসপাতালে ভর্তির কথা চিন্তাও করেন না। হাসপাতালটি প্রতিনিয়ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হলে রোগীরা স্বস্তি পাবেন।

চরলরেঞ্চ এলাকা থেকে সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা জোসনা বেগম বলেন, ১৪ মে তিনি তার স্বামী মো. ওয়াহেদ আলীকে নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। আশা করেছিলেন সরকারি হাসপাতালে তার স্বামীর ভালো চিকিৎসা হবে। এসে দেখেন, তার উল্টো। প্রতিদিন মাত্র একবার ডাক্তার আসেন। আর নার্সদের তো খুঁজেই পাওয়া যায়না। ওষুধ কিছু দেয়া হয়েছে হাসপাতাল থেকে কিছু কিনতে হয়েছে বাহির থেকে। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেয়া হয় তা খুবই নিম্মমানের। এ কারনে তাকে বাহির থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। হাসপাতালের পরিবেশ এতই খারাপ যে, স্বামীকে নিয়ে এসে এখন নিজেই অসুস্থ্য হয়ে পড়েছেন।

হাসপাতালের শিশু ও ডায়রিয়া বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, চর রুহিতা ইউনিয়নের কাঞ্চনি বাজার এলাকার আমেনা বেগম তার ৬ মাসের কন্যা শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি জানতেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেয়া হয়। কিন্তু তা না হয়ে ভর্তির কয়েক ঘন্টা পর তাকে বাহির থেকে ওষুধ ক্রয়ের জন্য একটি স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হয়। বাহির থেকে ওষুধ ক্রয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে বলেন, এ মানের ওষুধ হাসপাতালে নাই। তাই বাধ্য হয়ে সন্তানের জন্য বাহির থেকে ওষুধ কিনতে হয়েছে তাকে।

রোগীদের সেবা দেয়ার কথা জানতে চাইলে সদর হাসপাতালের কর্মরত সিনিয়র ষ্টাফ নার্স নিলু রাণী দাস জানান, শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগী ভর্তি এবং অধিকাংশ পদ শূন্য থাকায় প্রতিনিয়ত রোগীদের সেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়। এসময় খাবার সংকটসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবের কথা স্বীকার করেন তিনি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরের মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য ১৯৭৩ সালে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল স্থাপিত হয়। পরে ১৯৮৬ সালে এর শয্যা ৫০-এ বাড়ানো হয়। শয্যা কম হওয়ায় জেলার অধিকাংশ মানুষকে চিকিৎসা সেবা সঠিকভাবে প্রদান করা সম্ভব না হওয়ায় ২০০৩ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে হাসপাতালটির ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও ডাক্তার, কর্মকর্তা-কর্মচারী বাড়ানো হয়নি। ১০০ শয্যায় উন্নীত’র ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটি চলছে ৫০ শয্যার লোকবল দিয়ে। এতে রোগীদের সঠিক সময়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া যাচ্ছে না বলে জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আর এরই মধ্যে ২০১৭ সালে সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেয়া হয়। ২০১৮ সালের শেষের দিকে ২৫০ শয্যা হাসপাতালের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। এতো কিছুর মধ্যেও সেই ২০০৩ সাল থেকেই ৫০ শয্যা হাসপাতালের জনবল দিয়েই চলছে কার্যক্রম। এতে রোগীদের ভিড় সামলাতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি সদর হাসপাতালে একটি নতুন এম্বুলেন্স দেয়া হলেও নিয়োগ দেওয়া হয়নি কোন ড্রাইভার।

অপরদিকে নিরাপত্তা প্রহরীর কোন পদ না থাকার কারনে হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এছাড়াও সদর হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন, ইসিজি, নেবুলাইজার মেশিন চালু থাকলেও রেডিওলোজিষ্ট না থাকায় পুলিশ কেইসগুলোতে এক্সরে করা সম্ভব হচ্ছেনা। এ ছাড়াও সনোলজিষ্টের কোন পদ না থাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। যার ফলে জেলার দূর-দুরান্ত থেকে আসা গর্ভকালীন সময়ে মাতৃত্ব সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এ জেলার লোকজনকে চিকিৎসা সেবার জন্য প্রতিনিয়ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম যেতে হচ্ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের ১০০ শয্যার অনুমোদন থাকলেও জনবল দেখানো হয়েছে ৫০ শয্যার। ৫০ শয্যার ১২১টি পদের মধ্যে আবার ২৯টি পদ শূন্য। এর মধ্যে সিনিয়র ষ্টাফ নার্স ৪০ জন মধ্যে ১৮ জন, ষ্টাফ নার্স ২৩ জনের মধ্যে ১ জন, তৃতীয় শ্রেণীর ১৮টি পদের ৩টি এবং চতুর্থ শ্রেণীর ১৮টি পদের ৭টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এছাড়া অর্থোপেডিক্স, সার্জারি, প্যাথলজি টেকনেশিয়ান, একজন ড্রাইভার ও হিসাবরক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় অলসভাবে চলছে চিকিৎসা সেবা। প্রতিদিনই দেখা যায় অসংখ্য রোগী হাসপাতালে এসে চিকিৎসা না নিয়েই চলে যাচ্ছেন।

শূন্যপদে লোক নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন ডা. মোস্তফা খালেদ আহম্মদ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, জনবল সংকটের সমস্যা সমাধানের জন্য একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে ২য় শ্রেণির নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ৪র্থ শ্রেণির জনবল সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। জনবল নিয়োগ হয়ে গেলে আরো ভাল সেবা পাবে জেলার বাসিন্দারা। ৩৯তম বিসিএসএ ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হলে হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

খাবার পরিবেশন ও ওষুধ না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাসপাতালে শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকেন। তাই এদের বেড এবং খাবার ঠিকমতো দেয়া সম্ভব হয় না। এতে অনেক রোগী খাবার থেকে বঞ্চিত হন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করে আসছে সরকার। হাসপাতালে যেসব ওষুধ সরবরাহ আছে তাতে কঠিন রোগীরও  চিকিৎসা করা যায়। আর কোন রোগী যদি ওষুধ না পেয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে চিকিৎসকরা হাসপাতালে যে ওষুধ পাওয়া যায় সে ওষুধ লেখেন না। তাই রোগীরা অন্য কোম্পানির ওষুধ বাহির থেকে ক্রয় করে খাচ্ছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস