Alexa রহস্যে আবৃত তুহালার ‘ডাইনি কূপ’

ঢাকা, বুধবার   ২০ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৫ ১৪২৬,   ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

রহস্যে আবৃত তুহালার ‘ডাইনি কূপ’

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:২৬ ২১ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫৯ ২১ অক্টোবর ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রহস্যঘেরা গল্প-উপন্যাস আমরা সকলেই পড়তে ভালোবাসি। আর সেই সকল গল্পের মতো আমাদের কল্পনার জগতও অনেক সময় বাস্তবতায় কল্পনার আশ্রয় নেয়। তৈরি করে এক একটি রহস্যের। আর সেই রকমই রহস্যে ঘেরা প্রকৃতির এক অদ্ভুত বিস্ময় তুহালা গ্রামের একটি কূপ।

ডাইনি কূপ কূপ বা কূয়ো এখন খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে গল্পে বা পুরোনো বাড়িগুলোতে গেলে দেখা মিলতে পারে এর। কূপের কথা শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে দড়িতে বালতি ঝুলিয়ে গভীর কূপ থেকে পানি তোলার দৃশ্য। এটাইতো স্বাভাবিক,তাই না? তবে যদি দেখেন এমন কূপও আছে যার বাইরেই দড়িতে বালতি ঝুলে থাকে। অথচ পানি উপচে পড়ছে কূপ বেয়ে। এত বেশি পানি গড়িয়ে পড়ে যে, কূপের চারপাশে মোটামুটি ছোটখাটো একটা জলাশয় তৈরি হয়ে যায়। অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়?

হ্যাঁ, এমনই কূপের দেখা মিলবে তুহালা গ্রামে। এটি অবস্থিত উত্তর-পূর্ব ইউরোপে বাল্টিক সাগরের একটি দেশ এস্তোনিয়ায়। দেশটির উত্তরের দিকের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি অপরূপ সুন্দর গ্রাম এই তুহালা। গ্রামটির চারিদিক গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ। এই অপার সৌন্দর্যের মাঝে আছে রহস্যঘেরা এক জঙ্গল। সেই জঙ্গলের মাঝেই আছে মানুষের তৈরি এক কূপ। যেটি সকলের কাছে ‘ডাইনি কূপ’ নামে পরিচিত। আর এই কূপের কারণেই  তুহালা এস্তোনিয়ার এক পরিচিত নাম।

ডাইনি কূপ এটি প্রায় তিন হাজার বছর আগের কথা, যখন গ্রামে চলছিল পানির সংকট। গ্রামের লোকেরা পানির উৎস খুঁজতে গিয়ে এই জায়গার সন্ধান পান। তারা পরীক্ষা করে দেখেন যে, এখানে পানি পাওয়ার সম্ভাবনা  রয়েছে। এরপর একটুখানি খুঁড়তেই পাওয়া গেল পানি। খুব বেশি আর খনন করার প্রয়োজন পড়েনি কূপটি। মাত্র আড়াই মিটার গভীরতা এই কূপের। কূপের উপরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে একটি কাঠের বালতি। প্রথম প্রথম বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই পানির চাহিদা মেটাচ্ছিল এই কূপ। একদিন গ্রামের একজন পানি নিতে এসে দেখেন, কূপটি থেকে আপনা আপনি পানি উপরে উঠে আসছে। এই দৃশ্য দেখে সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি। দৌড়ে চলে গেলেন গ্রামের সকলকে জানাতে। গ্রামবাসীদের কানে এই খবর পৌঁছতে খুব বেশি সময়ও লাগেনি। সঙ্গে সঙ্গেই সকলে চলে এলো মূল ঘটনা কী তা দেখতে। নিজের চোখে না দেখে তো আর বিশ্বাস করা যায় না। গ্রামের সকলে কুয়ার কাছে এসে বেশ অবাক হলো। সবাই দেখল ঘটনা সত্যি। আসলেই কুয়া থেকে উপচে পড়ছে পানি।

ডাইনি কূপ সবার মনে তখন একটাই প্রশ্ন, কী করে আসছে এত পানি? প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে জন্ম নিল ভয়ের এক লোকগাঁথা। এছাড়াও আরো অনেক মজার মজার ভাবনাও আছে এই কূপকে নিয়ে। অনেকে বলে যে, তারা রাতের বেলা এই কূপের উপর দিয়ে আগুনের গোলক উড়ে যেতে দেখেছে। আবার অনেকে মনে করেন, সৃষ্টিকর্তার এক অলৌকিক নিদর্শন এই কূপ। যা গ্রামের মধ্যে আশীর্বাদ বয়ে এনেছে।

আবার এমনটিও শোনা যায়, একবার বর্ষার মাঝামাঝি সময়, জ্যোৎস্না ঝরানো রাত। জঙ্গলের চারপাশ চাঁদের আলোর চাদর মুড়িয়ে নীরবে স্থির হয়ে আছে। এমন মনোহর পরিবেশই যেন খুঁজছিল এক ডাইনির দল। তারা নেমে এলো সেই জঙ্গলের মাঝে। কিছুটা ঘুরতেই চোখে পড়ে গেল একটি কূপ। কূপটি বেশ পছন্দ হয়ে গেল ডাইনিগুলোর। সেই কূপের পাদদেশে পৌঁছে গেল তারা। বিপুল আনন্দে মাথা ডুবিয়ে পানির মধ্যে তারা খেলা করতে লাগল। তবে তাদের এই আনন্দ খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ করেই তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিল। ফলে শুরু হলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ। একজন আরেকজনকে আক্রমণ করে বসল। ডাইনিদের এই যুদ্ধ যেন বন্ধই হতে চায় না! আর এই আক্রমণের তাণ্ডবেই পানি উঠে এলো কূপের উপরে। কূপের চারপাশ ভরে যেতে থাকল বাধ না মানা পানির স্রোতে।

ডাইনি কূপ এই গল্প পড়ে অনেকেই হয়তো অবাক হয়ে যেতে পারেন। তবে কূপটির পানির এ ধরনের কাণ্ড দেখে গ্রামের সাধারণ লোকেদের অন্য কিছু ভাবার অবস্থাই ছিল না। তাই তো এই কূপের নাম হয়ে গেল ডাইনি কূপ। আর তুহালাবাসীদের অনেকেই মনে প্রাণে বিশ্বাস করে লোকগাঁথাটি।

তবে নিজের চোখে এমনটা দেখলে এই লোককথার উপর বিশ্বাস জন্মানো অবাক করা কোনো ব্যাপার নয়। আমরা যখন কোনো কিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারি না, তখন শেষমেষ তা অলৌকিক হিসেবেই ধরে নেয়া হয়।

খুব শীঘ্রই এস্তোনিয়ার এই কুয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে সবদিকে। ফলে বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকেরা ভিড় করে এই কুয়ার পানির অবারিত ধারা দেখার জন্যে। তবে মজার ব্যাপার হলো, বছরের বারো মাসেই যে কুয়োর পানি বের হয়, তা কিন্তু নয়। মূলত শীতকাল আর বর্ষাকালে বের হয় এই কুয়োর পানি। তবে যখন পানি বের হয় তখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রীতিমতো পুকুরে পরিণত হয়ে যায় কুয়োর চারপাশ। এটি সেকেন্ডে ৫,০০০ লিটারের উপর পানি উদগিরন করে বলে ধারণা করা হয়। টানা এক থেকে তিন সপ্তাহের মতো এভাবে পানির প্রবাহ থাকতে পারে। কুয়োর উপরে রাখা বালতিটি অনেকটা ডাইনিদের খাঁচার মতো দেখায়।

ডাইনি কূপ এই ঘটনা নজর কাড়ে অনেক বিজ্ঞানীর। অনেক প্রত্নতত্ত্ববিদও আসেন এই কুয়োর সরেজমিন পরীক্ষায়। অনেক খোঁজাখুঁজি ও গবেষণা চালানো হয় এই কুয়োর পানির উৎস সন্ধানের উদ্দেশ্যে। তাদের মতে কুয়োর মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এর ভৌগোলিক গঠনে। বাল্টিক সাগরের উত্তরে অবস্থিত হওয়ায়  এস্তোনিয়ার চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে অনেকগুলো নদী। তেমনি তুহালা অঞ্চলের ভূগর্ভেও লুকিয়ে রয়েছে অনেকগুলো ছোট ছোট নদী। শীতকালে এসব অঞ্চলে প্রচুর তুষারপাত হয়। দিনের বেলায় রোদের প্রভাবে বরফ গলতে শুরু করে। এই বরফ গলা পানি ভূগর্ভস্থ নদীগুলোর মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে। ফলে ভূগর্ভস্থ এই সকল নদীর পানি অনেক বেড়ে যায়। আর এই কূপ যখন খনন করা হয়, তখন কোনোভাবে কোনো এক নদীর কোনো এক শাখার সঙ্গে কুয়োটি মিলে যায়। ফলে যখন নদীতে পানির স্রোত বৃদ্ধি পায়, তখনই পানি উপচে পড়ে কুয়ো থেকে। আর বর্ষাকালের ব্যাপারটি তো সহজেই বোঝা যায়।  

বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আড়ালে অনেক কিছুই আমাদের কাছে অলৌকিক বলে মনে হয়ে থাকে। তবে যখন বিজ্ঞানের ভাষায় এর সঠিক ব্যাখ্যা বের হয়ে আসে, তখন সকল অলৌকিক কর্মকান্ডের একটি বাস্তবিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়।

ডাইনি কূপ তবে অনেকের মনে আজও প্রশ্ন জাগে, এত বছর আগে এতো সূক্ষ্মভাবে কী করে মাটির নিচে থাকা নদীর কোনো প্রশাখার সঙ্গে মিল রেখে মাটির উপর দিয়ে এমন একটি কূপ খনন করা হয়েছিল? কি করেই বা নদীর একটি বহমান শাখার সঙ্গে কুয়োটির পাদদেশের মিলন ঘটেছিল? তবে কাকতালীয়ভাবেই হোক আর পরিকল্পনামাফিকই হোক, কোনো অলৌকিক কারণে যে এই পানি মাটির ভূগর্ভ থেকে উঠে আসছে না তা রীতিমত পরীক্ষিত।

ডাইনি কূপ এস্তোনিয়ার জন্য খুলে দিয়েছে এক অবারিত দ্বার। ২০১২ সালে এস্তোনিয়ানরা এই কুয়োকে তাদের শ্রেষ্ঠ বিস্ময় দাবি করেছে। ফলে এই কুয়োর প্রতি মানুষের আগ্রহ আরো বেড়ে চলেছে। তাই দেশ ও দেশের বাইরে থেকেও অনেকে দেখতে আসেন প্রকৃতির এই বিস্ময়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ/এস