Exim Bank
ঢাকা, বুধবার ২০ জুন, ২০১৮
Advertisement

রহস্যের মাঝে হারিয়ে যাওয়া প্লেন ছিনতাইকারী ড্যান কুপার

 তুনাজ্জিনা জাহান রেমি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:১৮, ১২ জুন ২০১৮

৩৮৪৯ বার পঠিত

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মানুষ নানা কারনে অপরাধ করে থাকে। এটি কারো জন্য পেশা তো কারো জন্য নেশা। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টন সমাজে সংস্কৃতি ও সমাজ কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান বৈপরিত্য ও দ্বন্দ্বের কথা বলেছেন। সমাজে সফলতা অর্জন করা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও বাস্তবে ততটা নয়। ফলে সমাজের অনুমোদিত নিয়মের বাইরে অনেকেই নানা অসমর্থিত আচরণের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করে থাকে। অপরাধী ধরা পড়ার পর তাকে নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা হয়। এর থেকে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে পড়ে নিজের নাম প্রচারের জন্য। যা তাদেরকে নিজের নাম গণমাধ্যমে বার বার প্রচার পেতে আগ্রহী করে তোলে। অনেক সময় আবার অন্যায় করার কৌশলে যখন অভিনবত্ব থাকে তখন তাও অনেককে আকৃষ্ট করে তোলে।

ফ্যান্টাসির প্রতি আমাদের সবারই এক ধরনের টান কাজ করে। এজন্যই ছোটবেলা থেকেই আমাদের কাছে সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, হ্যারি পটারের মত কাহিনীগুলোর উপর এক তীব্র আকর্ষণ থাকে। অনেক অপরাধীর অপরাধের কৌশলেও থাকে ফ্যান্টাসি যে কারণে অপরাধ করেও অনেকের মুগ্ধতা ও আকর্ষণ কেড়ে নিতে সক্ষম হয়। তেমনই একজন অপরাধী হচ্ছে ডিবি কুপার বা ড্যান কুপার। বলিউডের ‘ধুম-২’ সিনেমাটিতে শুরুতেই দেখা যায় নায়ক চুরি করার জন্য হেলিকপ্টার থেকে প্যারাসুট দিয়ে লাফিয়ে পড়ছেন ট্রেনের উপর। এই দৃশ্যটি ধারণ করার জন্য অবশ্যই সাহায্য নেয়া হয়েছিল নানা ধরনের ডিজিটাল প্রযুক্তির ও এ ব্যাপারে যারা দক্ষ তাদের কিন্তু এ সিনেমা মুক্তির আরও পঁয়ত্রিশ বছর আগে কারো কোন সাহায্য ছাড়াই অনেকটা এভাবেই দুই লাখ ডলার নিয়ে পালিয়ে যায় ড্যান কুপার বা ডিবি কুপার। তার এই রোমাঞ্চকর অপরাধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী চার বছরে অন্তত পনের জন এই দুঃসাহসী নিষিদ্ধ পন্থা অবলম্বন করেন। এই পনের জন ধরা পড়লেও, যার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা এই পথ বেছে নেন তার কোন হদিস কখনোই পাওয়া যায়নি।



১৯৭১ সালে ড্যান কুপার (মিডিয়াতে প্রচার করা হয় ডিবি কুপার নামে) নামে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। আমেরিকায় তাকে বলা হয় চোরদের মহারাজ। সাদা শার্ট, কালো টাই আর বিজনেস স্যুট পরিহিত মধ্য চল্লিশ এর একজন লোক নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইন্সের পোর্টল্যান্ড কাউন্টার (ওরেগন স্টেট) থেকে একটি ওয়ান–ওয়ে টিকিট কেটেছিলেন ওয়াশিংটন যাবার জন্য। তাকে দেখে একজন বিজনেস এক্সিকিউটিভ মনে হচ্ছিলো। লোকটি টিকিটে নিজের পরিচয় নিবন্ধন করেছিলেন ড্যান কুপার নামে। ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর বোয়িং-৭২৭ বিমানটি যাত্রীসহ উড্ডয়ন করে, যার একজন ছিলেন ড্যান কুপার। প্লেনটি যখন পোর্টল্যান্ড ও সিয়টলের মধ্য আকাশে অবস্থান করছে তখন ফ্লোরেন্স স্ক্যাফনার নামে একজন কেবিন ক্রুর হাতে একটি নোট দেন তিনি। স্ক্যাফনার ব্যাপারটা পাত্তা না দিয়ে কাগজটা নিজের পার্সের মধ্যে রেখে দেন। এমন সময় কুপার তাকে ফিসফিস করে বলেন , “Miss, you’d better look at that note. I have a bomb.” । মিস স্ক্যাফনার কে বেশ অবাক করে দিয়ে কুপার তাঁর এটাচি কেস খুললেন এবং বোমা সদৃশ কিছু একটা দেখালেন।
মিস্টার কুপার নিশ্চয়তা দেন যে, যদি তার সব দাবি দাওয়া মেনে নেয়া হয় তবে কোন যাত্রীকে কোন প্রকার ক্ষতি করা হবেনা এবং প্রত্যেককেই অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেয়া হবে। প্লেনের ক্যাপ্টেনের উদ্দেশ্যে কয়েকটা দাবি লিখে তিনি একটি নোট পাঠালেন। যার মধ্যে তিনি ২,০০,০০০ ইউএস ডলার এবং ৪টা প্যারাসুট (প্রাইমারী ২টি, রিজার্ভ ২টি) দাবী করেন যাত্রীদের মুক্তির জন্য। একই সাথে তিনি সিয়াটল এয়ারপোর্টে একটি ফুয়েল ট্রাক রাখতে বললেন যেন প্লেনটা রিফুয়েল করা যায়। পাইলট উইলিয়াম স্কট দ্রুতগতিতে কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন এবং প্লেন হাইজ্যাকিং ও মুক্তিপণের ব্যাপারটি এয়ার রুম কন্ট্রোলারদের নিশ্চিত করেন।

নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড নাইরুপ তৎক্ষণাৎ রাজী হন ২,০০,০০০ ইউএস ডলার যাত্রীদের মুক্তিপন হিসাবে দিতে। তবে এই ছিনতাইকারীকে যেন সহজেই পরবর্তীতে খুঁজে পাওয়া যায় সেজন্য ২০০,০০০ ইউএস ডলার সংগ্রহ করে দেয় এফবিআই, সিয়াটলের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে। কুপারের কথামত সেখানে ২০ ডলারের ১০,০০০টা নোট ছিলো। ট্র্যাক করার ব্যাপারটি মাথায় রেখে এফবিআই যে নোটগুলোর ব্যবস্থা করে সেগুলার সিরিয়াল নাম্বারের শুরু ছিল “L” দিয়ে এবং বেশিরভাগই 1963A এবং 1969 সিরিজের নোট ছিল ।
প্লেন সিয়াটলে ল্যান্ড করার পর কুপার শুধুমাত্র ৩৬ জন যাত্রীকে মুক্তি দেন ২০০,০০০ ডলার এবং চারটি প্যারাসুটের বিনিময়ে। যাত্রীদের সিয়াটল এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে কুপারের কথামত প্লেন উড়ে চলে মেক্সিকো সিটির উদ্দেশ্যে। সিয়াটল এবং রেনোর মাঝামাঝি কোন একটা জায়গায় রাত ৮ টার কয়েক মিনিট পরেই প্লেনের পেছন সাইড থেকে একটা প্যারাসুট এবং মুক্তিপণের টাকা নিয়ে লাফ দেন ড্যান কুপার। লাফ দেয়ার আগে তিনি তাঁর কালো টাই প্লেনে খুলে রাখেন। পরেরদিনই ড্যান কুপার যে স্থানে লাফ দিয়েছিল সেখানে মিলিটারি হেলিকপ্টার নিয়ে তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালায়। পায়ে হেঁটেও খোঁজ করা হয় এলাকাটি সহ আশে পাশের সর্বত্র, কোন প্রমাণ পাওয়ার আশায় কিন্তু কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি ড্যান কুপারের, প্যারাসুটের, টাকার বা কোন কিছুরই। এমনকি তার কোন পায়ের ছাপও পাওয়া যায়নি। প্লেন থেকে লাফ দিয়ে রীতিমত যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।



প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী তার চেহারার একটি স্কেচ বানানো হয়। তদন্তকারীরা তাদের পূর্বের রেকর্ড এর কারো সাথেই মিল পায়নি এই স্কেচের। যার ফলে ড্যানের কোন পূর্ব সংগঠিত অপরাধের ব্যাপারেও এরা জানতে পারেনি। পরবর্তী পাঁচ বছরে প্রায় চারশ জনকে আটক করা হয় ড্যান কুপার সন্দেহে কিন্তু একে একে সকলকেই ছেড়ে দিতে হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী কারো সাথেই মিল পায়নি এফবিআই। ড্যান কুপারের ছবির স্কেচ এবং মুক্তিপণের টাকার সিরিয়াল নাম্বার জনগণের কাছে উন্মোচিত করে দেয়া হয় যাতে কেউ কোন খোঁজ পেলে তাৎক্ষনিকভাবে এফবিআই কে জানায়। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে কেউ কোন তথ্য দিতে পারলে তার জন্য বড় রকমের পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়।

১৯৭৯ সাল পর্যন্ত অনেকেই এর আগের বা পরের সিরিয়ালের অনেক নোট দেখাতে পারলেও ঠিক ঐ সিরিয়ালের নোটগুলো দেখাতে ব্যর্থ হয়। ১৯৮০ সালে, ঘটনার ঠিক নয় বছর পর পোর্টল্যান্ড এর উত্তরে কলম্বিয়া নদীর তীরে ব্রায়ান ইনগ্রাম নামে একটি বাচ্চা ছেলে খেলতে খেলতে বালুতে গর্ত খুঁড়তে গিয়ে বালুর তিন ইঞ্চি নীচে বিশ ডলারের তিনটি বান্ডেল খুঁজে পায়। সেখানে পাঁচ হাজার আটশ ডলারের নোট পাওয়া যায়, যার সবগুলোই কুপারের সিরিয়ালের সাথে ম্যাচ করে। নয় বছর পর এই প্রথম এফবিআই এই কেসের ব্যাপারে কোন প্রমাণ পায়। এতগুলো বান্ডেল থেকে কিভাবে ৩টা আলাদা হলো এবং কেনই বা সেগুলা ঘটনাস্থলের ২০ মাইল দূরে একটা নদীর ধারে বালির নীচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। অনেকেরই ধারনা কুপার প্লেন থেকে লাফ দেয়ার সময় মারা গিয়েছে কিন্তু অভিজ্ঞদের মতে কুপারের যদি পূর্বে ছয়/সাত বারের ডাইভিং এর অভিজ্ঞতা থেকে থাকে তাহলে তার মারা যাওয়ার কথা না। আর যদি মারা গিয়েই থাকে তবে তা আরেকটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয় যে ডলারগুলো তাহলে এখানে আসলো কিভাবে? ঐ গহীন অরন্যে সাধারণ মানুষের আনাগোনা নেই যে সাধারণ মানুষ কেউ পেয়ে লুকিয়ে রাখবে। অথবা এই ছিনতাইয়ে ড্যান কুপারের সাথে আর কেউ জড়িত ছিল কিনা তাও কখনো জানা যায়নি।


বালুর নীচে পাওয়া টাকা

১৯৭১ সালে এই ঘটনার পর আরও পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে যায়। তবে এত বছর ধরেও হাল ছাড়েননি এফবিআই গোয়েন্দারা৷ আমেরিকার পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটল তন্ন তন্ন করে খুঁজে, কাগজে বিজ্ঞাপণ দিয়ে, ছবি ছাপিয়েও তারা নাগাল পায়নি ড্যান কুপারের৷ এমনকি পয়তাল্লিশ বছর পর বয়স্ক কুপার দেখতে কেমন হবে তা ভেবেও একটি স্কেচ বানানো হয় কিন্তু তাও এ রহস্যের কোন মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন গোয়েন্দাদের নাকের ডগা দিয়ে যেন বেমালুম উধাও হয়ে যায় ড্যান কুপার৷ যত ভাবে পারা যায়, তারা খুঁজেছে সেই চোরকে৷ শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ৪৫ বছর পরে হাল ছেড়ে দেয়। এফবি আই বুঝতে পারে আর চেষ্টা করে লাভ নেই৷ কোন তথ্যের অভাবে শেষ পর্যন্ত এই কেসটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে কেস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গভীর উত্তর-পশ্চিম পর্বতে একটি পুরাতন নোংরা হওয়া প্যারাসুটের মত কিছু একটা পাওয়া গিয়েছিল। অনেকেই ভাবেন সেটি হয়তোবা কুপারের ছিল কিন্তু এ থেকে কোন আক্ষরিক মীমাংসায় আসা যায়না।

পৃথিবী থেকে যেন উবে গেছে ড্যান কুপার৷ শেষ পর্যন্ত হার স্বীকার করে নেয় মার্কিন গোয়েন্দা ও মার্কিন সেনারা৷ আফগানিস্থানের ছোট্ট এলাকা থেকে লাদেনকে খুঁজে বের করতে পারে এই মার্কিন গোয়েন্দা ও সেনা৷ ইরাকের অজ্ঞাতস্থান থেকে খুঁজে বের করতে পারে লুকিয়ে থাকা সাদ্দাম হোসেনকে কিন্তু নিজের দেশ থেকে এক বিমান ছিনতাইকারী ও চোরকে খুঁজে বের করতে পারেননি তারা৷ ৮ জুলাই, ২০১৬ এফবিআই কুপার রহস্যের কোন সমাধান না দিয়ে, কেসটা ক্লোজ করে দেয়। ৪৫ বছর ধরে ৬০ ভলিউমে লেখা কেস ফাইল ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে ওয়াশিংটনে এফবিআই হেডকোয়াটার্সে রাখা আছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

সর্বাধিক পঠিত