রহস্যময় এই নদী মানুষের জীবন নিয়েই অতৃপ্ত ক্ষুধা মেটায়!

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৪ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ৩০ ১৪২৭,   ২২ জ্বিলকদ ১৪৪১

Beximco LPG Gas

রহস্যময় এই নদী মানুষের জীবন নিয়েই অতৃপ্ত ক্ষুধা মেটায়!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৩১ ২ জুন ২০২০  

ছবি: বোল্টন স্ট্রিড

ছবি: বোল্টন স্ট্রিড

রূপকথার মতো এক ঝর্ণা। বয়ে চলেছে উত্তর ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের বারডেন টাওয়ারের ওয়ার্ফ নদীর পাশেই। ধারণা করা হয়, এই ঝর্ণা যেদিক দিয়ে বয়ে চলেছে সেটিই প্রকৃতির সবচেয়ে বিপজ্জনক খাদগুলোর একটি। 

পাথর আর সবুজে ঘেরা এই অনিন্দ্য সুন্দর ঝর্ণা পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে। ১০০ গজের কম লম্বা আর ৩০ ফুটের মতো জায়গা জুড়ে বয়ে চলা এই ঝর্ণা বোল্টন স্ট্রিড নামেই পরিচিত। স্ট্রিড নামটি স্ট্রাইড শব্দটি থেকে এসেছে। এটি ওয়ার্ফ নদীর এক অংশ। 

বিপজ্জনক এক স্রোতবাহী ঝর্ণানামটির উৎপত্তি প্রাচীন ইংরেজি শব্দ ওয়েওরফ থেকে। যা উইন্ডিং রিভার হিসেবেও পরিচিত। এর গভীরতা কাছে থেকে দেখেও আন্দাজ করা সম্ভব নয়। জনশ্রুতি আছে, এখানে কোনো মানুষ পড়ে গেলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এর দুই ধার এতোটাই কাছে যে দেখলে মনে হবে এক লাফেই পাড় হয়ে যেতে পারবে যে কেউ। আর পানি বোধহয় হাঁটু সমান।   

কুলকুল করে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানি যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। অনেকেই এই মুগ্ধতার ফাঁদে পা দিয়েছেন। আর হারিয়েছেন প্রাণটা। দুই পাড় কাছে মনে হওয়ায় পাড় হতে গিয়ে অতীতে পা পিছলে পানিতে পড়ে যায় অনেকেই। গভীরতা আন্দাজ করতে পারা যায় না। খুব তাড়াতাড়িই অলিয়ে যায় পানির নিচে। এর চারপাশে অনেক গুহা রয়েছে। যেগুলো এই ঝর্ণার সঙ্গে টানেলের মাধ্যমে যুক্ত।   

মরণের ফাঁদ পেতে রেখেছে খাদটি১১৪৪ সালে পাহাড়ে শিকারে গিয়েছিলেন উইলিয়াম ডি রোমিলি। তখন স্ট্রিড পেরোনোর চেষ্টা করতে গিয়ে পিছলে পরে যান তিনি। সেখানেই মারা যান বলে ধরে নিয়েছেন সবাই। কারণ আজ পর্যন্ত তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার মৃতদেহও না। উইলিয়ামের মা অ্যালিস ডি রোমিলি ছেলের শোকে বোল্টনের আশেপাশে তার যা সম্পত্তি ছিল সবই দান করে দেন আগস্টিনিয়ান ভিক্ষুদের একটি সম্প্রদায়ের কাছে। 

যাতে তারা তার ছেলের আত্মার জন্য প্রার্থনা করতে পারে। সেই সন্ন্যাসীরাই প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন বিখ্যাত বোল্টন স্ট্রিডকে। উইলিয়াম ডি রোমিলির মৃত্যুর কয়েকশ বছর পরে কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার প্রিয় কবিতা দ্য ফোর্স অব প্রেয়ার এ তরুণ ছেলের মর্মান্তিক মৃত্যুর গল্প বলেছিলেন। 

সৌন্দর্যপিপাসুরা স্থানটি খুবই পছন্দ করেন২০ শতাব্দীতে বোল্টন স্ট্রিড প্রমাণ করেছে, সে ক্ষুধার্ত। মানুষের জীবন নিয়েই সে তার অতৃপ্ত ক্ষুধা মেটায়। ১৯৯৮ সালে ব্যারি এবং লিন কোলেট মানে এক দম্পতি হানিমুনে এসেছিলেন বোল্টন স্ট্রিডে। হানিমুনের দ্বিতীয় দিনে তারা স্ট্রিডের পাশ দিয়েই হাঁটছিলেন। আগের রাতে ভারী বৃষ্টি হওয়ায় স্ট্রিডের পানির স্তর এক মিনিটেরও কম সময়ে পাঁচ ফুট বেড়ে গিয়েছিল। তারা আর সেখান থেকে ফেরেননি। 

এর ছয় দিন পরে ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারে পাওয়া গিয়েছিল  লিনের মৃতদেহ। তবে ব্যারির দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। যদিও এক মাসেরও বেশি সময় ১০ মাইল পর্যন্ত ব্যারিকে খোঁজা হয়েছিল। ডেসমন্ড টমাস নামের এক ব্যক্তি দাবি করেছিলেন যে তিনি স্ট্রিডে একজনের মুখ পানির উপরে উঠতে দেখেছেন। তবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা অদৃশ্য হয়ে যায়।   

এই নদীতে যারা পড়েছেন তারাই মৃত্যুবরণ করেছেন ২০১০ সালের মার্চ মাসে স্ট্রিডে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সে দিন ছিল আট বছর বয়সী অ্যারন পেজের জন্মদিন। স্ট্রিডে পাথরের উপর খেলতে গিয়ে পিছলে পড়ে ডুবে যায় সে। এক পুলিশ অফিসার তল্লাশি করতে নেমেছিলে পানিতে। তিন ঘণ্টা ধরে খোঁজাখুঁজি চালানোর পরও পাওয়া যায়নি অ্যারনকে। তিনি জানিয়েছিলেন, উপরে স্বচ্ছ পানি থাকলেও এর নিচের পানি ঘোলা। যে কারণে কিছুই দেখা যায় না। আর গভীরতা বোঝাও সম্ভব হয়নি। 

১৮৯৬ সালে দ্য স্ট্রাইডিং প্লেস নামে একটি ছোট গল্প লেখেন জের্ত্রুড অ্যাথার্টন। এছাড়াও নানা গল্প, উপন্যাস, নাটকে উঠে এসেছে এই সুন্দর সেই সঙ্গে বিপজ্জনক স্ট্রিডের কথা। গ্রেশাম কলেজের পরিবেশ গবেষণার প্রফেসর ক্যারলিন রবার্টসের মতে, বোল্টন স্ট্রিড একমাত্র নদী। যেটি অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধতা ছড়িয়ে চলেছে এবং সেই সঙ্গে অন্যন্ত ভয়ঙ্কর লোভী। অনেকে আবার একে ভুতুড়ে, কেউ আবার রাক্ষসীও বলেছেন। 

সূত্র: গ্রেভইয়ার্ডশিফট, অ্যামিউজিংপ্ল্যানেট

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস