রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই পাঁচ সন্তানসহ সর্বশান্ত হয় দম্পতি!

ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০১ অক্টোবর ২০২০,   আশ্বিন ১৭ ১৪২৭,   ১৪ সফর ১৪৪২

রহস্যময় অগ্নিকাণ্ডে মুহূর্তেই পাঁচ সন্তানসহ সর্বশান্ত হয় দম্পতি!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:০৯ ৯ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৫:২২ ৯ জুলাই ২০২০

ছবি: অগ্নিকাণ্ডের সময় রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যায় এই পাঁচ সন্তান

ছবি: অগ্নিকাণ্ডের সময় রহস্যময়ভাবে হারিয়ে যায় এই পাঁচ সন্তান

খবরের কাগজে কিংবা টেলিভিশনে প্রতিনিয়তই আমরা ঘরে আগুন লাগার সংবাদ দেখতে পাই। বিভিন্ন কারণে ঘরে আগুন লেগে প্রাণ যায় শত শত মানুষের। সব হারিয়ে সর্বশান্ত হন অনেকেই। এমন অনেক ঘটনা হরহামেশাই ঘটে থাকে। 

১৯৪৫ সালে ক্রিসমাসের ঠিক আগের দিন রাতে জর্জ ও জেনি সোড্ডার দম্পতির জীবনে ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মাঝ রাতের দিকে এক ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয় তাদের বাসায়। এসময় বাড়িতে তাদের দুজনের সঙ্গে ১০ সন্তানও ছিল। সোড্ডারের ১০ সন্তানের মধ্যে চারজন বেঁচে যায়। 

আগুন লাগার আগেই বাকিরা রহস্যজনকভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কারণ আগুন নিভে যাওয়ার পর তাদের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি কেউ। আগুন লাগার কিছুদিন আগে তাদের এক সন্তান যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। আর বাকি পাঁচ জনকে পাওয়া যায়নি।  

পশ্চিম ভার্জিনিয়ার ফেয়েটভিলের ছোট্ট কয়লা খনির শহর। এটি ছিল সমৃদ্ধিশালী ইতালিয়ান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বাসভবন। ১৯০৮ সালে সার্ডিনিয়া থেকে জর্জ সোড্ডার এখানে চলে আসেন। এরপর থেকে এখানেই তারা বসবাস করতে থাকেন। সোড্ডার মূলত এক সময় সোড্ডু ছিল।

এখানকার সম্প্রদায়ের লোকেরা সোড্ডারকে একটি শ্রদ্ধেয় ও উন্নত পরিবার হিসাবে জানত। জর্জ সোড্ডার এই অঞ্চলে এসে ট্রাকের ব্যবসায় নামেন। ৫০ বছর বয়সী সোড্ডার তখন এই ব্যবসার মালিক। বেশ সম্ভ্রান্ত এবং ধনী পরিবার ছিল জর্জ সোড্ডারদের। জর্জ তার স্ত্রী জেনি এবং তার ১০ সন্তান নিয়ে এখানে বসবাস করতেন। 

১৯৪৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সবে মাত্র শেষ হয়েছে। এর মাত্র আট মাস আগে কমিউনিস্ট পক্ষপন্থীরা ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসক বেনিটো মুসোলিনিকে হত্যা করে। যা তখন ইতালীয়দের বিভক্ত করে ফেলে। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন মুসোলিনি সমর্থকরা। 

আচমকাই আগুন লাগে তাদের বাড়িতেজর্জ রাজনৈতিকভাবে স্পষ্টবাদী ছিলেন এবং মুসোলিনি সম্পর্কে দৃঢ় বিরোধী মতামত রাখেন। এর ফলে ইতালীয় অভিবাসীদের মধ্যে যারা মুসোলিনি সমর্থক ছিলেন জর্জের বিপক্ষে চলে যায়। যেদিন জর্জের বাড়িতে আগুন লাগে তার আগে তাদের সঙ্গে বেশ কিছু অদ্ভূত ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনা জর্জ আর তার স্ত্রী পুলিশকে জানিয়েছিল। 

যেমন- একদিন এক লোক জর্জের বাড়িতে কাজের সন্ধানে আসে। জর্জ তাকে কোনো কাজ নেই বলে জানান এবং চলে যেতে বলেন। লোকটি ঘরের বাইরে থাকা ফিউজ বক্সের দিকে তাকিয়ে বলল, এর ফলে কোনো একদিন বাড়িতে দিন আগুন লাগবে। জর্জের কাছে মনে হলো লোকটির বোধ হয় মানসিক সমস্যা আছে। কেননা সম্প্রতি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থার লোকেরা তাদের বাড়ির বৈদ্যুতিক তারগুলো পরীক্ষা করে 

আগুন লাগার কয়েক সপ্তাহ আগে সোড্ডার বাড়িতে আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। এক স্থানীয় বিক্রয়কর্মী তাদের কাছে জীবন বীমা বিক্রির চেষ্টা করেছিলেন। জর্জের প্রত্যাখ্যান করার পরে, হতাশ বিক্রয়কর্মী তাকে হুমকি দিয়েছিল, ঘর ধোঁয়ায় ভরে যাবে এবং আপনার সন্তানরা ধ্বংস হবে। মুসোলিনি সম্পর্কে আপনি যে নোংরা মন্তব্য করেছেন তার জন্য আপনাকে মূল্য দিতে হবে। 

বড়দিনের ঠিক আগে, জর্জের বড় ছেলে একটি গাড়ি তাদের বাড়ির সামনে প্রায়ই পার্কিং করা দেখত। গাড়ির ভিতরে থাকা এক ব্যক্তি তাদের স্কুলে যাওয়া আসার সময় লক্ষ্য রাখত। একথা জর্জের ছেলে তাকে কয়েকবারই বলেছে। তবে জর্জ তেমন পাত্তা দেয়নি এতে। সে ভেবেছিল কোনো কারণে হয়তো আশেপাশের কারো গাড়ি তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় পার্ক করেছে। 

ঘটনার রাতটি ছিল ক্রিসমাসের আগের রাত। সে রাতে বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছিল। জেনি এবং জর্জ রাত সাড়ে ১০টা বাজতেই তাদের তিন বছর বয়সী মেয়ে সিলভিয়াকে নিয়ে ঘুমাতে যায়। এদিকে তাদের বড় মেয়ে মেরিয়ন তার ভাইবোনের জন্য ক্রিসমাসে উপহার দেয়ার জন্য কিছু খেলনা কিনে এনেছিল। তখন সেগুলোই তাদের দিচ্ছিলো। যেহেতু বাচ্চারা নতুন খেলনা নিয়ে খেলছিল তাই জেনি আর তাদের কিছু বলেনি। শুধু তার ছেলেদের মুরগির খাঁচা বন্ধ করতে আর গরুর খাবার দেয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে ঘুমাতে চলে যান। 

এই পাঁচ সন্তানকে আর কখনো পাওয়া যায়নিপ্রায় মধ্যরাতের দিকে, একটি ফোন কলে জেনির ঘুম ভাঙে। তিনি শুনতে পান ওপাশ থেকে একজন নারী কথা বলছেন। তিনি অন্য কাউকে খুঁজছিলেন। জেনি জানায় তিনি ভুল নম্বরে ফোন করেছেন। একথা শুনেই ওই নারী অদ্ভূত এক হাসি হাসেন। মনে হচ্ছিল তার আশেপাশে আরো কেউ আছে। যারাও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসছে। 

তবে এসব নিয়ে জেনি তেমন কিছু ভাবেননি। ফোন রেখে আবার ঘুমাতে চলে যান। এর আধা ঘন্টা পর জেনির আবার ঘুম ভাঙে। তিনি দেখেন ঘর বেশ শান্ত। মেরিয়ন সোফায় ঘুমিয়ে ছিল। জেনি লক্ষ্য করল, দরজাগুলো তালাবদ্ধ ছিল তা এখন খোলা এবং পর্দাও দেয়া হয়নি। তিনি ভাবলেন বাচ্চারা তো কখনো দরজা লাগাতে ভুলে যায় না। তবে আজ হয়তো দরজা বন্ধ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। 

জেনি জানালা দরজার কপাটগুলো লাগিয়ে পর্দাগুলো টেনে দিয়ে আবার ঘুমাতে চলে যায়। এর প্রায় আধা ঘন্টা পর জেনি জেগে উঠল, আর তার মনে হলো রাবারের বলের মতো কিছু যেন তাদের ছাদে এসে পড়ছে। এরপর সেগুলো মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। এতেও খুব একটা মনোযোগ দেয়নি জেনি। আবারো ঘুমিয়ে পড়ে জেনি। যা ছিল তার জন্য জীবনের সব থেকে বড় ভুল। 

এর আধা ঘণ্টার মধ্যেই তাদের বাড়ি পুরোটা ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধে ভরে যায়। কোনো রকমে জেনি আর জর্জ তাদের বাচ্চাদের ঘরের দিকে যায়। তবে সেখানে কাউকেই খুঁজে পয়ানি তারা। শুধু জর্জ, জেনি, আর মেরিয়ন, জন, জর্জ জুনিয়র, সিলভিয়া বেরিয়ে এলেন। জেনি আর জর্জ তাদের অন্য বাচ্চাদের নাম ধরে চিৎকার করতে থাকে। তবে তাদের কোনো সাড়া শব্দই পাননি তারা। জেনি সেই ভয়াবহ এবং তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া দুর্বিষহ রাতের কথা ব্যাখ্যা করেছিলেন। 

তিনি বলেন, ধোঁয়া দেখেই তিনি সিঁড়ির নিচে তার ছেলেদের ঘরে যান। সেখানে দেখতে পান জন আর জর্জ জুনিয়র বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তখন তাদের চুলে আগুন ধরে গেছে। তারাও চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। জর্জ তার বাচ্চাদের বাঁচাতে বাড়ির পেছনের দিকে যায়। সেখানে একটি সিঁড়ি আছে যেটা দিয়ে তারা বাড়ির ছাদে ওঠে। তবে সেখানে তারা সিঁড়িটি খুঁজে পায়নি। পরের দিন তারা সিঁড়িটি দেখে, তাদের কয়েক বাড়ি পরে রাস্তার পাশের খাঁদে পড়েছিল।  

সন্তানদের নামে স্মতিসৌধ গড়েন জর্জএদিকে মেরিয়ন ফায়ার বিভাগে কল করার চেষ্টা করেছিল। তবে তাদের ফোনটি ছিল অকেজো। কল করার জন্য তাকে এক প্রতিবেশীর বাড়িতে ছুটে যেতে হয়েছিল। সেখানে গিয়েও কোনো অপারেটর পাওয়া যায়নি। অবশেষে শহরের একটি ফোন থেকে ফায়ার স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মেরিয়ন। ততক্ষণে তাদের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে পুরো বাড়ি পুড়ে যায়।   

জর্জ তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আঙ্গিনায় রাখা ট্রাক দুটি বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি যখন ট্রাকের ইঞ্জিন চালু করতে যান দেখেন সেগুলো নষ্ট। একটি ট্রাকও রক্ষা করতে পারেননি জর্জ। বাড়ির সঙ্গে ট্রাক দুটিও পুড়ে যায়। সকাল ৭ টার দিকে দমকলকর্মীরা উপস্থিত হয়। ততক্ষণে যা অবশিষ্ট ছিল তা সবই গরম ছাইয়ের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বেলা ১১ টা পর্যন্ত অন্য বাচ্চাদের সেখানে খোঁজা হয়। তবে কারোরই কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি।  

রাজ্য পুলিশ মনে করেছিল, ত্রুটিযুক্ত ওয়্যারিংয়ের কারণে আগুন লেগেছে। তবে পরে তারা তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেয়। তারপরে ফায়েটভিলি ফায়ার চিফ এফজে মরিস পুরো তদন্ত করেছিলেন, তিনি ত্রুটিযুক্ত কোনো তার কিংবা কোনো মৃতদেহের প্রমাণ পাননি। মৃতদেহ সংগ্রহের জন্য পরের দিন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে চার্লস পেইন সাইটে যান। তবে মৃতদেহের কোনো আলামতই তারা পাননি। 

অগ্নিসংযোগের বেশ কয়েক দিন পরে, একটি জুরিবোর্ড সেখানে অনুসন্ধানে আসে। জর্জ লক্ষ্য করেন, তাদের মধ্যে একজনকে তার বেশ চেনা চেনা লাগছে। পড়ে তিনি মনে করতে পারেন এই লোককে তিনি কোথায় দেখেছেন। একদিন তার বাড়িতে বীমা করাতে এসে এক লোক তাকে বলেছিলে তার বাড়ি পুড়ে যাবে। তার সন্তানরা ধ্বংস হয়ে যাবে। এই লোকই সেই লোক। 

অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, জুরিও রায় দিয়েছে যে ত্রুটিযুক্ত ওয়্যারিংয়ের ফলে আগুন লেগেছে। তবে সোড্ডাররা তাতে রাজি হননি। এটি তাদের কাছে ঘটেছিল যে তারা যখন তাদের বাড়িতে আগুন লাগে তখনো বাড়ির ভেতর আলো জ্বলছিল। জেনি পরে মন্তব্য করেছিলেন যে, তারা লাইট জ্বালানো ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এরপরেও জর্জ একটি নতুন বৈদ্যুতিক চুলা লাগিয়েছিল। তাহলে বৈদ্যুতিক তারের জন্য যদি বাড়িতে আগুন লাগবে তাহলে এখনো কেন তার ভালো আছে। 

সন্তানদের ফিরে পেতে এই দম্পতি অনেক চেষ্টা করেছেনজুরির দেয়া রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি তারা। জর্জ আর জেনি দম্পতির যে পাঁচ সন্তানকে পাওয়া যায়নি। তারা হলো ১৪ বছরের মরিস, ১২ বছরের মার্থা, ৯ বছরের লুই, ৮ বছরের জেনি এবং ৫ বছরের বেট্টি। আর ২১ বছরের জোসেফ আগেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। তার খোঁজও মেলেনি আর কোনোদিন। এই আগুনের ঘটনার বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়। 

এদের মধ্যে একজন টেলিফোন মেরামতকারী তাদের জানিয়েছিলেন, যে কেউ ফোন লাইন কেটে দিয়েছেন। মারিয়নের ফোন না করতে পারাটা বিদ্যুতের কারণে নয়। লাইন কাটা ছিল তাই। অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রতিবেশীরা এক ব্যক্তিকে সোড্ডারের বাড়ির ভেতর চুরি করতে দেখেছিল। পরে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে এবং সে স্বীকার করে যে সে উপরে উঠে তারগুলো কেটেছিল। লোকটি বলে, সে ভেবেছিল সে বৈদ্যুতিক তারগুলো ছিঁড়ে ফেলেছে। তবে ভুল করে ফোনের তারগুলো কেটেছিলেন। 

এরপর কী ঘটেছিল বা পুলিশ কেন এর আর কোনো অনুসন্ধান করেনি তা কেউ জানে না।আরো একজন প্রত্যক্ষদর্শী, বাস চালক যিনি রাতের শিফটে কাজ করে ফিরছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আগুনের বল ছাদে ছুঁড়তে দেখেছেন। তারপরে অনেক সাক্ষীরা বলেছিল যে তারা সোড্ডার বাচ্চাদের দেখেছিল। একটি মেয়ে দাবী করে, সে এই বাচ্চাদের একটি গাড়িতে দেখেছিল। যেটি আগুনের সূত্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে চলে যায়। 

ফয়েটভিলের বাইরে প্রায় ৫০ মাইল দূরে মোটেলে কাজ করা একজন ব্যক্তি দাবি করেছিলেন, আগুন লাগার পরদিন তিনি বাচ্চাদের দেখেছেন। চার্লসটন হোটেলে এক নারী দুইজন নারী এবং ইতালিয়ান দুই পুরুষের সঙ্গে এই বাচ্চাদের চেক-ইন করতে দেখেছেন। তিনি বলেন, তারা বাচ্চাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন। তবে পুরুষ দুজন তাকে বাঁধা দিয়েছিল।    

একজন মিশনারি কাগজে বাচ্চাদের ছবি দেখে দাবি করেছিলেন যে, তিনি ফ্লোরিডার কর্টেজের একটি বাড়িতে বাচ্চাদের দেখেছেন। এই ঘটনার তদন্তকারী এক গোয়েন্দা জানায়, তারা সেই কর্টেজে গিয়েছিল তবে সেখানে তারা কাউকে পাননি। আলাদা আলাদাভাবে পাঁচজন এই কর্টেজে বাচ্চাদের দেখেছেন বলে দাবি করেন। এর কয়েকদিন পর জেনি পত্রিকায় আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের কথা পরছিলেন। সেখানে পরিবারের সাত সদস্যের মৃতদেহ পাওয়া যায়। জেনি শ্মশানে গিয়ে খোঁজ করেছিলেন। এগুলো তার সন্তানের কিনা। যদিও তিনি মন থেকে বিশ্বাস করতেন তিনি তার হারানো বাচ্চাদের খুঁজে পাবেন। 

জর্জ এবং জেনি সিসি টিন্সলে নামে একটি প্রাইভেট তদন্তকারী নিয়োগ করেছিলেন। যে সোড্ডার বাচ্চাদের খোঁজ করতে সহায়তা করতে পারে। তিনি শুনেছেন, ফায়ার চিফ মরিস কিছু লোককে বলেছিলেন যে তিনি ঘটনাস্থলে একটি হার্ট খুঁজে পেয়েছিলেন এবং ডায়নামাইট বাক্সে কবর দিয়েছেন। গোয়েন্দা মরিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং চিফকে তাকে এবং জর্জকে এটি দেখানোর জন্য রাজি করায়। একসঙ্গে তারা সাইটে গিয়ে খনন করে। 

সিলভিয়া সোড্ডারটিন্সলে এই অঙ্গটি একজন ফরেনসিক বিভাগের পরিচালকের কাছে নিয়ে যান। তিনি জানান, এটি গরুর লিভারের একটি অংশ। জর্জও পরীক্ষার জন্য লিভারকে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। তারাও জানান, এটি গরুর লিভার। তবে সন্দেহের বিষয় অঙ্গটি পুরোপুরি আগুনে পুড়েনি। যা ইঙ্গিত দেয় যে, মরিস এটি পরে সেখানে রেখেছিল। গুজব প্রচারিত হয়েছিল যে মরিস কয়েক জন লোকের কাছে স্বীকার করেছেন যে তিনি সোড্ডারদের প্রশান্ত করতে এবং তদন্ত বন্ধ করার জন্য তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এই অঙ্গটি রেখে এসেছিলেন। কর্তৃপক্ষ তাদের বিশ্বাস করাতে চেয়েছিল যে শিশুরা আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল।

ঘটনার তিন মাস পর সোড্ডার পরিবার তাদের বাড়িতে ফিরে যায়। সিল্ভিয়া বাড়ির আঙ্গিনায় খেলার সময় সবুজ রঙের একটি খোসা খুঁজে পায়। সেটি জর্জ সামরিক লোকেদের দেখিয়েছিল। তারা বলেন এটি আনারসের আকারের সাধারণত নেপালাম বোমা। ১৯৪৯ সালে, জর্জ এবং জেনি ওয়াশিংটন ডিসি থেকে একজন প্যাথলজিস্ট, ডক্টর অস্কার বি হান্টার, জুনিয়রকে নিয়োগ করেছিলেন অগ্নিকাণ্ডের কয়েকদিন পরে। 

জর্জ সোড্ডার তার বাড়ির আঙ্গিনায় বাচ্চাদের জন্য একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। সেই জাগায়টি খননকালে, কিছু মানুষের মেরুদণ্ডের হাড় পান তারা। সেগুলো স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনে বিশ্লেষণের জন্য পাঠান জর্জ। গবেষকরা বলেন, এই হাড়ের সঙ্গে জর্জের বাচ্চাদের মিল নেই। ১৯৬৮ সালে, সোড্ডার মেইলে একটি চিঠি পেয়েছিলেন। যা লুই সোড্ডারের সঙ্গে সাদৃশ্য প্রাপ্ত বয়স্ক যুবকের ছবিযুক্ত ছিল। পোস্টমার্কটি কেন্টাকি থেকে ছিল। তবে কোনো ফেরতের ঠিকানা ছিল না। ভেতরে একটি বার্তা ছিল। সেখানে লেখা ছিল লুই সোড্ডার। 

এই ঘটনা জেনি আর জর্জের জীবনে নতুন মোড় নেয়। ১৯৫২ সালে জর্জ এবং জেনির হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের ছবি এবং ১০ হাজার ডলার পুরষ্কার ঘোষণা করে তারা আবার বিজ্ঞাপন দেন। রাস্তায় বিশাল একটি বিলবোর্ড তৈরি করেছিলেন। তারা ৩৭ বছর ধরে বোর্ডটি টাঙিয়েই রেখেছিলেন। সেসময় তারা অনুসন্ধানের জন্য সারা দেশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি তদন্তকারীর সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। শুধু তাদের ভ্রমণ ব্যয়ের জন্য দিয়েছিলেন ১৫ হাজার ডলারেরও বেশি। আজ যা প্রায় দুই লাখ ডলারেরও বেশি হবে। 

আজ এই সোড্ডার পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য সিলভিয়া সোড্ডার। তিনি প্রতিবছর তার ভাইবোনের জন্য স্মরণ সভার আয়োজন করেন। এই বছর সিলভিয়ার বয়স হবে ৭৭ বছর। জর্জ সোডার ১৯৬৯ সালে ৭৩ বছর বয়সে মারা যান। জেনি সোডার ১৯৮৯ সালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। তখন তার বয়স ছিল ৮৫ বছর। সিলভিয়ার বাবা-মা তাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের বাচ্চাদের সন্ধান চালিয়ে গেছেন। 

সূত্র: হিস্টোরিকমিস্টোরিয়াস

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস