রবীন্দ্রনাথ থেকে হুমায়ূন: প্রেমই তাদের সৃষ্টিশীলতার চাবিকাঠি

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

রবীন্দ্রনাথ থেকে হুমায়ূন: প্রেমই তাদের সৃষ্টিশীলতার চাবিকাঠি

 প্রকাশিত: ১৪:২৫ ১৯ জুলাই ২০১৮   আপডেট: ১৪:২৫ ১৯ জুলাই ২০১৮

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হুমায়ূন আহমেদের অবস্থান জনপ্রিয়তার নিরিখে প্রায় সমান সমান। মানুষের মনে তাদের প্রতিমূর্তি প্রায় ঈশ্বরতুল্য। তাদের সাহিত্য বা সাংস্কৃতিক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা ও চর্চাকে বাঙালি উদার চিত্তে স্বাগত জানায়। কিন্তু এদের প্রেম, তাদের জীবনে নারী, তাদের পরকীয়া – এসব নিয়ে কথা বললেই হা রে রে রে আমায় ছেড়ে দে রে রে রে... কিন্তু একটা কথা সবারই স্বীকার করতে দ্বিধা যে এই মহান সাহিত্যিকদের সৃষ্টিশীলতার পিছনে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য।

রবীন্দ্রনাথ ও হুমায়ূন আহমেদ যে পাক্কা প্রেমিক সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথের সময় সংবাদমাধ্যম এত শক্তিশালী ছিল না। কাজেই তার বিভিন্ন রচনা থেকে একটা ধারনা করা যেতে পারে। শুরু করা যাক এদের বাল্যপ্রেম নিয়ে।      

১৮৭৮ সালে বিলেত যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে পাঠানো হয়েছিল আহমেদাবাদ বড়ভাইয়ের কাছে আদবকায়দা শিখতে। বড় ভাইয়ের বন্ধু ড. আত্মারাম পান্ডুরাং তুরখাদের সঙ্গে দুই মাস তিনি কাটালেন। ড. পান্ডুরাং-এর কিশোরী কন্যা অ্যানা বা অন্নপূর্ণা পান্ডুরাংয়ের সঙ্গে রবির দোস্তি হল। তিনি রবিকে তার জন্য একটা নাম ঠিক করতে বললেন। রবি তার নামকরণ করলেন নলিনী। ব্যস, শিকেয় উঠল বিলিতী আদবকায়দা শেখা। রবি লিখে ফেললেন কবিতা - শোন নলিনী খোল গো আঁখি / ঘুম এখনো ভাঙ্গিল না কি/ দ্যাখো তোমারি দুয়ার পারে/ সখি এসেছে তোমারি রবি/ শুনি প্রভাতের গাথা মোর/ দ্যাখো ভেঙ্গেছে ঘুমের ঘোর/ দ্যাখো জগত্ উঠেছে নয়ন মেলিয়া/ নতুন জীবন লভি/ তবে তুমি গো সজনি জাগিবে না কি/ আমি যে তোমার কবি। রবি ঠাকুর এপ্রসঙ্গে বলেছেন - আমার সঙ্গে সে প্রায়ই যেচে মিশতে আসত । কত ছুতো করেই সে ঘুরত আমার আনাচে কানাচে । আমাকে বিমর্ষ দেখলে দিত সান্ত্বনা, প্রফুল্ল দেখলে পিছন থেকে ধরত চোখ টিপে…..একদিন আচমকা বলল” জানো কোনো মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে যদি তার দস্তানা কেউ চুরি করতে পারে তবে তার অধিকার জন্মায় মেয়েটিকে চুমো খাওয়ার?” যা বলার রবি ঠাকুর বলে দিয়েছেন। এরপরে মন্তব্য নিস্প্রয়োজন।

হুমায়ূন আহমেদের তখন স্কুল জীবন। সেই সময় স্কুল তার কাছে দুঃস্বপ্ন। বয়স মাত্র আট নয়। সেই সময় তার জীবনে এলেন পারুল আপা। লম্বা বিষাদময় চেহারা। চোখ দুটি বেশ বড়। বয়স বারো-তেরো। বয়ঃসন্ধিকাল। হৃদয় ছিল আবেগ ও ভালবাসায় পূর্ণ। হুমায়ূনের স্মৃতিচারনায় ‘কোনো এক বিচিত্র কারণে তিনি তার হৃদয়ের সমস্ত আবেগ ও ভালবাসা আমার ওপর উজার করে দিলেন... তিনি ভালবাসার কঠিন শিকলে আমায় বাঁধতে চাইলেন... রূপবতীদের বেলায় আমি অন্ধ, তাদের কোনো ত্রুটি আমার চোখে পড়ে না...তাদের সৌন্দর্যই আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে...বলতে ইচ্ছে করে আমি তব মালঞ্চের হব মালাকার... পারুল আপা ছিলেন যাবতীয় নিষিদ্ধ বিষয়ে আমার জ্ঞানদাত্রী... পুরুষ এবং রমনীর ভেতর বাহ্যিক সম্পর্ক ছাড়াও যে অন্য একধরনের সম্পর্ক আছে তা প্রথম জানলাম তার কাছে... পারুল আপার স্কুলের খাতায় একটি প্রেমপত্র পাওয়া গেল। সম্বোধনহীন প্রেমপত্রে তিনি একজনকে অনুরোধ করেছেন তাকে চুমু খাওয়ার জন্যে... কেন জানি আমার মনে হয়, ওই প্রেমপত্র তিনি আমাকে লিখেছিলেন... কারন আমি ছাড়া অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল না এবং একবার হুমাযূন তাকে চুমু খাওয়ার জন্যে লাজুক গলায় অনুরোধ করেছিলেন...’ এক্ষেত্রেও হুমায়ূন একই রকমের কথা বলেছিলেন নিজেকে উদাসীন চিত্রিত করে। কিন্তু এক হাতে তালি বাজে কি?

১৭ বছর বয়সে কবি ইংল্যান্ডে গিয়ে ড. স্কট নামে একজন ইংরেজের পেয়িংগেস্ট হিসেবে থাকতে শুরু করলেন। ক্রমশ ওই পরিবারের একজন হয়ে উঠলেন। ড. স্কটের দুটি কন্যা, বিশেষত ছোটটি কবির প্রেমে পড়ল। ইন্দ্রনাথ চৌধুরী তাঁর রচনায় মন্তব্য করেছেন, ‘লন্ডনের ব্লুমবেরির স্কট ভগিনিদের প্রেমের আহ্বানে তরুণ কবি সাড়া দেননি। তিনি ঐ পরিবারে পেয়িং গেস্ট ছিলেন।’ লন্ডনে তিনি একটি কবিতা রচনা করে ‘দুই দিন’ নামে এটি প্রকাশ করেন। এছাড়া প্রকাশিত হয় ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’ । মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের চোখে পড়ল। অতএব দড়ি ধরে মারো টান...

প্রথম জীবনে নীলু নামের এক তরুণীর প্রেমে পড়ছিলেন হুমায়ূন। নীলু সম্ভবত হুমায়ূনের খুবই প্রিয় ছিলেন। তার অনেক উপন্যাসেই নীলুকে বারবার আসতে দেখা যায়। প্রথম জীবনে নীলুকেই বিয়ে করার কথা ছিল এই কিংবদন্তি সাহিত্যিকের। পরিকল্পনামতো নীলু বাড়ি থেকে ব্যাগ গুছিয়ে রেলস্টেশনে চলে আসেন। হুমায়ূনের সেইখানে আগে থেকেই হাজির থাকার কথা। তিনি হাজিরও ছিলেন। কিন্তু সব দায়িত্ব ছেড়ে এত বড় ঝুঁকি নেন নি। শেষ মুহুর্তে সিদ্ধান্ত পালটে ফেলেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি সেইদিন মেয়েটার মুখোমুখি হন নি। নীলুকে ট্রেনে উঠতে দেখার পর একাই বাড়িতে ফিরে আসেন হুমায়ূন। 

কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দেখা হয় যখন কাদম্বরী দেবীর বয়স ছিল দশ আর রবি ছিলেন আট বছর বয়সের একজন বালক। কিশোর বয়সে যখন রবীন্দ্রনাথের মায়ের মৃত্যু হয়, তখন তার বৌদি কাদম্বরী দেবী এবং তাঁর স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাকে আশ্রয় দেন। বৌঠান-দেবরের এই সম্পর্ককে ঘিরে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে উঠেছিল অনেক গুঞ্জন। রবীন্দ্রনাথকে ব্যারিষ্টার হওয়ার জন্য আরো একবার পাঠানো হল বিলাতে। কিন্তু জাহজ মাদ্রাজ অবধি যেতেই তুচ্ছ অজুহাত দেখিয়ে বৌদির জন্য একরাশ মনকেমন নিয়ে ফিরে এলেন তিনি । ফিরে এসেই রবীন্দ্রনাথ আশ্রয় নিলেন জ্যোতিদাদা ও কাদম্বরী বৌঠানদের সাথেই গঙ্গাতীরে মোরান সাহেবের বাগানবাড়িতে । রচনা হল অন্যরকমের জাগরণের বাঁধভাঙা কবিতা “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” ; পরের বছর দুর্গাপুজোতে দার্জিলিংয়ে অরেক স্মরণীয় সময় ঘটেছিল রবীন্দ্র-কাদম্বরীর । তার এক মাস পরেই ভারতী পত্রিকায় কবি লিখলেন :

“সেই জানালার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলি মনে পড়ে, সেই  অশ্রুজলে সিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলিকে মনে পড়ে । আর একজন যে আমার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে মনে পড়ে, সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল, সেইটে দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সেই ত যথার্থ কবিতা লিখিয়াছিল । তাহার সে অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হ‌ইল না , আর আমার রচিত গোটাকতক অর্থহীন হিজিবিজি ছাপা হ‌ইয়া গেল”

এই লেখাটি প্রকাশের পরেই ঠাকুরবাড়িতে আগুণ জ্বলে উঠল । তার বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দিলেন বড়রা । বিয়ের ঠিক করেই ফিরে এলেন সকলে কোলকাতায় । কাদম্বরী মানসিকভাবে  প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়লেন ।কিছুকাল পরেই কবি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ   হলেন । বিয়ের বরণডালায় নতুন বরকনে যখন মঙ্গলহাঁড়ির চাল-কড়ি শুদ্ধ মাটির ভাঁড়গুলিকে ইচ্ছে করেই উল্টে দিলেন যুবক রবি ।

ছোট কাকিমা ত্রিপুরাসুন্দরী শুধালেন ” এ কি করলি রবি?”

উত্তরে রবি বলেছিলেন” সব‌ই তো আজ থেকে ওলটপালট হয়ে গেল কাকীমা “

অতএব সেই বিয়েটিতে তিনি মোটেও খুশি ছিলেননা । আর সেই সর্বক্ষণের সঙ্গীটি? সেই বৌঠানের আশ্রয়টি ? সেটি তো সেদিন থেকে হয়ে গেল অন্য কোনো রমণীর অর্থাত রবির পত্নী মৃণালিনীদেবীর অধিকারে । সেই বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই কাদম্বরী বৌঠান অনিয়ন্ত্রিত আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করলেন । দগ্ধে দগ্ধ মরলেন বিরহ যন্ত্রণায় কাতর সেই পঁচিশ অনুত্তীর্ণা রমণী । রবীন্দ্রনাথ জানতেন বৌঠানের প্রতি তাঁর প্রণয়ের কথা । তাঁর বাকী জীবনের কালজয়ী কবিতায়, গল্পে উগরে দিলেন সেই প্রণয়ের বিষ, জ্বালিয়ে দিলেন প্রেমের দীপাবলী । আবার স্বীকার করে একদা নিমলকুমারী মহলানবীশকে বলেও ফেলেছিলেন “বৌদিটির আত্মহননের জন্যেই আজো তাকে নিয়ে এত কবিতা আর গান লিখে ফেলেছি, তিনি বেঁচে থাকলে হয়ত বিষয় সম্পত্তি নিয়ে মামলা করতুম”।

বৌদির চোখের অমোঘ আকর্ষণ উপেক্ষা না করতে পেরেই বুঝি লিখেছিলেন : বড় বড় কাজল নয়ানে/ অসংকোচে ছিল চেয়ে/ নব কৈশোরের মেয়ে/ ছিল তারই কাছাকাছি বয়স আমার । বৌদি আর প্রণয়ে কাতর তার দেওরটি দুজনেই একা পরিবেশে বহুক্ষণ কাটিয়েছেন, পালন করেছেন তাদের একান্ত আপন  নিরালা। ইন্দ্রিয়ঘন তরুণ কবির সেই স্বীকারোক্তিই তার প্রমাণ ” সেই দুইজনে মিলিয়া কল্পনার রাজ্যে বিচরণ, সেই মৃদু গম্ভীর স্বরে গভীর আলোচনা, সেই দুইজনে স্তব্ধ হ‌ইয়া নীরবে বসিয়া থাকা, সেই প্রভাতের বাতাস সন্ধ্যার ছায়া, একদিন সেই বর্ষার ঘনঘোর মেঘ , শ্রাবণের বর্ষণ, বিদ্যাপতির গান… তাহারা সব চলিয়া গিয়াছে….আমার এই লেখার মধ্যে লেখা রহিল, এক লেখা তুমি-আমি পড়িব, আর এক লেখা আর সকলে পড়িবে।”

এই ধরনের পারিবারিক অভিঘাতের মধ্যে কখনও যান নি হুমায়ূন। সে সুযোগও তার ছিল না। তিনি তার কেরিয়ার গড়তে রসায়ন নিয়ে পড়াশুনো করেছিলেন। তিনি ১৯৭৬ সালে গুলতেকিন খানকে বিয়ে করেন। গুলতেকিন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর নাতনী। ততদিনে হুমায়ুনের নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সে দিন প্রিন্সিপাল সাহেবের কিশোরী কন্যা গুলতাকিন হুমায়ূনের সাথে দেখা করতে এসেছে তার সকল সাহিত্য মুগ্ধতা নিয়ে। দেখা করার পরের পর্ব প্রসঙ্গ নিয়ে হুমায়ূন লিখছেন - 

গুলতাকিনের সাথে আমার বিয়ে হয় ঝোঁকের মাথায়। তখন আমি হত দরিদ্র। লেকচারার হিসেবে ইউনিভারসিটি থেকে সাত আটশ টাকা পাই। বাবর রোডের এক সরকারী বাসায় থাকি। সে বাসার অ্যাভিকেশন নোটিশ হয়ে গেছে। বাড়ি ছাড়তে হবে। আমার মনে হল গুলতাকিন নামের এই বালিকাটিকে আমার পাশে না পেলে আমার চলবে না।

মাত্র চোদ্দ বছরের দশম শ্রেণীতে পড়া গুলতাকিনকে তার বাবা মায়ের কিছুটা অনিচ্ছায় বিয়ে করলেন হুমায়ূন আহমেদ। সম্পর্ক স্থায়ী হয়েছিল সাতাশ বছর। হুমায়ূন প্রথম থেকেই কিছুটা পুরুষতান্ত্রিক ছিলেন। গুলতাকিন এক সাক্ষাতকারে বলেছেন ‘এইচএসসিতে হলিক্রসে পড়তাম। পরীক্ষার ৩ মাস আগে আমার বাচ্চাদের বাবা (হুমায়ূন আহমেদ) আমাকে জোর করে ইউএসএ নিয়ে গেল। পরীক্ষা দেওয়া হল না। আমি যেতে চাইনি। শেষে আমার দাদাকে চিঠি লিখে আমাকে যেতে বাধ্য করল। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। মেডিকেলে পড়তে পারলাম না।… অনেক পরে মোহনগঞ্জ থেকে পাস করলাম… এইচএসসি শেষে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাইলাম। আমার সাবেক স্বামী বললেন তোমাকে ইডেনে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছি।… তার পড়াশুনায় আমি সব সময় হেল্প করেছি। কিন্তু সে আমার পড়াশুনায় কোনো দিন হেল্প করেনি। … সে আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত। এটা আমার খুব খারাপ লাগত।…  

এই বিচ্ছেদের পিছনের কারন নিয়ে চর্চা অনেক হয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনে তাদের যে শান্তি ছিল না এটা সত্য। দু পক্ষের মধ্যে যে তিক্ততা ছিল তার প্রকাশ ঘটেছে বারেবারে। হুমায়ূনকে বাসা থেকে বার করে দেওয়া, নিজে বেরিয়ে গিয়ে নিরুদ্দিষ্ট থাকা, দুর্ব্যবহারের চুড়ান্ত করা গুলতাকিনের কীর্তি। এদিকে হুমায়ূনের পুত্র কন্যাদের মুখে শুধু নিজের প্রশংসা শোনার বাসনা, নাটক ও সিনেমা নির্মাণ পর্বে বারেবারে বিভিন্ন চিত্রনায়িকা, সমাজের উঁচুতলার মহিলাদের সাথে জড়িয়ে পড়া, গুলতাকিন বাসায় উপস্থিত থাকা অবস্থায় হুমায়ূনের জনৈক নারীর হাত জড়িয়ে গল্প করা তাদের বিচ্ছেদের কারন হলেও এই পর্বে লেখনীর গুনে সাহিত্য উতকর্ষের শীর্ষে উঠেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। স্ত্রীকে প্রাপ্য সম্মান তিনি দেন নি তার আরাধ্য রবীন্দ্রনাথের মত।

রবি ঠাকুর বিয়ে করলেন মৃণালিনী দেবীকে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায় তার রোম্যান্টিকতার ঝুলি ঝেড়ে প্রেম ঝরেনি  একফোঁটাও  সেই চিঠিতে । সব কেজো চিঠি।

স্ত্রীকে লিখলেন একবারঃ’ এখন আমার ক্রমশঃ বিশ্বাস হয়ে আসচে তোমার কাছে আমার চিঠির কোনো মূল্য নেই এবং তুমি আমকে দুছত্র চিঠি লিখতে কেয়ার করো না ’  এর থেকে বোঝা যায় তাঁদের মানসিক সম্পর্কের কথা ।

অন্যথায় মৃণালিনীর লেখায় উঠে আসে সেই ক্ষোভ: “আমি এখন সংসারের কাজের লোক হয়ে গেছি”। এখানেই বোঝা যায় মৃণালিনীর প্রতি তার অনীহা ! তাই মৃণালিনী হয়ে র‌ইলেন আঁতুড়ঘরের আদরের উপবাসী হয়ে। মৃনালিনী দেবীর আত্মসম্মানবোধ কখনই গুলতাকিনের মত ছিল না বলেই তিনি সহ্য করেছেন। একই সময়ে ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে লেখা বেশ কিছু চিঠির পড়ে বোঝা যায় ইন্দিরাও ছিলেন কবির প্রেমিকা। চব্বিশ বছর অবধি আইবুড়ো থেকে ইন্দিরা ঠাকুরপরিবারে রীতিমত আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন । কাকা রবীন্দ্রের সাথে তার এই বিশেষ সম্পর্কের কথা কেউ জানতে চাইলে ইন্দিরা বলেছে কিসের আবার ? বন্ধুত্বের সম্পর্ক আমাদের !  বহুদিনের অদর্শনে ইন্দিরার যখন প্রাণ হাঁকপাঁক করেছে তখন মান-অভিমানের পালা চলেছে দুজনের মধ্যে । আবার দেখা হতে সেই রাগ অনুরাগে পরিণত হয়েছে ।

কিশোরী রাণুর প্রেমে পড়াটা রবীন্দ্রনাথের জীবনে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ  অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য মহাশয়  এই  অসমবয়সী সম্পর্কের উপর  তিনি তাঁর একটি লেখায় লিখেছেন - “অসমবয়সী রানু ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এক আশ্চর্য অন্তরঙ্গ নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ১৯১৭ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত। শিল্পপতির পুত্র বীরেন্দ্রের সঙ্গে বিবাহ স্থির হয়ে গেলে রানু-রবীন্দ্রের দীর্ঘ আট বছরের প্রীতি- ভালবাসার মধুর পরিণত সম্পর্কটি ছিন্ন হয়ে যায়। এই সময় সুন্দরী রানুর বয়স উনীশ। ১৯১৭-তে পরস্পরের পত্রবিনিময়ের মাধ্যমে যখন দুজনের অনির্বচনীয় একটি  সম্পর্কের ভিত্তিভূমি রচিত হচ্ছিল তখন রানুর বয়স এগারো, আর সেই সময়  নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথের বয়স ছাপ্পান্ন। চিঠির পর চিঠিতে  ‘ভারী দুষ্টু’ রবীন্দ্রনাথকে চুম্বনের পর চুম্বন দিতে দিতে ‘প্রিয় রবিবাবু’ কে রানু বলে, ‘কেও জিজ্ঞাসা করলে বলবেন আপনার বয়স ‘সাতাশ’। উত্তরে রবীন্দ্রনাথ কৌতুক করে বলেন , ‘আমার ভয় হয় পাছে লোকে সাতাশ শুনতে সাতাশি শুনে বসে।

একবার রানু অধিকারী কবির সাথে চললেন শিলং। কবির ঘরে, কবির বিছানায় রাণুর অনধিকার প্রবেশ আত্মীয়দের চোখে কটু লাগে । কিন্তু সে মেয়ে নাছোড় আর কবির আস্কারাতে  সেই মেয়ের কবির ওপর পাইনগাছের মত সর্বক্ষণের খবরদারি । দুচোখ দিয়ে শিলংয়ের শোভার মধ্যে দিয়ে কবির কল্পনায় ভেসে উঠল লাবণ্য-অমিতর প্রেম । রচিত হল “শেষের কবিতা”।

বাংলাদেশে ঝড় উঠেছিল হুমায়ূনের দ্বিতীয় এবং অসমবয়সী বিয়ে নিয়ে। নানা রকম কথা ছড়িয়ে পরে দেশজুড়ে। কেউ কেউ বলেন, মেয়ের বান্ধবী ছিলেন শাওন। মেয়ের বান্ধবীকেই বিয়ে করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। যদিও শাওন বলেন, ‘বান্ধবীর বাবার সঙ্গে প্রেম করিনি বরং বন্ধুর মেয়ের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদের কন্যা শীলা আহমেদ আমার বন্ধুর মেয়ে।‘ হুমায়ূনের মৃত্যুর পর জনপ্রিয় এই লেখকের সাহিত্য কীর্তির মূল্যায়নের চাইতে তাঁর ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনই গণমাধ্যমে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি আলোচিত হয়েছে। কিন্তু একটা কথা সবাই উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন যে সাত বছরের বিবাহিত জীবনে শাওন যে শান্তি দিয়েছেন হুমায়ূনকে তা অভূতপূর্ব। চিকিৎসাপর্বে যে ভাবে হুমায়ূনকে আগলে রেখেছিলেন শাওন তা অবশ্যই একজন নন্দিত লেখকের শেষ জীবনের প্রাপ্য। হুমায়ূনের সাথে শাওনের প্রেম ও দাম্পত্য জীবনের সময়কাল হুমায়ূনের জীবনের সেরা ও পরিনত সৃষ্টিগুলি আমরা পেয়েছি।

একথা সত্যি সব পেয়েও রবীন্দ্রনাথ বা হুমায়ূনের হৃদয় প্রেমের জন্যে হাঁকপাঁক করত। একে সামাজিক সংকীর্ণতার দৃষ্টিকোন দিয়ে না দেখে সৃষ্টিশীল মানুষের চোখ দিয়ে দেখা উচিৎ। কারন আজ এটা প্রমানিত যে সৃষ্টির উতকর্ষের চাবিকাঠি নিহিত থাকে নারী ও প্রণয়ে। একে স্বীকার করে নেওয়াই ভাল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর