Alexa রবীন্দ্রনাথের থিয়েটার, থিয়েটারের রবীন্দ্রনাথ || অপু মেহেদী

ঢাকা, বুধবার   ১৭ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

রবীন্দ্রনাথের থিয়েটার, থিয়েটারের রবীন্দ্রনাথ || অপু মেহেদী

নিবন্ধ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৪৭ ৯ মে ২০১৯  

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

‘বাল্যকাল হইতেই আমার মনের মধ্যে নাট্যাভিনয়ের শখ ছিল। আমার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল, এ কার্যে আমার স্বাভাবিক নিপুণতা আছে। আমার এই বিশ্বাস অমূলক ছিল না, তাহার প্রমাণ হইয়াছে। নাট্যমঞ্চে সাধারণের সমক্ষে প্রকাশ হইবার পূর্বে জ্যোতিদাদার ‘এমন কর্ম আর করব না’ প্রহসনে আমি অলীকবাবু সাজিয়াছিলাম। সেই আমার প্রথম অভিনয়।

এটি ২০ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। লিখেছেন তার ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে। ছোটবেলা থেকেই তার মনে অভিনয়ের যে সুপ্ত বাসনা ছিল পরবর্তীতে বাসনায়  তাকে নাট্য রচনা ও অভিনয়ের দিকে ধাবিত করে।

১৯৭৮ সালে বালক রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ড (তৎকালীন বিলাত) গেলেন ব্যারিস্টারি পড়তে। কিন্তু সাহিত্যচর্চার আকর্ষণে পড়া শেষ না করেই দেশে ফিরে এলেন ১৯৮০ সালে। ব্যরিস্টারি পড়া শেষ না করলেও এই দেড় বছরে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটে শেক্সপিয়রসহ অন্যান্য ইংরেজি সাহিত্যিকদের রচনার সঙ্গে। এই সময়ে তিনি শেক্সপিয়রের দুটি নাটক খুব মনোযোগ সহকারে পাঠ করেন- ‘কোরিওলেনাস’ ও ‘এন্টনি এন্ড ক্লিওপেট্রা’। মূলত এই নাটক দুটি পড়েই তার নাট্যরচনার সুপ্ত বাসনা জাগ্রত হয় এবং ১৯৮০ সালে দেশে ফেরার এক বছরের মাথায় তিনি দেশজ ও বিলাতি সুরের মেলবন্ধনে রচনা করেন তার প্রথম নাটক ‘বাল্মিকী প্রতিভা’।

এমন একটা সময়ে রবীন্দ্রনাথ তার প্রথম নাটকটি লিখলেন যখন বাংলা থিয়েটারে পেশাদারি নাট্যশালার প্রচলন শুরু হয়ে গিয়েছে। গিরিশ ঘোষ, অর্ধেন্দুশেখর, অমৃতলাল, কেদার চৌধুরীদের নেতৃত্বে একের পর এক থিয়েটার গড়ে উঠছে। মঞ্চে উঠছে নতুন নতুন নাটক। কিন্তু এইসব নতুন নতুন নাট্যশালার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বা ঠাকুরবাড়ির কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিলো না। বরং ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক মঞ্চকে ঘিরেই চলতে থাকে রবীন্দ্রনাথের নাট্য ও থিয়েটার চর্চা।
১৮৬৫ সালেই ঠাকুরবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ‘জোড়াসাঁকো নাট্যশালা’। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন মাত্র ৪ বছর। তখনকার ইংরেজদের আর দশটা শৌখিন নাট্যশালার মত এটা ছিলো না। নাট্য প্রযোজনায় জৌলুশ ও জমকালো ভাব দেখানোর পরিবর্তে এখানে পাশ্চাত্য ও ভারতীয় দেশজ নাট্যকলার মিশেলে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুনদা জ্যেতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন সংগীত ও নাটকে নিবেদিতপ্রাণ। দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন প্রধান অনুপ্রেরণাদাতা। এসব কারণেই রবীন্দ্রনাথের মনে নাট্যাভিনয়ের শখ জাগ্রত হয় যার প্রথম প্রয়োগ ঘটে ২০ বছর বয়সে।

আলোচনার সুবিধার্থে রবীন্দ্রনাথের থিয়েটারকে আমরা তিনটি পর্বে ভাগ করে নিতে পারি। ১. কলকাতা পর্ব (১৮৮১-১৯০১), ২. শান্তিনিকেতন পর্ব (১৯০২-১৯১৫) ৩. মিশ্র পর্ব (১৯১৬-১৯৪১)।

রবীন্দ্রজীবন ও কলকাতা পর্বের প্রথম নাটক গীতিনাট্য ‘বাল্মিকী প্রতিভা’। ১৮৮১ রচিত ও মঞ্চস্থ এই নাটকে রবীন্দ্রনাথ ঋষি বাল্মিকীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। এই নাটকের মঞ্চায়নের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ নাট্যকার, সুরকার ও নির্দেশক রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ তো আগেই হয়ে গিয়েছে। বাল্মিকী প্রতিভার প্রথম মঞ্চায়নের দর্শক হিসেবে ছিলেন উপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নাটকটি দেখে বঙ্গদর্শণ পত্রিকায় তিনি নাটকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। পরবর্তীতে লেডি ল্যান্সডাউনের উপস্থিতিতে এর আরো একটি প্রদর্শনী হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এই নাটকের আরো প্রদর্শনী হয়। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া এই নাটকের অন্য সকল কুশীলবও ছিলেন ঠাকুরবাড়ির লোকজন।
বাল্মিকী প্রতিভার অভিনয় সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে পরের বছরই রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন নাটক ‘কালমৃগয়া’। পরবর্তীতে এটি বাল্মিকী প্রতিভার অন্তর্ভুক্ত হয়। রবীন্দ্রনাথের নির্দেশনায় এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন জ্যেতিরিন্ত্র নাথ, ঋতেন্দ্রনাথ ও অভিজ্ঞা দেবী। রবীন্দ্রনাথ অভিনয় করেন কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘অন্ধমুনি’।

ছেলেদের পাশাপাশি ঠাকুর বাড়ির মেয়েরাও অভিনয়ে মেতে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথের বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘মহিলা সমিতি’ নামে একটি নারী সংগঠন ছিলো। তাদের অভিনয়ের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন ‘মায়ার খেলা’। ১৮৮৮ সালে ঠাকুর বাড়ির মেয়েরা ও মহিলা সমিতির মেয়েরা সম্মিলিতভাবে এই নাটকে অভিনয় করেন। অভিনীত হয় তৎকালীন বিখ্যাত বেথুন কলেজে। পরবর্তীতে এই নাটকটিও বিভিন্ন জায়গায় অভিনীত হয়।

এরপর ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন দুটি নাটক- ‘রাজা ও রাণী’ এবং ‘বিসর্জন’। মূলত এ নাটক দুটির মাধ্যমেই নাট্যকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের আসন পাকাপোক্ত হয়। গীতিনাট্য থেকে সরে এসে এই নাটক দুটিতেই রবীন্দ্রনাথ প্রথম ঘটনাবহুল ও দ্বন্দজাত নাট্যের সূচনা করেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরজিতলার বাড়ির প্রসস্ত বারান্দায় মঞ্চ পেতে ‘রাজা ও রাণী’র অভিনয় হয়। এই নাটকে রবীন্দ্রনাথ অভিনয় করেছিলেন বিক্রমদেব চরিত্রে। আর রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃনালীনি দেবী করেছিলেন নারায়নী চরিত্রে অভিনয়। এটিই মৃণালীনি দেবীর একমাত্র অভিনয়। সে যুগে বাড়ির মেয়ে ও বৌ-দের নিয়ে এভাবে নাটকে অভিনয় করাতে বেশ সমালোচনার মুখে পরতে হয়েয়য়চিল ঠাকুরবাড়িকে। কেননা তৎকালীন সাধারণ রঙ্গালয়ে প্রকাশ্যে যে নারীরা অভিনয় করতো তার কেই ভদ্রসমাজের ছিলো না, ছিলো বারবণিতা। তবে এই সমালোচনা ঠাকুরবাড়িকে তেমন বিচলিত করেনি। তারা বরং তাদের কাজটি চালিয়ে গেছেন। তারা কখনোই সাধারণ রঙ্গালয়ের ওইসব অভিনেত্রীদের মুখাপেক্ষী হননি। ‘রাজা ও রাণী’ নাটকটি সবচেয়ে বেশিবার অভিনীত হয়েছিল। বিভিন্ পরিবর্তন আর পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে গিয়ে নাটকটি কখনো ‘রাজা ও রাণী’ নামে, কখনো ‘ভৈরবের বলি’ নামে, আবার কখনো ‘তপতী’ নামে অভিনীত হয়েছিল।

‘রাজর্ষী’ উপন্যাসে জয়সিংহ এর মৃত্যুর ঘটনা অবলম্বনে রচিত ‘বিসর্জন’ নাটকটির প্রথম অভিনয়ও হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরজিতলার বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন রঘুপতি চরিত্রে অভিনয়। বিসর্জন অবশ্য পরবর্তীতে শান্তিনিকেতনেও অভিনীত হয় কিন্তু তখন রবীন্দ্রনাথ অভিনয় করেনি। বিরজিতলার বাড়িতে বিসর্জনের একটি প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী। সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে যতীন্দ্রমাহন লিখেছেন- ‘কবির রঘুপতি অভিনয় দেখিয়া আনন্দে ও বিস্ময়ে একেবারে অভিভূত হইয়া গেলাম। সেই প্রিদর্শন সুকুমার তনু রবীন্দ্রনাথ রুক্ষ কঠিন রঘুপতি রূপে রূপান্তরিত।’ 

বিসর্জনে রবীন্দ্রনাথের শেষ অভিনয় ছিলো ১৯২৩ সালে এম্পায়ার থিয়েটারে জয়সিংহের ভূমিকায়। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ৬২ বছর। অমৃতলাল বসু সেই অভিনয় দেখে এর অভিভূত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। ‘ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের অভিনয়ের প্রমংসা করে অমৃতলাল বসু লিখেন- ‘নাটক যতো এগোতে লালল, আমি- এক ঘাঘী মঞ্চঘোটক, অনুভব করলাম- আমি অভিনয় শিক্ষার বাস্তব শিক্ষা লাভ করছি। এই মহান কবি একজন মহান অভিনেতা, মঞ্চবিজ্ঞান শৈলীর একজন অধিকর্তা’।

বিসর্জনই রবীন্দ্রনাথের প্রথম নাটক যা ঠাকুরবাড়ির ঘেরাটোপের বাইরে এসে অন্য কোনো পেশাদার দল দ্বারা অভিনীত হয়। রবীন্দ্রনাথের প্রযোজনায় অনুুপাণিত হয়ে পরবর্তীতে শিশির ভাদুড়ি তার থিয়েটারে বিসর্জনের অভিনয় করে খ্যাতিলাভ করেন। এরপর শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় ‘বহুরূপী’ও ‘বিসর্জন’ এর প্রযোজনা মঞ্চে এনেছিলেন।

কলকাতা পর্বে বিসর্জনের পর আর দেমন কোনো নাটক প্রযোজনা করেননি রবীন্দ্রনাথ। তবে তার ছোট ছোট কয়েকটি মজাদার প্রহসন যেমন- ‘নূতন অবতার’, ‘বিনি পয়সার ভোজ’, ‘গোড়ায় গলদ’ ইত্যাদির অভিনয় হয়েছিল তৎকালীন ভারতীয় সঙ্গীত সমাজের অনুষ্ঠানে।…

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএস