Alexa রকরাজার ‘ডায়েরি’

ঢাকা, সোমবার   ১৮ নভেম্বর ২০১৯,   অগ্রহায়ণ ৪ ১৪২৬,   ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

রকরাজার ‘ডায়েরি’

তানভীর আহম্মেদ সরকার ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ০৯:৫৩ ১৮ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৩:০৯ ১৮ অক্টোবর ২০১৯

আইয়ুব বাচ্চু

আইয়ুব বাচ্চু

চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন ব্যান্ডসঙ্গীতের ‘রক রাজা’ খ্যাত কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু। গত বছরের অক্টোবরে রংপুরে কনসার্ট শেষ করে ঢাকাই ফিরেন তিনি। এরপরে ১৮ অক্টোবর হৃদরোগের আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মাত্র ৫৬ বছর বয়সেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। 

তার রূপালি গিটার ফেলে বহুদূরে চলে গেলেও ভক্তরা তাকে হৃদয়ের চেতনায় অনুভব করে আছেন। তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কাছে তন্দ্রা আজ অসহায়! চলে গেলেও একজন্মহীন নক্ষত্রের মতোই জেগে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে।

তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, লিড-গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী। এলআরবি ব্যান্ড দলের লিড গিটারিস্ট এবং ভোকাল আইয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্বদের একজন। এর আগে তিনি দশ বছর সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে লিড গিটারিস্ট হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

কিশোর বয়স থেকেই স্বপ্ন বুনছিলেন সংগীতের জাদুকর শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। পরিবারের তেমন কেউ গানের সঙ্গে না থাকলেও শৈশব থেকেই গানের প্রতি তার ঝোঁক ছিল ‍তুমুল। আধুনিক-লোকগীতি ও ক্লাসিক্যাল গানের পাশাপাশি শুনতেন প্রচুর ওয়েস্টার্ন গান। গিটারে ছিলেন তিনি জাদুকর। তাকে বলা হয়, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত এগিয়ে নেয়ার অন্যতম অগ্রপথিক।

বাচ্চু মানেই উন্মাতাল ভক্তে পরিপূর্ণ গ্যালারি। অথচ মাত্র ৫৬ বছর বয়সেই সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন রূপালি গিটার, মায়াবি সকালের মায়া। দেশীয় ব্যান্ড সংগীতের তিনি ছিলেন মধ্যমণি।

এ রক রাজার গড়ে তোলা ব্যান্ড এলআরবি পথচলার পার করেছে ২৭ বছর। শ্রোতাদের দিয়েছেন তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তার জনপ্রিয় গান রূপালি গিটার ফেলে সত্যি চলে গেলেন দূরের বহুদূরে। সুখের পৃথিবীতে তাকে আর করতে হল না সুখের অভিনয়।

আইয়ুব বাচ্চু পরিচিত নাম হলেও তার পুরো নাম আইয়ুব বাচ্চু রবিন, এবি নামেও বেশ পরিচিত তিনি। ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাচ্চু। সেখানেই কেটেছে কৈশোর আর তারুণ্যের দিনগুলো। তারা তিন ভাই-বোন ছিলেন। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সে ছিল সবার বড়। মুক্তিযুদ্ধের পর তার বাবা চট্টগ্রাম শহরের জুবীলি রোড এলাকায় একটি বাড়ি ক্রয় করেন, যেখানে বাচ্চুর বেশিরভাগ কৈশর জীবন অতিবহিত হয়। ১৯৭৩ সালে তার বাবা তাকে তার ১১তম জন্মদিনে একটি গিটার উপহার দেন। তার কৈশর জীবনের শুরুর দিকে সে বিভিন্ন ব্রিটিশ এবং আমেরিকান রক ব্যান্ডের গান শোনা শুরু করে।

১৯৭৬ এর দিকে সে তার এক বন্ধুর থেকে ধার নিয়ে ইলেকট্রিক গীটার বাজাতো, যা ছিল একটি টিস্কো গীটার। পরে সে যখন গিটারটির প্রতি বেশি আগ্রহ দেখান, তার বন্ধু তাকে গিটারটি দিয়ে দেয়। ১৯৭৫ সালে তাকে সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। ১৯৭৯ সালে সে ওই স্কুল থেকে পাশ এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেন। চট্টগ্রামে কলেজ জীবনে সহপাঠী বন্ধুদের নিয়ে তিনি একটি ব্যান্ডদল গড়ে তোলেন। এর নাম ছিল ‘গোল্ডেন বয়েজ’। 

পরে নাম বদলে করা হয় ‘আগলি বয়েজ’। সেই ব্যান্ডের গায়ক ছিল কুমার বিশ্বজিৎ এবং বাচ্চু ছিল গিটারিস্ট। সেই সময়ে তারা মূলত পটিয়ায় বিভিন্ন বিবাহ অনুষ্ঠানে গান গাইতো এবং শহরের বিভিন্ন ক্লাবে গান করতো। 

আইয়ুব বাচ্চুর সংগীত জগতে যাত্রা শুরু হয় ফিলিংস ব্যান্ডের সঙ্গে ১৯৭৮ সালে। তার কণ্ঠ দেয়া প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’। এরপর যোগদেন সোলসে। 

১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে তিনি সোলস ব্যান্ডের  সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম রক্তগোলাপ নামে একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন। অ্যালবামটি তেমন সাফল্য না পেলেও সফলতার শুরু তার দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ময়না’ দিয়ে ১৯৮৮ সালে । ১৯৯০ এর দশকের শেষদিকে বাচ্চু সোলস থেকে বের হয়ে আসার পর ১৯৯১ সালে তিনি ঢাকায় আসেন এবং জানুয়ারিতে ফেরদৌস চন্দনাকে সঙ্গে বিয়ে করেন, যার সঙ্গে তার ১৯৮৬ সাল থেকে সম্পর্ক ছিল। তিনি ‘ইয়েলো রিভার ব্যান্ড’ নামের একটি ব্যান্ড গঠন করেন। 

১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল এস আই টুটুল (কীবোর্ডস), সাইদুল হাসান স্বপন (বেজ গিটার) এবং হাবিব আনোয়ার জয় (ড্রামস) নিয়ে যাত্রা শুরু করেন নিজের ব্যান্ড দলের। ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারা ভারতে অনুষ্ঠান করতে গেলে তাদের ভুলে ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’ নামে পরিচিত করানো হয়। নামটি বাচ্চু পছন্দ করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তার ব্যান্ড নামকরণ করেন। ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসে, এলআরবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রথম কনসার্টটি করে।

১৯৯২ সালের জানুয়ারী মাসে বাংলাদেশে প্রথম ডাবল অ্যালবাম ‘এলআরবি ১’ এবং ‘এলআরবি ২’ প্রকাশ করেছিল। ব্যান্ডটির তৃতীয় স্টুডিও অ্যালবাম সুখ, জুনে মুক্তি পায় এবং এটি বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ রক অ্যালবামগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়। এতে ‘চলো বদলে যাই’ গানটি ছিল যা বাচ্চুর সর্বশ্রেষ্ঠ কাজ হিসাবে বিবেচিত। নব্বইয়ের দশকে আরো কয়েকটি অ্যালবাম প্রকাশ করে এবং শীঘ্রই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রক ব্যান্ডের মধ্যে একটি হয়ে ওঠে।

২০০৯ সালে তার একক অ্যালবাম বলিনি কখনো প্রকাশিত। ২০১১ সালে এলআরবি ব্যান্ড থেকে বের করেন ব্যান্ড অ্যালবাম যুদ্ধ। এই অ্যালবামে ১০টি গান রয়েছে। ছয় বছর পর তার পরবর্তী একক অ্যালবাম ‘জীবনের গল্প’ (২০১৫) বাজারে আসে। এই অ্যালবামেও রয়েছে ১০টি গান। গানের কথা লিখেছেন সাজ্জাদ হোসাইন এবং সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন আইয়ুব বাচ্চু নিজে।

এ ছাড়া অনেক মিশ্র অ্যালবামে কাজ করেছেন। এর মধ্যে প্রিন্স মাহমুদের সুরে করা মিশ্র অ্যালবামগুলোতে তার গান আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পায়। তার সেরা গানগুলো নিয়ে একটি অ্যালবাম বের করা হয়। প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রেও গেয়েছেন। যেখানে তার আম্মাজান গানটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর একটি ধরা হয়।

এক নজরে আইয়ুব বাচ্চু:-
আইয়ুব বাচ্চু
জন্ম: ১৬ আগস্ট ১৯৬২, চট্টগ্রাম
মৃত্যু: ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ঢাকা
সংগীত জীবন শুরু: ১৯৭৮
প্রথম গান: হারানো বিকেলের গল্প
ব্যান্ড: প্রথম ব্যান্ড ফিলিংস (১৯৭৮)।  
প্রথম একক অ্যালবাম: রক্তগোলাপ (১৯৮৬)
এলআরবির প্রথম অ্যালবাম: এলআরবি ১ (১৯৯২)

সংগীত জীবন
ব্যান্ড অ্যালবাম
এলআরবি (১৯৯২)
সুখ (১৯৯৩)
তবুও (১৯৯৪)
ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫)
ফেরারী মন (১৯৯৬)
স্বপ্ন (১৯৯৬)
আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮)
মন চাইলে মন পাবে (২০০০)
অচেনা জীবন (২০০৩)
মনে আছে নাকি নেই (২০০৫)
স্পর্শ (২০০৮)
যুদ্ধ (২০১২)

একক অ্যালবাম
রক্তগোলাপ (১৯৮৬)
ময়না (১৯৮৮)
কষ্ট (১৯৯৫)
সময় (১৯৯৮)
একা (১৯৯৯)
প্রেম তুমি কি! (২০০২)
দুটি মন (২০০২)
কাফেলা (২০০২)
প্রেম প্রেমের মতো (২০০৩)
পথের গান (২০০৪)
ভাটির টানে মাটির গানে (২০০৬)
জীবন (২০০৬)
সাউন্ড অব সাইলেন্স (ইন্সট্রুমেন্টাল, ২০০৭)
রিমঝিম বৃষ্টি (২০০৮)
বলিনি কখনো (২০০৯)
জীবনের গল্প (২০১৫)

তথ্যসূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ আর্কাইভ

ডেইলি বাংলাদেশ/টিএএস