Alexa যৌনতার মন্দিরে আজো অভিশাপের আতঙ্ক

ঢাকা, মঙ্গলবার   ১২ নভেম্বর ২০১৯,   কার্তিক ২৭ ১৪২৬,   ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

Akash

যৌনতার মন্দিরে আজো অভিশাপের আতঙ্ক

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৩:৪৭ ১৬ অক্টোবর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

খাজুরাহো মন্দির। অবশ্য নামেই মন্দির। আদতে খাজুরাহো বললেই আমাদের মনে যা ভেসে ওঠে অন্যকিছু! খাজুরাহো মানেই একটা কৌতূহল, রহস্য, ঠোঁট চাপা মুচকি হাসি। যৌনতাকে খুব কাছ থেকে দেখা!

প্রেম থেকে আকর্ষণ ও তা থেকে যৌনতার সম্পর্ক খুব স্বাভাবিক ঘটনা। তবে প্রেম নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুললেও যৌনতা নিয়ে এখনো আড়ালেই আলোচনা হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। মধ্যপ্রদেশের খাজুরাহো গ্রামে অবস্থিত ২২ টি প্রাচীন মন্দিরকে দেখলে মনেই হবে না এই দেশে কোনোদিন যৌনতা নিয়ে আদৌ কোনো গোপনীয়তা ছিল। কীভাবে, তবে পড়ুন খাজুরাহো মন্দিরের রহস্য-

বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে এটি একটি। সনাতন ভারতের ইতিহাসে খাজুরাহো নিয়ে যে কাহিনী আছে তা অনেকেরই জানা। মন্দিরের আনাচে কানাচে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক কাহিনী। তার একটি যেমন পাপমোচনের অন্যটি অভিশাপের গল্প। বারানসীর ব্রাহ্মণ কন্যা হেতম্বীর রূপে মুগ্ধ হয়ে চন্দ্রদেব আকৃষ্ট হন। যৌনক্রিয়ার ফলে তাদের ঔরসজাত সন্তানই ছিলেন এই অঞ্চলে প্রথম চান্দেল রাজ বংশের প্রথম রাজা চন্দ্রবর্মন। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে চন্দ্রের সঙ্গে সহবাসের পাপবোধে হেতম্বী ভুগছিলেন। তার পাপস্খলনের জন্যই নাকি চান্দেল রাজা চন্দ্রবর্মন কামমূর্তি খচিত মোট ৮৫ টি মন্দির নির্মাণ করেন চন্দ্রদেবের নির্দেশে। এই মুর্তিগুলো সবই দেব দেবীদের উদ্দেশ্যে নির্মিত।

খাজুরাহো মন্দিরের সামনের অংশখাজুরাহো মন্দিরগুলো সম্পর্কে আর একটি মিথ আমরা পেয়ে থাকি। সে মিথ অনুসারে হেতম্বী ছিলেন কলিঞ্জর রাজ্যের রাজব্রাহ্মণ মনিরামের কন্যা। অল্প বয়সেই তিনি বিধবা হন। মনিরাম একদিন ভুল করে রাজাকে অমাবস্যার রাতকে পূর্ণিমা বলে ফেলেন। হেতম্বী পিতার এই ভুল জানার পর চিন্তিত হয়ে পিতার সম্মান রক্ষার্থে চন্দ্রদেবের কাছে প্রার্থনা জানান। চন্দ্র হেতম্বীর রূপে মোহিত হন ও তারা মিলিত হন। হেতম্বী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। মনিরাম এই ঘটনাটি জানতে পেরে শোকে মুহ্যমান হয়ে নিজেকে অভিশাপ দিয়ে পাথরের মূর্তিতে পরিণত করেন। পরবর্তীকালে হেতম্বীর সন্তান চন্দ্রতেয় চান্দেলা রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন ও খাজুরাহো মন্দির নির্মাণ করেন।

খাজুরাহোর কিছু কথা

মধ্যপ্রদেশের বেশ খানিকটা প্রান্তিক এলাকায় খাজুরাহো মন্দিরগুলি অবস্থিত। ইতিহাস বলে এই মন্দিরগুলি বানানো হয়েছিল ৯৫০-১০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চান্দেলা রাজাদের রাজত্বকালে। রাজশিল্পীদের উদ্যোগে মন্দিরগাত্র জুড়ে কঠিন পাথরের গায়ে ফুটে উঠতে লাগল অদ্ভুত সব কারুকাজ- যার মধ্যে বেশিরভাগটাই দেবদেবীদের মিলন মুহূর্তের ছবি। নগ্ন শরীর, আর যৌনতা। প্রাচীন বা ভারতীয় ঐতিহ্যে বিভিন্ন সংস্কৃত কাব্যে দেখি, এই সমস্তর অনুপুঙ্খ বিবরণ। 

মন্দিরে রয়েছে অসংখ্য যৌনতার নিদর্শনঅর্থাৎ প্রাচীনকালে ভারতীয় সংস্কৃতিতে মিলনের বর্ণনাকে অশ্লীল বলে চিহ্নিত করা হয়নি। তাহলে আজ কেন খাজুরাহোকে দেখতে এত লুকোচুরি? কেন খাজুরাহোর ভাস্কর্যের ছবি দেখলে আমরা মুখ ফিরিয়ে নিই ‘খারাপ’, ‘নোংরা’ বলে! অথচ ভেবে দেখুন প্রায় হাজার বছর আগেও মানুষ ভাবনা-চিন্তার দিক দিয়ে কেমন এগিয়ে ছিল! যৌনতা তাদের কাছে ছিল নিতান্তই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।

খাজুরাহো মিথ না ইতিহাস   

এই মন্দিরের ইতিহাসের আড়ালে রয়েছে অন্য এক রহস্যপূর্ণ কাহিনী। যে মন্দির কিনা নির্মাণ হয়েছিল কারোর পাপ মোচনের জন্য। সেই ফের অভিশপ্ত হয়! এমনই এক লোককথা শোনা যায়, এই অঞ্চলের মানুষের মুখে। খাজুরাহো গ্রামে নাকি কোনো এক সময় এসেছিলেন এক সাধু। সেখানেই তার শিষ্যদের রেখে যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন শিষ্যরা। তবে অসুস্থ সেসব শিষ্যদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেননি গ্রামের কেউই। একটু পানিও তাদের কেউ এগিয়ে দিতে আসেনি। এই অবস্থা দেখে সেই সাধু ফিরে এসে নাকি গ্রামের মানুষদেরকে অভিশাপ দেন। পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী গ্রামবাসীরা তাই তারা চিরতরে পাষাণ হয়ে যাক। এমন অভিশাপ দেয়ার পরেই নাকি এই সব মানুষেরা পাথর হয়ে যায় এবং এই মন্দিরের গায়ে যৌনক্রিড়ারত মুর্তিগুলি নাকি তাদেরই।

মন্দিরের গায়ে যৌন দৃশ্যএই জল্পনাকে উষ্কে দিয়েছে খাজুরাহো গ্রামের দু কিলোমিটার দুরে একই পাথরে নির্মিত এক কন্যার মুর্তি। লোককথা অনুসারে এই নারী নাকি একমাত্র যিনি অল্পক্ষণের জন্য হলেও সাহায্যের হাত এগিয়ে দিয়েছিলেন শিষ্যদের জন্য। সাধু প্রসন্ন হয়ে ওই গ্রামে একমাত্র নারীকে আশীর্বাদ করে পিছু না তাকিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে সাধুর অভিশাপ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে সেই নারী পিছু ফিরে খাজুরাহো মন্দির দর্শন করেছিলেন। আর তাতেই যত বিপত্তি, সেই নারীও পাষাণে পরিনত হয়েছিলেন কিছুটা দূরে পৌঁছানোর পরেই। সেই থেকে এখনো সন্ধ্যা নামার পর এই মন্দিরে কেউ থাকেনা পাথর হয়ে যাওয়ার ভয়ে। 

মন্দিরের অবস্থান

১৯৮৬ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করে ইউনেস্কো। মোট ৮৫টি মন্দিরের মধ্যে মাত্র ২২টি এখনো অবশিষ্ট রয়েছে। ৬ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত মন্দির এলাকা। মন্দিরে প্রতিদিন স্থানীয় নারীরা ফুল দিয়ে প্রার্থনা করেন। দর্শনার্থীদের প্রায়ই দেখা যায় করিডোর ধরে ঘুরে বেড়াতে। জটিল ও খোলামেলা মূর্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে অনেকে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। মন্দিরগুলোর প্রতিটি ইঞ্চি জুড়ে খোদাই করা রয়েছে বিভিন্নভাবে যৌনমিলনরত অজস্র মূর্তি। মূর্তির মধ্যে রয়েছে দেব-দেবী, যোদ্ধা, গায়ক, প্রাণী, পাখি ইত্যাদি। কিছু কিছু মূর্তি প্রগাঢ় যৌনতাবিশিষ্ট। পশু কিংবা দুইয়ের অধিক সঙ্গীবিশিষ্ট যৌনতাও অঙ্কন করা হয়েছে সেখানে।

মন্দিরটি দেখতে অসম্ভব সুন্দরঅনেকের ধারণা, যৌনকর্মের চিত্রাঙ্কনকে শুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কেননা, এর মাধ্যমে নতুন সূচনা ও নতুন জীবনের আরম্ভকে বোঝানো হতো। অনেকের মতে, এ মন্দিরগুলো ছিল প্রার্থনা ও শিক্ষার স্থল। এর বাইরেও, হিন্দুমতে, ঐতিহ্যগতভাবেই যৌনতা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধারণা করা হয়, এ মন্দিরগুলোতে যৌনতাকে আড়াল করার কোনো চেষ্টা করা হয়নি। 

তবে এ মন্দিরগুলো খাজুরাহোতেই কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা কারোরই জানা নেই। আদৌ এ অঞ্চলে কোনো রাজ্য ছিল কিনা, তার পরিষ্কার বর্ণনাও কোথাও নেই। কিন্তু হাজার বছর ধরে এ মন্দিরগুলো টিকে রয়েছে কীভাবে? ধারণা করা হচ্ছে, এ এলাকায় খুবই গভীর বনাঞ্চলের কারণে মন্দিরগুলো বহু বছর ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। এ কারণেই এসব টিকে ছিল এতদিন। ১৮৩৮ সালে বৃটিশ ক্যাপ্টেন টিএস বার্ট সর্বপ্রথম এসব আবিষ্কার করেন।

মন্দিরের এসব শিল্পকর্ম মুগ্ধ করে উপস্থিত দর্শকদেরযেভাবে যাবেন

১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা দেওয়ার পর থেকেই বিদেশি ট্যুরিস্টের বাড়বাড়ন্ত। গরম কালের তিন-চার মাস বাদ দিলে প্রায় সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। প্রথেমে ঢাকা থেকে কলকাতা। এরপর ট্রেনে খাজুরাহো যেতে গেলে হাওড়া থেকে জবলপুরগামী যেকোনো ট্রেনে মধ্যপ্রদেশের সাতনা স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে গাড়ি বুক করে যাওয়া যায়, ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা। 

আর আকাশপথে গেলে কলকাতা থেকে সরাসরি কোনো উড়ান নেই, বেশির ভাগই ভায়া দিল্লি। দিল্লিতে হল্ট নিলে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা লেগে যাবে। ভোর ৭ টায় প্রথম ফ্লাইট। এটা ধরতে পারলে দুপুর ২/৩টে নাগাদ খাজুরাহো মন্দির সংলগ্ন হোটেলে পৌঁছে যাবেন। মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের গেস্টহাউসেও থাকতে পারেন বা কোনো বেসরকারি হোটেলে। এয়ারপোর্টে লাঞ্চ সেরে হোটেলে ফিরে ঘণ্টা দু’-তিনের বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যাবেলাটা চমৎকার কাজে লাগানো যাবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস