Alexa যে সব কাজ ঈমানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ

ঢাকা, বুধবার   ১৭ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ২ ১৪২৬,   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

যে সব কাজ ঈমানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৪ ৭ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৯:৪২ ৭ জুলাই ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ঈমান মুমিনের জীবনে অমূল্য সম্পদ। ঈমানের সমকক্ষ হতে পারে এমন কোনো বস্তু এই জগতে নেই। বান্দার ঈমান বৃদ্ধির যেমন উপায় আছে। তেমনি কারো ইমান দুর্বল বা শেষ হয়ে যাওয়ারও কারণ আছে। 

নিম্নে কোরআন ও হাদিস থেকে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে, যা করলে বান্দার ঈমান চলে যেতে পারে বা দুর্বল হয়ে যাবে।

খিয়ানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা: 
সাহাবির নাম হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.)। যার উপাধি ছিলো ‘খাদেমে রাসূলুল্লাহ’ বা রাসূলের খাদেম। তিনি দীর্ঘ দশ বছর নবী করীম (সা.) এর খেদমত করেছেন। তিনি বলেন, খুব কম সময় এমন হয়েছে যে, রাসূল (সা.) আমাদেরকে কোনো বিষয়ে নসীহত করেছেন আর এই কথা বলেননি যে, ওই লোকের ঈমান নেই যার ভেতর আমানতদারী নেই। ওই লোকের দ্বীন নেই যার ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুণ নেই।’ (বাইহাকী, শুয়াবুল ইমান)।

আরো পড়ুন>>> পতাকার রঙে রঙিন হলো মসজিদ

সিরাতের কিতাব সমূহে প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূল (সা.)-কে এক লোক কিছু দেয়ার কথা বলে ঘরে যায়। কিন্তু সে ঘরে গিয়ে রাসূল (সা.) এর কথা ভুলে যায়। আর রাসূল (সা.) ওই জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে। আনুমানিক দু,দিন পর যখন ওই লোক সেখান দিয়ে যাচ্ছিলো রাসূল (সা.)-কে সেখান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের প্রতিশ্রুতির কথা মনে হয়। রাসূল (সা.) তাকে বলেন, তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছ। এর দ্বারা প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। কারণ, রাসূল (সা.) না সরার কারণ ছিলো ওই লোককে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বলেন, এখানে ঈমান নেই অর্থ হচ্ছে পূর্ণ ঈমান নেই। এমন ব্যক্তির ঈমান পরিপূর্ণ নয়। অবশ্য কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেছেন, কারো যদি খেয়ানত বা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা অভ্যাসে পরিনত হয় তাহলে আস্তে আস্তে তা দ্বীনহীন হওয়ার দিকে নিয়ে যায়। তাই ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে নবী করীম (সা.) এই কথা বলেছেন। এ কথাও মেনে নিতে হবে যে, কেউ যদি ওগুলোকে বৈধ ভেবে করে তাহলে ঈমান চলে যাবে। কারণ, শরিয়তে হারাম করা হয়েছে এমন বিষয়কে হালাল মনে করে করলেও ঈমান চলে যায়। এক হাদিসে মুনাফিকের অনেকগুলো আলামতের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম দুটি হচ্ছে, আমানতে খেয়ানত করা ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করা। আল কোরআনের বহু জায়গায় মুমিনের আলামত বলা হয়েছে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলা ও আমানতে খেয়ানত না করা। যেমন সূরা মাআরিজের ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘(মুমিন তারা যারা) আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলে।’ তাই খেয়ানত ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকে ঈমানের পরিপন্থি কাজ সাব্যস্ত করা হয়েছে।

রাগ ইমানকে বিনষ্ট করে: 
প্রত্যেক মানুষের ভেতর আল্লাহ তায়ালা রাগ করার গুণ দিয়ে রেখেছেন। যথাস্থানে রাগান্বিত হওয়াও সওয়াবের কাজ। একবার আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা.) এর পাশে তার এক ভাতিজা ছোট ছোট পাথর দিয়ে খেলা করছিলো। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা.) হাদিসের উদ্বৃতি দিয়ে তাকে উক্ত কাজ থেকে বারণ করলো। ওই বাচ্চা পাথর নিয়ে পুনরায় খেলা শুরু করলে আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা.) রাগ করে বলেন, আমি সামনে কখনো তোমার সঙ্গে কথা বলবো না। কারণ, আমি তোমাকে রাসূল (সা.) এর হাদিসের উদ্বৃতি দিয়ে বারণ করলাম আর তুমি রাসূলের (সা.) হাদিসের কোনো গুরুত্ব দিলে না। মুহাদ্দিসগণ উক্ত হাদিস দিয়ে দলীল দেন যে, দ্বীনের খাতিরে কারো সঙ্গে রাগ করতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে অযথা রাগ করা কোথাও গ্রহণযোগ্য নয়। 

হজরত বাহাজ ইবনে হাকীম (রা.) এর সূত্রে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘রাগ মানুষের ঈমানকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে যেমন মাকাল ফল মধুকে নষ্ট করে দেয়।’ (বাইহাকি শুয়াবুল ইমান)। রাগ ঈমানের জন্য এত ক্ষতিকারকের কারণ হচ্ছে, কারো যখন প্রচন্ড রাগ ওঠে তখন সে আল্লাহর দেয়া সীমা লংঘন করে। এবং এমন কাজ করে বসতে পারে, যার দরুন সে ঈমানের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। এ জন্য করণীয় হচ্ছে, প্রচন্ড রাগের সময় ধৈর্য ধারন করা। এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘প্রকৃত বাহাদুর সে ব্যক্তি নয়, যে মল্লযুদ্ধে কাউকে হারিয়ে দিতে পারে বরং প্রকৃত বাহাদুর তো ওই লোক, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহীহ বোখারী ও মুসলিম)। 

এক লোক নবী করিম (সা.) এর কাছে আবেদন জানালেন আমাকে কিছু উপদেশ দিন! সে রাসূল (সা.) এর কাছে উপদেশের জন্য বারবার আরজি জানাচ্ছিলেন আর রাসূল (সা.) বলছিলেন, রাগ করো না, রাগ করো না। যাদের রাগ বেশি তারা নিজেদের রাগ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বণ করতে পারেন। যেমন রাগের অবস্থায় দাঁড়ানো থাকলে বসে যাওয়া, ওই স্থান ত্যাগ করা, আউজুবিল্লাহ পড়া ইত্যাদি।

জালেমকে সহযোগিতা দ্বারা ইমানের গণ্ডি থেকে বের হওয়ার আশংকা:
জুলুম খুবই ঘৃণ্য একটি কাজ। সহিহ বোখারীসহ হাদীসের একাধিক কিতাবে এসেছে যে, হাশরের ময়দানে অনেক নেক নিয়ে আসার কিছু লোক থাকবে। কিন্তু তারা দুনিয়াতে মানুষের হক নষ্টের কারণে তার নেক দ্বারা ওদের পাওনা পরিশোধ করা হবে। এক পর্যায়ে ওদের নেক শেষ হয়ে যাবে কিন্তু মানুষের পাওনা বাকি থাকবে। তখন পাওনাদারদের গোনাহ এনে তার মাথায় দেয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ইমাম বাইহাকি স্বীয় হাদিস গ্রন্থ শুয়াবুল ইমানে একটি হাদিসে বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাকারী সাহাবি হলেন হজরত আওস ইবনে শুরাহবিল (রা.)। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যে লোক জালেমের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য বের হলো, অথচ সে জানে যাকে শক্তিশালী করছে সে জালেম; তো সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেলো।’ ভেবে দেখা দরকার যে, জালেমকে সহযোগিতার ফলাফল যদি হয় এ রকম তাহলে যে জুলুমে সরাসরি জড়িত তার পরিণাম কী ভয়াবহ হবে! কিন্তু আফসোস! সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে জুলুম বাসা বেঁধেছে। সর্বত্র মজলুমের আহাজারি। আমাদেরকেও মাজলুমের পক্ষে দাঁড়িয়ে ঈমানের পরিচয় দিতে হবে।

ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিপক্ষে কথা না বলা:
মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিজের জীবন রক্ষা পেলেই হচ্ছে। অন্যের জন্য কিছুই করার নেই। গত ২৭ ই জুন পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায়, প্রায় একশ মানুষের উপস্থিতিতে স্ত্রীর সামনে স্বামীকে প্রকাশ্যে খুন করে দুর্বিত্তরা। কিন্তু কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। বেচারি স্ত্রী সন্ত্রাসীদের ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করেও স্বামীকে বাঁচাতে পারেনি। অথচ অন্যায়ের বিপক্ষে কথা বলা ঈমানের অংশ। সহিহ মুসলিম শরীফের হাদিসে এসেছে, নবী করিম (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ অন্যায় হতে দেখলে, সামর্থ্য থাকলে সে যেন হাত দিয়ে তা প্রতিহত করে। এর সামর্থ্য না থাকলে যেন মুখে প্রতিবাদ করে। তাও করা সম্ভব না হলে সে যেন মন থেকে তা ঘৃণা করে। আর এই পর্যায় হচ্ছে ঈমানের সর্বনিম্ন অবস্থা।’ সহীহ মুসলিমের আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘অন্যায় দেখে যে ব্যক্তি ওদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে সে মুমিন আর যে মুখে প্রতিবাদ করবে সে মুমিন। অন্তরে ঘৃণা করা হচ্ছে ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর। যার অন্তরে ঘৃণারও উদ্রেগ হবে না সে মুমিন নয়।’ 

ইসলামের স্প্রীট এখান থেকেই প্রকাশ পায়। আমরা অনেকে মসজিদে পড়ে থাকাকেই মনে করি দ্বীনদারি। হ্যাঁ, ওটাও দ্বীনদারি। তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হওয়া, মাজলুমের পাশে দাঁড়ানোও ঈমানের অঙ্গ। রাসূল (সা.) এক মুমিনের ওপর অন্য মুমিনের হক্ব আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, মাজলুমকে সাহায্য করাও একজনের ওপর আরেকজনের হক। হজরত আবু বকর (রা.) বলেছেন , ‘তোমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে অন্যথায় আল্লাহর আযাব তোমাদের সকলকে গ্রাস করে নিবে।’ তাই মুমিন কখনো অন্যায়ের পক্ষ্য নিতে পারে না বরং সে সর্বদা দারাজ কন্ঠে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা।

আরো যে সকল কাজ ঈমানের জন্য ঝুঁকি: 
এক হাদিসে নবী করিম (সা.) কয়েয়কটি খারাপ কাজকে ঈমানের পরিপন্থি সাব্যস্ত করেছেন। হাদিসটি হজরত আবু হুরাইরা (রা.)  এর সূত্রে বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘কোনো মুমিন যখন ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তখন সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরিতে লিপ্ত হয় তখন সে মুমিন থাকে না, মদখোর যখন মদপানে লিপ্ত হয় তখন সে মুমিন থাকে না, এ রকম লুণ্ঠনকারী যখন লুণ্ঠনে লিপ্ত হয় তখন সে ঈমানদার থাকে না.... অতএব তোমরা এগুলো থেকে বিরত থেকো, তোমরা এগুলো থেকে বিরত থেকো।’ (সহীহ বোখারী, মুসলিম)। 

এ রকম হাদিস হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর সূত্রেও সহিহ বোখারী ও মুসলিম বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনায় এর সঙ্গে অন্যায়ভাবে হত্যার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ যখন অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে তখন সে মুমিন থাকে না। উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় কয়েকটি মত পাওয়া যায়। যেমন কারো কারো মতে এখানে মুমিন না হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিপূর্ণ মুমিন নয়। একটি মত এমনও আছে যে, যখন মানুষ এগুলোতে লিপ্ত হয় তখন ঈমান উপরের দিকে ওঠে যায়। যখন খারাপ কাজ থেকে বিরত হয় তখন ঈমান ফিরে আসে। তবে এখানেও ওই কথা যে, কেউ যদি হালাল মনে করে একাজ করে তাহলে সে ঈমান হারা হয়ে যাবে। আর অভ্যাসে পরিণত হলে মৃত্যুর আগে ঈমান হারা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তাই এ সকল কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকা চাই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে