যে কারণে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৌসুমী ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরেই হয়

ঢাকা, মঙ্গলবার   ০২ জুন ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৯ ১৪২৭,   ০৯ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

যে কারণে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৌসুমী ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরেই হয়

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২২:৪৬ ১৯ মে ২০২০  

বঙ্গোপসাগর

বঙ্গোপসাগর

বঙ্গোপসাগরের তটরেখাকে ঘিরে প্রায় ৫০ কোটি মানুষের বাস।একেক মৌসুমে একেক রুপে সাজে এই বিস্তীর্ণ জলরাশি। জানুয়ারিতে এর রূপ থাকে একদম শান্ত এবং নীল। আর একেবারে ভিন্ন রূপ ধারণ করে গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে। সারাক্ষণই ফুঁসতে থাকে এই ঘোলা জলের সমূদ্র। অনেকেরই মনের আনন্দের ও প্রশান্তির একমাত্র খোরাক এই বিশাল সমুদ্র।

বিশ্বের ইতিহাসে অনেকবার ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হেনেছে। জানেন কি, পৃথিবীতে যতসব ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হেনেছে, তার বেশিরভাগই হয়েছে এই বঙ্গোপসাগরে।

বিশ্বের ৩৫টি সবচাইতে ভয়ংকর মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের তালিকা রয়েছে ‌'ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড‌' নামের একটি ওয়েবসাইটে। আর এই তালিকার ২৬টি ঘুর্ণিঝড়ই হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। এবার হতে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় আম্ফাম। আশংকা করা হচ্ছে, এটি বুধবার বিকেল নাগাদ বাংলাদেশ এবং ভারতের উপকূলে আঘাত হানবে। আর এবারে এটি হবে ২৭তম ঘূর্ণিঝড়।

ভারতের আবহাওয়া দফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত হানার সময় ভয়ংকর শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঘন্টায় ১৯৫ কিলোমিটার (১২১ মাইল) বেগে বাতাসের সর্বোচ্চ গতি থাকবে। আর  প্রায় দোতলা বাড়ির উচ্চতায় জলোচ্ছাস হবে।

নিশ্চয়ই প্রশ্ন থাকতে পারে বঙ্গোপসাগরে কেন এত বেশি ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় হয়? চলুন এই বিষয়ে জেনে নেয়া যাক বিস্তারিত- 

আবহাওয়াবিদদের মতে, সামূদ্রিক জলোচ্ছাস সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠে অবতল আকৃতির অগভীর উপসাগরে। মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের তীব্র বাতাস যখন এরকম জায়গায় সাগরের পানিকে ঠেলতে থাকে, তখন ফানেল বা চোঙার মধ্যে তরল যে আচরণ করে, এখানেও তাই ঘটে। সাগরের ফুঁসে উঠা পানি চোঙা বরাবর ছুটতে থাকে।

আবহাওয়াবিদ এবং ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ডের একজন লেখক বব হেনসন বলছেন, এই রকম ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের টেক্সটবুক উদাহারণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগর।  

তবে ভারতের আবহাওয়া দফতরের প্রধান ডি. মহাপাত্র বলছেন, বঙ্গোপসাগরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরো বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন সমূদ্রের উপরিতল বা সারফেসের তাপমাত্রা। যা পরিস্থিতিকে আরো বেশি বিপজ্জনক করে তোলে। তিনি আরো বলেন, বঙ্গোপসাগর খুবই উষ্ণ এক সাগর।

লুইজিয়ানার গালফ কোস্টের মতো পৃথিবীর নানা অঞ্চলে আরো অনেক উপসাগর আছে। সেখানেও উপকূল বরাবর এই ধরনের জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি আছে। 

তবে বব হেনসন বলছেন, বিশ্বের অন্য যে কোনো উপকূলের চাইতে বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূল এই ধরনের সার্জ বা জলোচ্ছ্বাসের সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে আছে। আর এই উপকূলজুড়ে এমন ঘনবসতি ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেখা যায়, বিশ্বের প্রতি চারজন মানুষের একজন বঙ্গোপসাগর উপকূলের দেশগুলোতে থাকে।

আম্ফাম নিয়ে এত বেশি উদ্বেগের কারণ

বঙ্গোপসাগরে জেলেদের সতর্ক হওয়ার দৃশ্য এই উদ্বেগের প্রধান কারণটি হচ্ছে এটি একটি ‌'সুপার সাইক্লোন‌'। এই ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতি হবে প্রতি ঘন্টায় ১৩৭ মাইল বা ২২০ কিলোমিটারের বেশি। তাছাড়া সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় বহু ধরনের বিপদ নিয়ে আসে। যেমন- 

> প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে।

> ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে সামূদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসবে। আর ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে প্রচন্ড ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হবে, যাতে বন্যা দেখা দেবে।

বঙ্গোপসাগরে বা আরব সাগরে অনেক ঘূর্ণিঝড় হয়। তবে প্রতি দশ বছরে সব ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে মাত্র একটি হয়তো এরকম প্রচন্ড ক্ষমতা বা শক্তির ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।

১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে বিশ্বের ইতিহাসের সবচাইতে প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল বাংলাদেশে। যা ভোলায় আঘাত হেনেছিল। প্রায় ৫ লাখ মানুষ এতে প্রাণ হারিয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড়ের সময় যে জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল তার উচ্চতা ছিল ১০ দশমিক ৪ মিটার বা ৩৪ ফুট।

ডক্টর সুনিল অমৃত একজন ইতিহাসবিদ। তিনি হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। তিনি বলছেন, বঙ্গোপসাগরে সাম্প্রতিক সময়ে আরো বেশি ঘনঘন প্রচণ্ড মাত্রার ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে।

২০০৮ সালের মে মাসে বার্মার উপকূলে আঘাত হেনেছিল সাইক্লোন নার্গিস। সেই সাইক্লোনে অন্তত ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল এবং ২০ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছিল।

একজন সাংবাদিক এই ঘূর্ণিঝড়ের বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে- মনে হচ্ছে যেন কাগজের ওপর আঁকা একটি ছবির ওপর কেউ এক বালতি পানি ঢেলে দিয়েছে। অনেক যত্ন করে আঁকা লাইনগুলো (বদ্বীপের নদীপথ) মুছে গেছে। যে কাগজের ওপর ছবিটি আঁকা হয়েছিল সেটি যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেছে।

তিনি আরো বলেন, ১৯৯৯ সালে ভারতে সর্বশেষ কোনো সুপার সাইক্লোন আঘাত হেনেছিল। তখন উড়িষ্যা রাজ্যে প্রায় দশ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ঐ সাইক্লোনের পর আমি উপদ্রুত এলাকায় গিয়েছিলাম। ঘুরে বেরিয়েছিলাম সবচাইতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো।

আমার মনে আছে, খাদের মধ্যে পড়ে ছিল পঁচা-গলা লাশ। নিহতদের শবদেহ যখন চিতায় পোড়ানো হচ্ছিল তখন। আকাশ যেন ঢেকে গিয়েছিল চিতার আগুনের ধোঁয়ায়। বঙ্গোপসাগরের সুপার সাইক্লোনের অবারিত ক্রোধ কতটা বিধ্বংসী হতে পারে, সেটা আমি তখন প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ