যে কারণে আত্মহত্যা করে স্কুলছাত্রী বর্ষা

ঢাকা, বুধবার   ১৯ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ৫ ১৪২৬,   ১৪ শাওয়াল ১৪৪০

যে কারণে আত্মহত্যা করে স্কুলছাত্রী বর্ষা

রাজশাহী প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১৬ ১৯ মে ২০১৯  

শ্লীলতাহানির বিচার না পেয়ে রাজশাহীর মোহনপুরে স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আক্তার বর্ষা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার করেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উপজেলার বিলপাড়া গ্রামের নিজ কক্ষে বর্ষা গলায় ফাঁস দেয়। আত্মহত্যার পর শুক্রবার এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়।

বর্ষা উপজেলার বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ২৩ এপ্রিল বর্ষাকে তার বান্ধবীর মাধ্যমে শহরে নিয়ে শ্লীলতাহানি করে মুকুল নামে এক যুবক। তবে এ ঘটনায় পুলিশ মামলা না নিয়ে বিষয়টি আপসের চেষ্টা করে। মুকুল ও তার সহযোগীদের আটক করলেও পুলিশ ছেড়ে দেয়। এতে বিচার না পেয়ে ও থানায় মামলা করতে না পেরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে বর্ষা। সন্ধ্যায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এসপি মো. শহিদুল্লাহ। বর্ষাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করায় গ্রেফতার করা হয়েছে মুকুল, সোনিয়া ও নাঈমকে। শুক্রবার বিকেলে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

উপজেলা সদরের আবদুল মান্নান চাঁদের মেয়ে বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আকতার বর্ষা গত ২৩ এপ্রিল বাড়ি থেকে প্রতিবেশী শরিফুল ইসলামের মেয়ে সহপাঠী সোনিয়ার সঙ্গে প্রাইভেট পড়তে যায়। তার প্রাইভেট পড়তে যাওয়া আসার পথে এলাকার কাজলের ছেলে মুকুল তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিতো। তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সে বর্ষার বান্ধবী সোনিয়ার মাধ্যমে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল।

২৩ এপ্রিল প্রাইভেট শেষে বান্ধবী সোনিয়া বর্ষাকে নিয়ে খানপুর বাগবাজার এলাকায় যায়। সেখানে অচেতন হয়ে পড়ে বর্ষা। তখন লোকজন তাকে উদ্ধার করে। তবে লোকজনের কাছ থেকে মুকুল তাকে (বর্ষা) শহরে নিয়ে যেতে চায়। খবর পেয়ে বাড়ির লোকজন বর্ষাকে উদ্ধার করে। এরপর তাকে প্রথমে মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবে খানপুর বাগবাজার এলাকায় কেন বা কিভাবে বর্ষা অচেতন হয় তা জানা যায়নি।

এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ ২৪ এপ্রিল মুকুলকে আটক করে। তবে ওইদিন রাতে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। একইদিন আটক করা হয় মুকুলের সহযোগী শিবপুর গ্রামের শফিকের ছেলে নাঈমকে। তাকেও ছেড়ে দেয়া হয়।

বর্ষার বাবা আবদুল মান্নান বলেন, মেয়েকে সোনিয়ার মাধ্যমে অপহরণ করে শহরে নিয়ে শ্লীলতাহানি করে মুকুল। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি। আপোষের কথা বলে আসামিদের আটকের পর ছেড়ে দিয়েছে। এতেই ক্ষোভে-অভিমানে তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। ঘটনার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে বর্ষাকে আজ মরতে হতো না। আত্মহত্যার আগেই পুলিশের কাছে অপহরণের মামলা করতে যাই। মোহনপুর থানার ওসি আবুল হোসেন মামলা করতে দেননি। উল্টো চারদিন গভীর রাত পর্যন্ত আটকে রেখে হয়রানি করেছেন। আমরা এসপির কাছে যাবো তিনি আগেই জানতে পেরেছেন। এরপর থেকে আমাদের প্রতিদিন থানায় আটকে রাখেন। একদিন ওসিকে বলি, যদি মামলা না নেন, তো বলে দেন। হয়রানি কেন করছেন? একথা বলতেই ওসি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, পিটিয়ে দাঁত-মুখ ভেঙে দেব। এরপর মোহনপুরের সাবেক ইউএনও বর্তমানে এডিসি আলমগীর কবীরকে বিষয়টি ফোনে জানাই। তিনি জেলা এসপিকে জানান। পুলিশ সুপার বর্ষাকে নিয়ে যেতে বললে তাকে সব খুলে বলি। এরপর ওসি থানায় মামলা নেন। তবে তিনি ধর্ষণের অভিযোগ বাদ দেন। ওসি বলেন, মেডিকেল রিপোর্ট ছাড়া ধর্ষণের মামলা নেয়া যাবে না। সঠিক সময়ে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিলে বর্ষাকে হয়তো বাঁচানো যেত।

এ বিষয়ে ওসি আবুল হোসেন দাবি করেন, তিনি কোনো হয়রানি করেননি। মারধর করতেও চাননি। তার প্রচেষ্টাতেই মুকুলসহ চার আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে।

বর্ষার মা ফরিদা বেগম বলেন, বর্ষা বাড়ি ফিরে তাদের জানায়, সহপাঠী সোনিয়া তাকে প্রাইভেট পড়ার জন্য ডেকে নিয়ে যায়। পরে সে রুমাল দিয়ে তার নাক ধরে। এরপর বর্ষা অচেতন হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরে সে নিজেকে বাড়ি থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে বাগবাজার এলাকায় দেখতে পায়। নিজের শরিরে থাকা জামার বদলে অন্য জামা দেখতে পায়। তার পাশে তখন অভিযুক্ত মুকুল ও দেলোয়ার নামের একজন ভ্যানচালক ছিল। তবে পুলিশ অপহরণ মামলায় দেলোয়ারকে আসামি করেনি। জামা বদল থাকায় ধারণা করা হচ্ছিল, তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ২৭ এপ্রিল মামলার পর মুকুলকে গ্রেপ্তার করা হলে শুরু হয় চরম গালাগাল ও হুমকি। আসামিরা বাড়ি এসে মেয়েদের এসিড নিক্ষেপের হুমকি দেয়। অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। গত বৃহস্পতিবার গোসল করতে গেলে বর্ষাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দেয়া হয়। এতে অভিমানে মেয়েটি আত্মহত্যা করে।

মোহনপুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সানজিদা রহমান রিক্তা বলেন, একটি মেয়ে মারা গেলেও আরও দুই মেয়ে নিয়ে চরম আতঙ্কে আছেন বর্ষার বাবা। তাদের নিরাপত্তা ও অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের এমপি আয়েন উদ্দীন বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ও দায়িত্বে অবহেলাকারীদের শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।

বর্ষার আত্মহত্যার ঘটনায় ১৩ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন তার বাবা। পুলিশ এ মামলায় তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। আসামি মুকুল কারাগারে থাকলেও অন্য আসামিরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। আসামি সোনিয়া আদালত থেকে জামিন নিয়ে পরিবারসহ পালিয়েছে। শনিবার দুপুরে তাদের বাড়িতে তালা ঝুলতে দেখা যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম