যেমন ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের জেল জীবন

ঢাকা, শুক্রবার   ২৯ মে ২০২০,   জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৭,   ০৫ শাওয়াল ১৪৪১

Beximco LPG Gas

যেমন ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের জেল জীবন

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৭:১৮ ১৮ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৭:১৯ ১৮ মার্চ ২০২০

কাজী নজরুল ইসলাম

কাজী নজরুল ইসলাম

বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তার কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তার প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে। তাইতো তাকে বলা হয় "বিদ্রোহী কবি"।

কবি কাজী নজরুল ইসলামকবি কাজী নজরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় বৈরীপক্ষ ছিল বৃটিশ শাসকপক্ষ। সত্যের পক্ষে ও শোষিত মানুষের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে নজরুল বৃটিশরাজের রোষানলে পড়ে জেল খেটেছেন। তার যুগবাণী, বিষের বাঁশি, ভাঙ্গার গান, প্রলয় শিখা ও চন্দ্রবিন্দুসহ মোট পাঁচটি গ্রন্থ বৃটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে। বাংলা সাহিত্যে সমকালীন অন্য কোনো কবি বা সাহিত্যিকের এত গ্রন্থ একত্রে কখনো বাজেয়াপ্ত হয়নি। নজরুলের বৃটিশ রোষানলে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো তিনিই প্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা উচ্চারণ করেন।

সংগীতজ্ঞ কাজী নজরুল ইসলাম ১৯২২ খৃস্টাব্দের ১১ আগস্ট নজরুল সম্পাদনা করেন অর্ধ সাপ্তাহিক পত্রিকা “ধূমকেতু”। এই পত্রিকায় ১২ সংখ্যায় ১২ সেপ্টেম্বর ১৯২২ খৃস্টাব্দে “আনন্দময়ীর আগমন” নামক একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় নজরুলের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম রাজদ্রোহের মামলা শুরু হয়। ১৯২২ খৃস্টাব্দের ৮ নভেম্বর রাজদ্রোহের অপরাধে নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি হয়। দেশদ্রোহিতার অপরাধে নজরুলের বিচার হয়েছিল কলকাতার আলীপুর চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে সুইনহোর আদালতে। পরবর্তীতে এই মামলার রায়ে ১৯২৩ খৃস্টাব্দের ১০ জানুয়ারি নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। রায় ঘোষণার পরের দিন তাকে আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কারাবরণ করে নজরুল সমগ্র দেশবাসীর নিকট শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তার “বসন্ত” নাটকটি কবির নামে উৎসর্গ করেন। দিনটি ছিল ১৯২৩ খৃস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি।

পরিবারের সঙ্গে বিদ্রোহী কবি ১৯২৩ খৃস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল নজরুলকে আলীপুর সেন্ট্রাল জেল হতে হুগলী জেলে স্থানান্তর করা হয়। হুগলী জেলে নজরুলকে বিশেষ শ্রেণির কয়েদীর মর্যাদার পরিবর্তে সাধারণ শ্রেণির কয়েদীর অবস্থানে নামিয়ে দেয়া হয়। হুগলী জেলসুপার মিস্টার আর্সটন জেলে রাজবন্দীদের সঙ্গে অমানবিক নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার করতেন। এই সময়ই নজরুল তার বিখ্যাত ”শিকল পরার গান” জেলে বসেই রচনা করেন। পায়ে ডান্ডা বেড়ী, ভাতের বদলে মাড় ভাত ও রাজবন্দীদের নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে নজরুল ১৯২৩ খৃস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল হুগলী জেলে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। কবি দিনের পর দিন অনশন চালিয়ে যেতে থাকেন। জেলখানার বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে নজরুল এই অনশন শুরু করেন।

পরিবারের সঙ্গে বিদ্রোহী কবি সে সময় নজরুলের জেল জীবনের করুণ মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেন কলকাতার আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকা। নজরুলের সঙ্গে জেলে মৌলভী সিরাজউদ্দীন এবং বাবু গোপাল চন্দ্র সেনও অনশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অনশনের কয়েকদিনের মধ্যেই নজরুলের প্রবল জ্বর ও অনাহারে শরীরের ওজন প্রায় ১৩ কেজি কমে যায়। এভাবে নজরুলের অনশন অতিবাহিত হয় ৩৯ দিন। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং নজরুলকে চিঠি লিখে অনুরোধ জানান অনশন ভঙ্গ করার জন্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে তাকে এই মর্মে টেলিগ্রাম পাঠান যে Give up hunger strike. Our Literature claims you. অবশ্য জেল কর্তৃপক্ষ Address is not found লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট টেলিগ্রামটি ফেরত পাঠান। জেল কর্তৃপক্ষের প্রকৃত ঠিকানা জানা ছিল। তারা ইচ্ছে করেই টেলিগ্রামটি সেখানে না পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট ফেরত পাঠান। রবীন্দ্রনাথ এ ঘটনায় দারুণ মর্মাহত হন।

অনেকের মধ্যে বিদ্রোহী কবি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও নজরুলের অনশনে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি শিবপুর থেকে ১৯২৩ খৃস্টাব্দের ১৭ মে হুগলী জেলে গিয়ে নজরুলের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণে তিনি দেখা করতে না পেরে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে আসেন। চুরুলিয়া থেকে নজরুলের মা’ যায়েদা খাতুন আসেন হুগলী জেলে নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু তিনিও দেখা করতে পারেননি। এ সংবাদে সমগ্র দেশবাসী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অতঃপর শেষ পর্যন্ত অনশনের ৩৯ দিন পর কুমিল্লার মাতৃসম বিরজা সুন্দরী দেবীর অনুরোধে তারই হাতে লেবুর রস পান করে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম অনশন ভঙ্গ করেন।

বিদ্রোহী কবিকে খাবার খাওয়ানোর দৃশ্য  তিনি ছিলেন কখনো রাজনীতিবিদ, কখনো কবি, বৃটিশদের কাছে তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বার বার কারাভোগ করেছেন, নির্যাতিত হলেও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, পিছিয়ে আসেননি কখনোই। তাইতো "বিদ্রোহী কবি"-র জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে উভয় বাংলাতে প্রতি বৎসর উদযাপিত হয়ে থাকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ