যেভাবে তৈরি হয়েছে ‘কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার’

ঢাকা, বুধবার   ০৮ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২৬ ১৪২৬,   ১৫ শা'বান ১৪৪১

Akash

যেভাবে তৈরি হয়েছে ‘কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার’

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৪:১৮ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একুশে ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। এদিনে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে দেখা যায় গোটা বাঙালি জাতিকে এক হতে। ভাষা শহিদ আর ভাষা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যেই আজকের দিনে সবার এক হওয়া।

এই শহিদ মিনার ৬৮ বছর আগে ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গ করা বীর বাঙালির এক অনুপম নিদর্শন। তবে ভাষা নিয়ে সংগ্রাম যেমন একদিনে শেষ হয়নি, তেমনি আজকে যে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনেও রয়েছে ইতিহাস।

১৯৫২ সালের এই দিনে ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তুললে সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। শহিদ হন সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক।

প্রথম শহিদ মিনারভাষা শহিদদের সেই স্মৃতি ধরে রাখতে খুব দ্রুতই গড়ে তোলা হয় প্রথম শহিদ মিনার। ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) শিক্ষার্থীরা ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু করে রাতের মধ্যেই শেষ করেন। সে খবর পাঠানো হয় গণমাধ্যমে। দৈনিক আজাদে ছাপা হয় শহিদ মিনারের খবর। শিরোনাম ছিল— ‘শহীদ বীরের স্মৃতিতে’।

ঢামেক ছাত্র হোস্টেলের (ব্যারাক) ১২ নম্বর শেডের পূর্ব প্রান্তে মিনারটি তৈরি হয় কোণাকুণিভাবে হোস্টেলের মধ্যবর্তী রাস্তার গা-ঘেঁষে। উদ্দেশ্য ছিল, বাইরের রাস্তা থেকে যেন সহজেই চোখে পড়ে এবং যেকোনো শেড থেকে বেরিয়ে এসে ভেতরের লম্বা টানা রাস্তাতে দাঁডালেই চোখে পড়ে।

প্রথম সেই শহিদ মিনারটি ছিল ১০ ফুট উঁচু, ৬ ফুট চওড়া। মিনার তৈরির তদারকিতে ছিলেন জি এস শরফুদ্দিন (ইঞ্জিনিয়ার শরফুদ্দিন নামে পরিচিত), ডিজাইন করেছিলেন বদরুল আলম। সঙ্গে ছিলেন সাঈদ হায়দার। তাদের সহযোগিতা করেন দু’জন রাজমিস্ত্রী।

প্রথম শহিদ মিনার উদ্বোধনঢাকা মেডিকেলের ভবন সম্প্রসারণের জন্য জমিয়ে রাখা ইট, বালি ও পুরান ঢাকার পিয়ার সর্দারের গুদাম থেকে আনা সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয় সেই স্মৃতির মিনার। ভোর হওয়ার পর একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় সেটি। ওই দিনই, অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে শহিদ শফিউরের পিতা অনানুষ্ঠানিকভাবে শহিদ মিনারটি উদ্বোধন করেন। পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে শহিদ মিনার উদ্বোধন করেন আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন।

তবে স্থায়িত্ব পায়নি ভাষা শহিদদের স্মরণে তৈরি প্রথম সে মিনারটি। আজাদ সম্পাদকের উদ্বোধনের দিনই পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঢাকা মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং প্রথম শহিদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর ঢাকা কলেজেও একটি শহিদ মিনার তৈরি করেন শিক্ষার্থীরা। কিছুদিনের মধ্যে সেটিও সরকারের নির্দেশে ভেঙে ফেলা হয়।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারঅবশেষে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়ার পর শুরু হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নির্মাণের কাজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ছিল সেই শহিদ মিনার নির্মাণের তত্ত্বাবধানে।

১৯৫৬ সালে আবু হোসেন যখন মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে, ওই সময় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বর্তমান স্থান নির্বাচন করা হয়। ওই সময়ের পূর্ত সচিব (মন্ত্রী)  আবদুস সালাম খান মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য চূড়ান্তভাবে স্থান নির্বাচন করেন।

১৯৫৬ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকারের এক মন্ত্রীর হাতে শহিদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্ত স্থাপনের কথা জানায় সরকার। তবে উপস্থিত জনতার প্রবল আপত্তির মুখে তিনি পিছু হটতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহিদ রিকশাচালক আওয়ালের ছয় বছরের মেয়ে বসিরনকে দিয়ে এ স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রাস্ত স্থাপন করা হয়।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারশেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ১৯৫৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ওই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের সবখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে। এরপরই মূলত শহিদ মিনারের নতুন স্থাপনা নির্মাণ সহজ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমান মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজাড়িত শহিদ মিনারের স্থপতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। তারই রূপকল্প অনুযায়ী ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে তার সঙ্গে যোগ দেন আরেক বিখ্যাত ভাস্কর নভেরা আহমেদ। তাদের দু’জনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সংশোধিত আকারে শহিদ মিনারের নির্মাণ কাজ কাজ শুরু করা হয়। এ নকশায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের সম্মুখভাগের বিস্তৃত এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারকেন্দ্রীয় এই শহিদ মিনারের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ সালের শুরুর দিকে। ওই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম শহিদ আবুল বরকতের মাতা হাসিনা বেগমের হাতে উদ্বোধন করা হয় নতুন শহিদ মিনার। সেই থেকে এই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটিই বাঙালির আবেগ-অনুভূতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে চিরজাগরুক হয়ে রয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ