Alexa যেভাবে কিংবদন্তি রাজাধিরাজ

ঢাকা, শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৫ ১৪২৬,   ২০ মুহররম ১৪৪১

Akash

রাজ্জাক

যেভাবে কিংবদন্তি রাজাধিরাজ

 প্রকাশিত: ০০:২৮ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৬:২৩ ১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত রাজা সোনালি যুগের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজাধিরাজ রাজ্জাক

চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত রাজা সোনালি যুগের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজাধিরাজ রাজ্জাক

লচ্চিত্রের অবিসংবাদিত রাজা সোনালি যুগের কিংবদন্তি অভিনেতা রাজাধিরাজ রাজ্জাক। টানা পাঁচ দশক দক্ষ কর্মযজ্ঞ দিয়ে দেশীয় চলচ্চিত্রের ভাণ্ডারকে পরিপূর্ণ করে রেখেছিলেন এই নায়করাজ। বিনিময়ে চলচ্চিত্র প্রেমীদের কাছে পেয়েছেন অফুরন্ত ভালোবাসা। তাছাড়া রাষ্ট্রও তাকে কাজের স্বীকৃতি ও যথাযথ সম্মান দিয়েছে। 

গতকাল তার চলে যাওয়ার এক বছর পালন করলো এফডিসি। তবে একটু দেরিতে করেছে এই আয়োজন। কারণ ওই সময় ঈদের আমেজে নায়করাজের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠান পালন করতে পারেননি তারা। তাই ছুটি কাটিয়ে রাজাধিরাজের দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি। 

এর আগে, গত বছরের ২১ আগস্ট কোটি ভক্তকে চোখের জলে ভাসিয়ে পরপারে চলে যান চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তার স্মৃতির প্রতি রইলো ডেইলি বাংলাদেশ পরিবারের বিনম্র শ্রদ্ধা। 

এদিকে তিনি নায়করাজ নামে সুপরিচিত হলেও তার আসল নাম আব্দুর রাজ্জাক। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে থাকাবস্থায় সরস্বতী পূজার সময়ে মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। এতে তার গেম-টিচার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাকে বেছে নেন নায়ক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় চরিত্রে। 

শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা ‘বিদ্রোহী’ নামের ঐ নাটকে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়করাজের অভিনয়ে পথচলা। তিনি ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন। তারো আগে রাজ্জাক পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হন।

নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এই অভিনেতা আব্দুল জব্বার খানের সঙ্গে সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। এরপর সালাউদ্দিন প্রোডাকশনের ‘১৩ নাম্বার ফেকু অস্তাগর লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সবার কাছে নিজ মেধার পরিচয় দেন রাজ্জাক। পরবর্তীতে ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরি স্টিশন’সহ আরো কয়েকটি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ও করে ফেলেন তিনি।

নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে নায়করাজের যাত্রা জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবি দিয়ে। এতে তার বিপরীতে ছিলেন অভিনেত্রী সুচন্দা। প্রযোজক হিসেবে তার যাত্রা হয় ‘রংবাজ’ ছবিটির মাধ্যমে। এটি পরিচালনা করেছিলেন জহিরুল হক। এতে রাজ্জাকের বিপরীতে ছিলেন নায়িকা কবরী। 

তাছাড়া ববিতার সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘অনন্ত প্রেম’ ছবির মাধ্যমে প্রথম নির্দেশনায় আসেন নায়করাজ। এই ছবিটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। নায়ক হিসেবে এ অভিনেতার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ছিলো শফিকুর রহমান পরিচালিত ‘মালামতি’। এতে তার বিপরীতে ছিলেন অভিনেত্রী নূতন।

নায়করাজ রাজ্জাক ক্যারিয়ার জীবনে প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বেশ দাপটের সঙ্গেই ঢালিউডের সেরা হয়ে অভিনয় করেন রাজ্জাক। এর মধ্য দিয়েই তিনি অর্জনও করেন নায়করাজ রাজ্জাক খেতাব। তার প্রাপ্তিতে যোগ হয় একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা। এছাড়াও রাজ্জাক জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান।

তার প্রযোজনা সংস্থা রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন থেকে উল্লেখযোগ্য কিছু ছবি নির্মাণ করেছিলেন। এরমধ্যে রয়েছে ‘আকাঙ্ক্ষা’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘পাগলা রাজা’, ‘বেঈমান’, ‘আপনজন’, ‘মৌচোর’, ‘বদনাম’, ‘সৎ ভাই’, ‘চাঁপা ডাঙ্গার বৌ’, ‘জীনের বাদশা’, ‘ঢাকা-৮৬’, ‘বাবা কেন চাকর’, ‘মরণ নিয়ে খেলা’, ‘সন্তান যখন শত্রু’, ‘আমি বাঁচতে চাই’, ‘কোটি টাকার ফকির’ প্রভৃতি।

১৯৭২ থেকে ৮৯ সাল পর্যন্ত রাজ্জাক অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘স্লোগান’, ‘আমার জন্মভূমি’, ‘অতিথি’, ‘কে তুমি’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘প্রিয়তমা’, ‘পলাতক’, ‘ঝড়ের পাখি’, ‘খেলাঘর’, ‘চোখের জলে’, ‘আলোর মিছিল’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘ভাইবোন’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘সাধু শয়তান’, ‘অনেক প্রেম অনেক জ্বালা’, ‘মায়ার বাঁধন’, ‘গুণ্ডা’, ‘আগুন’, ‘মতিমহল’, ‘অমর প্রেম’, ‘যাদুর বাঁশী’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘বন্ধু’, ‘কাপুরুষ’, ‘অশিক্ষিত’, ‘সখি তুমি কার’, ‘নাগিন’, ‘আনারকলি’, ‘লাইলী মজনু’, ‘লালু ভুলু’, ‘স্বাক্ষর’, ‘দেবর ভাবী’, ‘রাম রহিম জন’, ‘আদরের বোন’, ‘দরবার’, ‘সতীনের সংসার’ প্রভৃতি।

অন্যদিকে নায়করাজ সর্বশেষ ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ‘আয়না কাহিনী’ চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তারই সন্তান সম্রাট ও নায়িকা কেয়া। এরপর আর নতুন কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণে তাকে দেখা যায়নি।

ব্যক্তিজীবনে রাজ্জাক ১৯৬২ সালে খায়রুন নেসার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির ঘরে জন্ম নেন রেজাউল করিম (বাপ্পারাজ), খালিদ হোসেইন (সম্রাট), নাসরিন পাশা শম্পা, রওশন হোসেন বাপ্পি ও আফরিন আলম ময়না।

এদিকে, শিল্প-সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে নায়করাজ ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পদক পুরস্কারে ভূষিত হন। শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন মোট পাঁচবার। তাছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পান ২০১৩ সালে। ভূষিত হন বাচসাস পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায়। 

এরপর সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআই