যেন রিপ্রেজেনটেটিভদের আড্ডাখানা!

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল

যেন রিপ্রেজেনটেটিভদের আড্ডাখানা!

হারুন আনসারী, ফরিদপুর ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৮:১৫ ২২ মে ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ফরিদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র ঝিলটুলী ও আলীপুর মহল্লার মধ্যবর্তী দক্ষিণ কালীবাড়িতে অবস্থিত ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল। ১৯১৭ সালে ২৫ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা হাসপাতালটি এখন ১০০ শয্যায় দাঁড়িয়েছে। সময়ের সঙ্গে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও কমেছে এর সেবার মান। হাসপাতালটি যেন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অখড়ায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকের দালালের বিচরণ। 

হাসপাতালটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হওয়ায় রোগ-শোক, বিপদে-আপদে সবার আগে এখানেই ছুটে আসেন শহরবাসী। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ডাক্তার পাওয়া যায় না। এমনই অভিযোগ চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের। এ নিয়ে ক্ষোভেরও শেষ নেই। 

একরামুল ইসলাম নামের এক রোগী বলেন, কয়েকদিন ধরে প্রচণ্ড পেটে ব্যথা। বমিও হচ্ছে। ডাক্তার দেখাতে এসে সকাল থেকে বসে আছি। কিন্তু ডাক্তার নেই।

একরামুলের অভিযোগের সূত্র ধরে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে এক নার্স বলেন, ডাক্তার রাউন্ডে রয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ পর এক ডাক্তার পাওয়া গেলে; তিনি নানা সংকটকে দায়ী করেছেন। 

তিনি জানান, বর্তমানে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তার ও কর্মকর্তা পর্যায়ে পদ রয়েছে ৩৬টি। এর মধ্যে ১৭টি পদই শূন্য। 

হাসপাতালের সার্জারি, চর্ম ও যৌন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ তিনটি শূন্য রয়েছে। সিনিয়র কনসালটেন্টে ছয়টি পদের বিপরিতে রয়েছেন তিনজন। ছয়জন জুনিয়র কনসালটেন্টের মধ্যে কর্মরত আছেন চারজন। চক্ষু ও প্যাথলজি বিভাগে কোনো জুনিয়র কনসালটেন্ট নেই। 

হাসপাতালে কর্মকর্তাদের মধ্যে অ্যানেসথেসিস্ট, প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের একটি করে পদ থাকলেও সেগুলোও শূন্য। সহকারী রেজিস্ট্রার গাইনী, সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে দুটি করে পদ থাকলেও দুটিই শূন্য রয়েছে। ইএমও পদে চারজনের স্থলে দুইজন, সাতজন মেডিকেল কর্মকর্তার জায়গায় কর্মরত আছেন ছয়জন। 

অপরদিকে কর্মচারি পর্যায়ে ১৩৮টি পদের বিপরিতে কর্মরত আছেন ১০৫জন। অর্থাৎ কর্মচারী পর্যায়ে ৩০ ভাগ পদ শূন্য। নার্সিং সুপারভাইজারের চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত দুইজন। স্টোর কিপার, ওয়ার্ড মাস্টার পদে একজন করে থাকার কথা থাকলেও শূন্য রয়েছে। মেডি টেক (ফার্মাসিস্ট) পদে চারজনের স্থলে আছেন একজন। অফিস সহকারী পদে ২০ জনের স্থলে আছেন ১০ জন। বাবুর্চি ছয়জনের জায়গায় আছেন দুইজন। আর পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১৬জনের জায়গায় আছেন আটজন। 

এ হাসপাতালে নৈশ্য প্রহরী পদে কোনো পদ নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, নৈশ্য প্রহরী না থাকায় প্রায়শই এ হাসপাতালে চুরি, ছিনতাইসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে। 

রোগীর এতো ভিড়ের মধ্যেও হাসপাতালে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে গল্প-গুজব করতে দেখা যায় চিকিৎসকদের। রয়েছে দালালের উপদ্রপ। বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন দালাল ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে সক্রিয় রয়েছেন। তারা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের ফটকে জড়ো হয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীদের ভাগিয়ে নিয়ে যান। 

সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। 

হাসপাতালের শিশু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শতাধিক শিশুকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন অভিভাবকরা। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এসব রোগীর জন্য এক মিনিট সময় দিতে পারছেন না। লাইন ধরে রোগী যাচ্ছে, মুখে মুখে রোগের বর্ণনা শুনেই ব্যবস্থাপত্র লিখে দিচ্ছেন ডাক্তারের সহকারীরা। একথা স্বীকার করে হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, এ ব্যাপারে র্যাীব বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিশেষ অভিযান পরিচালনা হওয়া জরুরি। আদালতের মাধ্যমে দালালদের শাস্তি দেয়া হলে কিছুদিন নিরাপদে থাকা যেতো। 

হাসপাতালের কয়েকজন সিনিয়র চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে হাসপাতালে এসে হাজিরা দিয়ে বের হয়ে যান। সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসক ফিরে এলেও ১১টার মধ্যে তাদের আর হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায় না। 

দুইজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা হাসপাতালের পাশাপাশি ওই সময়ে বিভিন্ন ক্লিনিকে গিয়ে রোগী দেখেন। ক্লিনিক ও হাসপাতালে আসা যাওয়ার মধ্যে দিয়েই তাদের সময় কাটে। কোনো জটিল রোগীকে এ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। এ কারণে মাঝে মাঝে এ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের শয্যাগুলি রোগী শূন্য অবস্থায় দেখা যায়।

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক গনেশ চন্দ্র আগারওয়ালা বলেন, মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার সুযোগ বেশি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতি আধুনিক থাকে। এজন্য সে হাসপাতালে জটিল রোগীদের স্থানান্তরের পরামর্শ দেয়া হয়। 

হাসপাতালের নার্সরা জানান, তাদের দিনে ও রাতের একটি বড় অংশ ডিউটি করতে হলেও তাদের জন্য পৃথক কোনো বাথরুম ও টয়লেট নেই। এ নিয়ে তাদের সমস্যা হচ্ছে। হাসপাতালে বিদ্যুৎ একটি বড় সমস্যা। বিদ্যুৎ না থাকায় অপারেশনের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালটিতে বর্তমানে একটি ফেজের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে তিনটি ফেজ চালু থাকলেও তার চুরি হওয়ার পর তা এখন সম্ভব হচ্ছেনা। 

ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালের পরিচালকের দায়িত্বে নিয়োজিত ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. এনামুল হক বলেন, শতাব্দী প্রাচীন এই জেনারেল হাসপাতালে কিছু সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। তবে ডাক্তার ও জনবলের বিপরীতে রোগীর সংখ্যা অধিক হওয়ায় অভিযোগ শুনতে হয় বেশি। কিছু কিছু চিকিৎসক হাসপাতালে কর্মরত সময়ে বাইরের ক্লিনিক ও হাসপাতালে গিয়ে রোগী দেখেন স্বীকার করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বার বার ওই চিকিৎসকদের সতর্ক করা হয়েছে। হাসপাতালে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এক শ্রেণির চিকিৎসকের প্রশ্রয়েই তারা আসছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/এস