Alexa যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান সরুফা

ঢাকা, সোমবার   ২৬ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ১১ ১৪২৬,   ২৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান সরুফা

 প্রকাশিত: ২০:০৩ ২৮ এপ্রিল ২০১৮  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

সরুফা বেগম। পিতা মো. ছফিউল্লাহ। মাতা মেহেরুন নেছা। পিতা-মাতার ৪ মেয়ে ও ২ ছেলের মধ্যে তিনি চতুর্থ। চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের নোয়াপাড়ায় তার জন্ম।

কুমিল্লার যুদ্ধাহত বীর নারী চৌদ্দগ্রামের সরুফা বেগম। তাকে থানায় নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। থানা থেকে পালিয়ে আসার সময় পাক বাহিনীর ছুঁড়ে দেওয়া গুলিতে তার বাম পা ক্ষত বিক্ষত হয়। সেই ক্ষত নিয়ে বিশেষ এক ধরনের জুতা পরে গত ৪৭ বছর ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সরুফা বেগমের মানবেতর জীবন। পঙ্গু পা নিয়ে গৃহকর্মীর কাজ করে জীবন ধারণ করা এই বীরনারীর ক্ষেদোক্তি, কুমিল্লার প্রশাসন অন্যদের সম্মান করেছে, জমি দিয়েছে, স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু আমি কি অপরাধ করলাম?

ভাইয়ের জায়গায় ছোট একটি ছাপড়া ঘরে বসে এই বীরাঙ্গনার বেদনাবিধুর কথাগুলো  জনান তিনি।

সরুফা বেগম জানান, দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলে প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরুবার আগেই বাবা-মা চৌদ্দগ্রাম বাজার সংলগ্ন কিং শ্রীপুরের ডা. নূর আহমেদের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজে দেন। তিন বেলা খেয়ে, থেকে মাসিক সামান্য যা মজুরি পেতেন তা দিয়ে দরিদ্র পরিবারের সংসারে সহায়তা করতেন। তখন তার বয়স ১০-১১ বছর। বয়সে ছোট হলেও ব্যবহার ও কাজে পারদর্শী বলে অল্প সময়ের মধ্যেই গৃহকর্তাসহ সকলের সুনজরে আসেন। পরিবারের সবাই তাকে অত্যন্ত আদর করতেন।

সরুফা বেগমের এই বাড়িতে চাকরির বছর খানেকের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধ। কিং শ্রীপুর গ্রামটি চৌদ্দগ্রাম থানা সংলগ্ন। তাই এই গ্রামের মানুষ সবসময় ভীত-সন্ত্রস্ত থাকত। সরুফা বেগমের মতে, চৌদ্দগ্রাম থানায় যখনি চাল, ডাল, তরিতরকারির প্রয়োজন হতো তখনি ৪-৫ জন পাঞ্জাবি অস্ত্রসহ বেরিয়ে পড়তো গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায়। মহড়া দেওয়ার নামে তারা দেখতো কোন্ বাড়িতে হাঁস-মুরগী আছে। সুন্দরী মেয়ে-মহিলা আছে। এমনও দেখেছি এই কিং শ্রীপুর থেকে তারা ঘরে ঢুকে ড্রাম থেকে চাউল নিয়েছে। যারা ক্ষেত-খামারে সবজি লাগিয়েছে তাদের বলত, সবজিগুলো থানায় নিয়ে এসো। কোনোদিন  দিতে না পারলে গৃহকর্তাকে মারধর করত কিংবা গালাগলি করে যেত। এ কাজে রাজাকাররাও সহায়তা করত।

সরুফা বেগম ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া তার উপর নির্মম নির্যাতনের বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাটির দিকে তাকিয়ে বলেন, আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাস হবে। আসরের  আজান হয়েছে, এমন সময় গ্রামের মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাঞ্জাবিরা পুরো গ্রামে আক্রমণ শুরু করে।

গ্রামের মানুষরা দৌঁড়াদৌঁড়ি শুরু করেছে। আমি সবেমাত্র ঘর ঝাড়ু দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছি, ঠিক তখনি দেখি ৩-৪ জন আর্মি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। মনে মনে ভাবলাম, আগের দিন ডাক্তার নূর আহাম্মেদ খালুকে মারধর করেছে এ জন্য হয়ত আবার কোনো ঝামেলা হয়েছে তাই আবার আসছে। এতে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু আমার ভুল ভাঙ্গতে দেরি হল না। তারা ঘরে উঠেই কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার চুলের মুঠি ধরে থানায় নিয়ে গেল।

থানায় নিয়ে রাত ১০টা পর্যন্ত একটি কক্ষে আটকে নির্যাতন করল। কত যে বাবা ডেকে ডেকে কেঁদেছি তার  হিসেব নেই। তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে পারিনি নিজেকে। কোনোদিন কল্পনা করি নাই আমার মত কম বয়সের মেয়েকে তারা ধরে নেবে। আমার অভিশাপের কারণেই তাদের উপর আল্লাহর গজব পড়েছে-এ কথা বলেই কেঁদে দেন সরুফা বেগম।

তিনি বলেন, এ দিকে কিং শ্রীপুর গ্রামে আক্রমণ হয়েছে বলে  মুক্তিযোদ্ধারা রাতে থানা আক্রমণ করে বসল। পাঞ্জাবিরাও মুহূর্তেই থানার ভিতর থেকে এলোপাতারি গুলি চালাতে লাগল। আর এ সময় আমার রুমে মেজর আকবর নামে এক বড় অফিসার ছিল। সে অন্য সময়ের মত দরজা বাইরে থেকে না লাগিয়েই রুম থেকে দ্রুত বের হয়ে গেল। আমিও সুযোগ বুঝে দিলাম দৌঁড়। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার বা পায়ের হাঁটুর নিচে বুলেট এসে বিদ্ধ হলো। একে তো  পাকিস্তানি বাহিনীর ৫-৬ ঘন্টার পাশবিক নির্যাতন তার উপর গুলি। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি।তিনদিন পর আমার জ্ঞান ফিরে আসার পর দেখি  একটি হাসপাতালে শুয়ে আছি। সেখানে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনতে পাই। আমার বাম পা কাটা দেখতে পেয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলে বাইরে কথা বলা লোকগুলো ভিতরে এসে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, এখন আর তোমার ভয় নেই। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। তোমাকে আমরা চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছি। এই জায়গার নাম বিলুনিয়া। তুমি কান্না করবে না। তোমাকে আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য আগরতলা পাঠবো।

পরে মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে ভারতের ত্রিপুরায় নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে। সেই থেকে বিজয়ের আগ পর্যন্ত আমি ভারতে ছিলাম। ডিসেম্বর মাসের ২২ বা ২৩ তারিখে পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে দেশে আসি। বাঁ পায়ে গত ৪৭ বছর ধরে এই ফিতাওয়ালা বিশেষ বুট জুতা পরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছি।

সরুফা বেগম আরো বলেন, একদিন আমার গৃহকর্তা ডা. নূর আহাম্মদসহ আরো ৭-৮ জনকে ঘর থেকে ধরে এনে তার উঠানে লাইনে দাঁড় করায় মারার জন্য। তখন আমাদের বাড়িসহ আশপাশের কয়েক বাড়ির মহিলারা উচ্চস্বরে যখন কান্নাকাটি শুরু করে, তখন তারা লাঠি দিয়ে বাড়ি দিয়ে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা না-কি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছে।

সরুফা বেগম আরো বলেন, আমার চোখের সামনে কিং শ্রীপুর গ্রাম থেকে ৭-৮ জন নারীকে চৌদ্দগ্রাম থানায় নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছে। মাত্র একজন বিবাহিত সুন্দরি মহিলাকে থানায় না নিয়ে ঘরেই নির্যাতন করে। সেদিন তাদের জন্য অনেক কান্না করেছি।

সরুফা বেগম বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর  বাড়ি এলে মা বলেছিলেন, আর মানুষের বাড়িতে কাজ করবি না। বিয়ে দিয়ে দেব। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার, একে তো ’৭১-র নির্যাতনের ঘটনা তার উপর আমার এক পা  পঙ্গু। বিয়ের সম্বন্ধ এলেও শেষ পর্যন্ত তা ভেঙ্গে যায়। কাজেই পঙ্গু পা নিয়ে আবার শুরু করি মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝি-র কাজ। এমনি করে কেটে যায় ১৭ বছর।

১৯৮৮ সালে একই উপজেলার পাঁচোরা গ্রামের কবির আহাম্মেদের সঙ্গে বিয়ে হয় সরুফা বেগমের। নানা কারণে ২ বছরের মধ্যেই ভেঙ্গে যায় সেই বিয়ে। সরুফা-কবির দম্পতির ঘরে একটি মেয়ে হয়। জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায় সেই মেয়ে। বর্তমানে স্বামী-সন্তানহীন একাকি জীবন যাপন করছেন এই বীর নারী। অন্যের জায়গায় একটি ছোট্ট ঘর বানিয়ে থাকছেন তিনি। তাও ভাঙ্গা।

তিনি দুঃখ করে বলেন, শুনেছি, কুমিল্লার বর্তমান জেলা প্রশাসক নাকি এবার বীর নারীদের কুমিল্লায় নিয়ে সম্মান জানিয়েছেন এবং জমি দিয়েছে। কিন্তু আমাকে ডাকা হয়নি।  আমি তো শুধু নির্যাতন সহ্য করেছি তা নয়, সারা জীবনের জন্য একটা পা হারালাম। এক মুঠ ভাত খাওয়ার জন্য বুলেটবিদ্ধ পা নিয়ে দ্বারে দ্বারে কাজ করছি। আমার কপালে কি তাহলে  সম্মানটাও জুটবে না?

চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আবুল হাসেম জানান, সরুফা বেগম শুধু বীরাঙ্গনা নয়, তিনি একজন যুদ্ধাহত বীরাঙ্গনা। তিনি চান সরকার যেন তাকে বীর মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ/আরআর

Best Electronics
Best Electronics