যাদের প্রাণ বিসর্জনে আজকের এ একুশ

ঢাকা, রোববার   ২৯ মার্চ ২০২০,   চৈত্র ১৫ ১৪২৬,   ০৪ শা'বান ১৪৪১

Akash

যাদের প্রাণ বিসর্জনে আজকের এ একুশ

ফিচার ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:২০ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২২:০৬ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বাঙালির ‘মা’ শব্দ আবেগের এক মহাসমুদ্র। মায়ের মুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দে রয়েছে আবেগ ও হৃদয়ের তৃপ্তির ছন্দ। বাঙালির সেই আবেগ, ছন্দ কেড়ে নেয়ার দুঃসাহস করল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। বাংলা ভাষার প্রতি সেই সরকারের অবজ্ঞামূলক সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া হয়নি। মায়ের ভাষার সম্মান রক্ষা ও স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি ছাত্র-জনতা। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ও ২২ শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে মিছিলে নেমে আসে ছাত্র-জনতা। এতে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে বিভিন্ন মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। এতে প্রাণ বিসর্জন দেন সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউল, আউয়ালসহ অসংখ্য মাতৃভাষা প্রেমী নায়করা।

৫২’ সালের ২১ ও ২২ শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে প্রাণ বিসর্জন দেয়া সাহসী নায়কদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে ২৬ জন, মতান্তরে ৪০ জন শহীদ হওয়ার খবর শোনা যায়। এর মধ্যে আট শহীদের পুরো ও আংশিক পরিচয় মিলেছে।

আবুল বরকত:

১৯২৭ সালের ১৬ জুন তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভারতের মুর্শিদাবাদের বাবলা ভরতপুরে জন্মগ্রহণ করেন আবুল বরকত। বাবা মৌলভী শামসুজ্জোহা ওরফে ভুলু মিয়া ও মা হাসিনা বিবির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলের মধ্যে বরকত ছিলেন চতুর্থ সন্তান। বরকত বাবলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৪৫ সালে তালিবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ১৯৪৭ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। দেশ ভাগের সময় ১৯৪৮ সালে তার পরিবার ঢাকাতে চলে আসে। বরকত পরিবারসহ ঢাকার পুরান পল্টনের বিষ্ণু প্রিয়া ভবনে বসবাস করতেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের স্নাতকোত্তরের ছাত্র ছিলেন। ৫২’ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে তিনি ছিলেন। মিছিলটি কলেজ হোস্টেলের ১২ নং শেডের বারান্দায় এলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হন বরকত। পরে ওই দিন রাত ৮টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শহীদ হন। ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগের সম্মানে ২০০০ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।

আবদুল জব্বার:

১৯১৯ সালের ১৩ আগস্ট ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার রাওনা ইউপির পাঁচুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল জব্বার। বাবা হাছেন আলী ও মা সফাতুন্নেসার পাঁচ ছেলে এবং দুই মেয়ের মধ্যে আবদুল জব্বার ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। পেশায় গ্রামীণ কর্মজীবী ছিলেন তিনি। শহীদ হওয়ার আগে আবদুল জব্বার নতুন সংসার জীবন শুরু করেন। তার স্ত্রীর নাম ছিল আমেনা খাতুন। আবদুল জব্বার ও আমেনা দম্পতির ঘরে জন্ম নেয় নূরুল ইসলাম বাদল নামের এক শিশু। বাবা আবদুল জব্বার শহীদের সময় বাদলের বয়স ছিল ১৫ মাস। ছেলে জন্মের কয়েকদিন পর শাশুড়ির ক্যানসার ধরা পড়ে। শাশুড়িকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসে থাকা গফরগাঁয়ের হুরমত আলীর কক্ষে উঠেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের একটি মিছিল ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে এলে জব্বার যোগ দেন। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ওই দিন রাতেই তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় শহীদ হন। এদিকে আবদুল জব্বার তৎকালীন আনসার বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। তিনি নিজ গ্রামে আনসার কমান্ডার ছিলেন। তাকেও ভাষা আন্দোলনে আত্মবিসর্জনের সম্মাননা হিসেবে একুশে পদক দেয়া হয়। 

রফিকউদ্দিন আহমদ:

১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের বলধরা ইউপির পারিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রফিকউদ্দীন আহমদ। বাবা আবদুল লতিফ ও মা রাফিজা খানমের তিন ছেলে ছিলেন। এর মধ্যে দুরন্ত ও মেধাবী ছিলেন রফিকউদ্দিন আহমদ। দুরন্তপনা দূর ও মেধা কাজে লাগাতে কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউটে ভর্তি করানো হয়। তবে সেখানে মন টেকেনি তার। দেশে ফিরে আসলে বায়রা হাইস্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। এরপর দেবেন্দ্র কলেজের বাণিজ্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। পরে ভর্তি হন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। জগন্নাথ কলেজের ছাত্রাবাসে থাকতেন রফিকউদ্দিন। ২১ শে ফেব্রুয়ারির সকালের মিছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে এলে পুলিশ গুলি চালায়। এতে মিছিলে থাকা রফিক শহীদ হন। শহীদ রফিকউদ্দিনের আত্মবিসর্জনকে সম্মান জানিয়ে ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদক দেয়া হয়।

রফিকউদ্দিনের ছোট ভাইয়ের নাম খোরশেদ আলম। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

আবদুস সালাম:

১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা থানার মাতৃভূঞা ইউপির লক্ষণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুস সালাম। বাবা মো. ফাজেল মিয়া ও মা দৌলতন নেছার তিন মেয়ে এবং চার ছেলের মধ্যে আবদুস সালাম ছিলেন সবার বড়। তিনি সালাম কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। এরপর তৎকালীন মাতুভূঁই কলিমুল্লাহ মাইনর স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। তারপর তৎকালীন দাগনভূঁইয়া আতাতুর্ক হাইস্কুলে ভর্তি হন। সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তবে অভাবের কারণে তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পর কলকাতায় যান সালাম। সেখানে মেটিয়াবুরুজে বড় বোনের স্বামী আবদুল কাদেরের মাধ্যমে কলকাতা বন্দরে কাজ করেন। দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালে ঢাকায় ফিরে এসে আজিমপুরের ৩৬ বি নং কোয়ার্টারে বসবাস শুরু করেন তিনি। ওই সময় ডাইরেক্টর অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অফিসে রেকর্ড কিপার পদে চাকরি করতেন। ৫২’ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। ওই বছরের ৭ এপ্রিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাতৃভাষা প্রেমিক সালাম শহীদ হন। এ শহীদকে সম্মাননা জানিয়ে ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার।

শফিউর রহমান:

১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার শ্রীরামপুরের কোন্নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শফিউর রহমান। বাবা মাহবুবুর রহমান ও মা কানেতাতুন্নেসার সন্তান ঢাকার হেমেন্দ্র নাথ রোডে বসবাস করতেন। ছাত্র জীবনে মেধাবী শফিউর কলকাতা গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর চব্বিশ পরগনা সিভিল সাপ্লাই অফিসে কেরানির চাকরিতে যোগ দেন। দেশ ভাগের পর ঢাকা হাইকোর্টে কেরানি পদে যোগদান করেন। পাশপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাইভেটের ছাত্র ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার নওয়াবপুর রোডে ২১শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে গুলির প্রতিবাদে মিছিল হয়। সেই মিছিলে যোগ দেন শফিউর। মিছিলটিতে পুলিশ গুলি চালালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শহীদ হন। বাংলাদেশ সরকার ভাষা শহীদ শফিউরের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে।

ভাষা শহীদ শফিউর-আকিলা খাতুন দম্পতির শফিকুর রহমান নামের ছেলে ও আসফিয়া খাতুন নামের মেয়ে আছেন। তারা উত্তরা মডেল টাউনে বসবাস করছেন।

আবদুল আউয়াল:

আনুমানিক ১৯৩৪ সালের ১১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন আবদুল আউয়াল। বাবা মো. আবদুল হাশেম ঢাকার গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা বলে ধারণা করা হয়। আবদুল আউয়াল পেশায় রিকশাচালক ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের জন্য ঢাকার রাজপথ যখন উত্তাল, তখন ঢাকা রেল হাসপাতাল কর্মচারী এলাকায় পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর মোটর গাড়ি তাকে চাপা দেয়। এতে তিনি শহীদ হন।

মো. অহিউল্লাহ:

রাজমিস্ত্রি বাবা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন মো. অহিউল্লাহ। ১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তার জন্ম হয় বলে ধারণা করা হয়। ভাষা আন্দোলনের কারণে উত্তাল ঢাকার রাজপথে ২২ শে ফেব্রুয়ারির মিছিলে যোগ দেন শিশু শ্রমিক অহি। মিছিলটি ঢাকার নবাবপুরের বংশাল রোডের মাথায় এলে পুলিশের গুলিতে তিনি শহীদ হন। পরে তার লাশটি গুম করা হয়।

অজ্ঞাত বালক:

২১ শে ফেব্রুয়ারির ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে শোক মিছিল করা হয়। সেই মিছিলে অজ্ঞাত এক বালক অংশ নেন। ওই মিছিলটি ছত্রভঙ করতে তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনী ট্রাক চালিয়ে দেয়। এতে অজ্ঞাতনামা বালকটি ট্রাকের চাপায় পড়ে শহীদ হন।

ভাষা শহীদদের সংখ্যা আটজনের পুরো ও আংশিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পাকিস্তানের নির্বাসিত লেখক লাল খান ভাষা আন্দোলনের সময় ২৬ জন শহীদ হয়েছেন বলে দাবি করেন। এছাড়া তৎকালীন চট্রগ্রাম জেলা রাষ্ট্রভাষা-সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক মাহবুব উল আলম ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’শিরোনামের কবিতায় ৪০ বা তারও বেশি শহীদের কথা লিখেছেন।

সূত্র-ইন্টারনেট

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকেএ