Alexa যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি

ঢাকা, শনিবার   ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯,   আশ্বিন ৭ ১৪২৬,   ২২ মুহররম ১৪৪১

Akash

যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি

 প্রকাশিত: ১৫:২৪ ২১ জুলাই ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

গণপরিবহন খাতের নৈরাজ্যের ঘটনা নতুন নয়। প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনাম হয় বিষয়টি। এই সমস্যার সমাধান করা যে অপরিহার্য, সেটাও বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের মধ্যদিয়ে সামনে এসেছে। 

গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশেষজ্ঞরা চেঁচামেচি করেন, শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন, অথচ কিছুতেই কিছু হয় না। সংশ্লিষ্টরা কিছুতেই কানে তোলেন না ব্যাপারটি। কিংবা কানে তুললেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে, যেখানে দেশ এগিয়ে চলেছে উন্নয়নের মহাসোপানে, সেখানে যাত্রী সেবা নিশ্চিত এবং পরিবহন খাতে যদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তাহলে এর চেয়ে পরিতাপের আর কি থাকতে পারে! অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, প্রায় দুই কোটি মানুষের শহর মেগাসিটি ঢাকা। এখানে কম বেশি প্রায় সকল নাগরিকই যাত্রী। শুধু ভাড়া নৈরাজ্যই শেষ কথা নয়, নগরবাসীর জীবনে অসহনীয় যানজটের ভোগান্তিও নিত্যসঙ্গী। বস্তুত রাজধানীসহ দেশের গণপরিবহন খাতে যে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন নজির নেই। সরকার একবার গণদাবির মুখে সিটিং বাস সার্ভিস বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু পরিবহন শ্রমিকদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী তখন বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, পরিবহন নেতারা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর! সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে, পরিবহন নেতারা কি তাহলে রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী? 

গণপরিবহন খাতের শৃঙ্খলা আনয়নে যতই কথা বলা হোক না কেন, দৃশ্যত দিন যাচ্ছে আর পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। লক্ষ্য করা গেছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সরকারের উচ্চমহল থেকে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। পরিবহন মালিক সমিতিকেও এ ব্যাপারে সরব হতে দেখা গিয়েছিল, কিন্তু দিনশেষে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাজধানীসহ সারাদেশের সড়কে-মহাসড়কে বাস-মিনিবাসের বেপরোয়া চলাচল, পাল্লাপাল্লি করে ছুটে চলা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো, ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘন, ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করে হাত উঁচিয়ে গাড়ি থামিয়ে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার কোনোটাই কি বন্ধ হয়েছে? এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে ভাড়া নিয়ে জালিয়াতি এবং সিটিং-এর নামে চিটিং। আর বিরতিহীনের নামে প্রতারণা তো আছেই। এটা ঠিক যে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফেরাতে সারাদেশে যেভাবে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল, তাতে অন্তত একটা আশার আলো দেখা গিয়েছিল যে, এবার অন্তত যাত্রীরা কিছুটা স্বস্তিতে চলাচল করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখন তার সবই ম্লান হওয়ার পথে। গণপরিবহন খাতে আগের মতোই ঘাঁটে ঘাঁটে চাঁদাবাজিসহ সর্বত্র বিশৃঙ্খল পরিবেশই বিরাজ করছে। যা মানুষকে হতবাক ও হতাশ করে বৈকি। 
নানান সময়ে পত্র-পত্রিকায় এমন খবর এসেছে যে, পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যারা জড়িত তারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যুক্ত। এ ব্যবসায় অবৈধ টাকার ছড়াছড়ি বলে এখানে ক্ষমতা প্রদর্শন বেশি হয়ে থাকে। আর ওই ক্ষমতাকে পুঁজি করেই মালিক-শ্রমিকরা ব্যবসায় টিকে থাকার চেষ্টা করে। তাদের সেই ক্ষমতার কাছে সাধারণ যাত্রীরা অসহায় হয়ে পড়ে। গণপরিবহনের ভাড়া নৈরাজ্য রোধে এবং যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে চলতি বছরের মার্চ মাসে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করেছিল জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। বলা হয়েছিল, সেলের সদস্যরা সপ্তাহের পাঁচদিন রাজধানীর প্রতিটি পয়েন্টে গিয়ে তদারকি করবেন। তারা যাত্রী সেজে গণপরিবহনে ভ্রমণ করবেন। 

এ সময় ভাড়া ও যাত্রীসেবা নিয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা কোনো ধরনের নৈরাজ্য করলে পরিবহনের মালিক, চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার আইনে মামলা করা হবে। অতীতে গণপরিবহন খাতে মামলা ও জরিমানা করে বিশেষ সুফল পাওয়া যায়নি, এ বিষয়টি সামনে এনে এ কার্যক্রম নিয়েও সাধারণ যাত্রীদের সংশয় ছিল। এ কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কেও এখন আর কিছু জানা যায় না। 

ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন, রাজধানীতে বেশিরভাগ বাস কোম্পানি গণহারে লোকাল যাত্রী তুললেও ভাড়া আদায় করে সিটিং সার্ভিস হিসেবে। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি সিটের পেছনে ভাড়া আদায় করা হয়ে থাকে তিন-চারবার করে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে রীতিমতো জোচ্চুরি চলে। দেশে গণপরিবহন ব্যবস্থায় ‘সিটিং সার্ভিস’ নামে আলাদা কোনো সেবার কথা বলা নেই। সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্য নিয়ে সমালোচনার মুখে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিআরটিএ ২০১৭ সালের ৩ মে আট সদস্যের একটি কমিটি করে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছিল। এ কমিটি ২৬টি সুপারিশ জমাও দিয়েছিল। এসব সুপারিশের মধ্যে ছিল শর্তসাপেক্ষে সিটিং সার্ভিস রাখা, বাসে যাত্রী তোলা নিয়ে রেষারেষি এবং যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ। কিন্তু সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা নেই। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে মূল সমস্যার দিকে সংশ্লিষ্টদের তেমন মনোযোগ নেই, মামলা ও জরিমানার দিকেই তাদের আগ্রহ বেশি। এভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কি আদৌ সম্ভব? 

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, গণপরিবহনের নৈরাজ্য নিয়ে সাধারণ মানুষ কোথায় অভিযোগ করবেন, সেটাও জানা নেই। অভিযোগ করলেও প্রতিকার পাওয়া নিয়ে রয়েছে আস্থার অভাব। কেননা, এসব দেখভালের জন্য সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে রেষারেষি ও সমন্বয়হীনতা। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বলছে, তারা শুধু অভিভাবক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। অভিভাবক সংস্থা হিসেবে সব বিষয় মনিটরিং করবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে নৈরাজ্য বন্ধ করা তাদের দায়িত্ব নয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় বলছে, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নয় বরং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএর। কিন্তু সেই বিআরটিএ-ই বা কতটুকু দায়িত্ব পালন করছে- তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ। 

গণপরিবহন একটি দেশের সেবা খাত। যাত্রী অধিকার কিংবা তাদের সেবাসংক্রান্ত বিষয়গুলোকে বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে সরকারি, আধাসরকারি আর অসরকারিসহ সবপর্যায়েই যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে। এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চাইলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতা, নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত প্রয়াস ছাড়া পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। আমাদের সামনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরিচালিত ‘ঢাকা চাকা’ কিংবা ‘হাতিরঝিল চক্রাকার বাস সার্ভিস’ দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সেখানে কেউ হুড়োহুড়ি করে বাসে ওঠে না। যাত্রীরা লাইন ধরে গাড়িতে ওঠেন। চালকদের মধ্যে কে কত যাত্রী নেবে সে প্রতিযোগিতা করতে হয় না। ঠিক একইভাবে কয়েকটা কোম্পানির অধীনে বাসগুলোকে পরিচালিত করলে চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। চালককে বেশি যাত্রী তোলার জন্য আরেকটি বাসের আগে গিয়ে দাঁড়াতে হবে না। কারণ তখন তাকে বেতন দেবে কোম্পানি। হাতিরঝিল ও গুলশান-বনানীতে যেহেতু এই প্রকল্প করে সুফল পাওয়া গেছে, তাহলে অন্য সড়কে কেন এটা চালু করা যাবে না। হতে পারে, এটা করলে চালকদের আয় কমবে, মালিকের আয় কমবে। এ জন্য তারা আগ্রহী নয়। কিন্তু একটি অথরিটির মাধ্যমে এই পদ্ধতি চালু করা ছাড়া কোনো বিকল্পও তো দেখি না। সদিচ্ছা থাকলে পরিবর্তন সম্ভব, সে দৃষ্টান্ত যেহেতু আছে সুতরাং  এ জন্য প্রয়োজন সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কেননা, যেভাবেই দেখি না কেন পরিবহন খাতটি সবসময় রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এ খাত সংশ্লিষ্টরা ‘রাজনীতি’ বা ‘ক্ষমতা’-কেই খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

এই খুঁটিকেই চিরতরে উপড়ে ফেলতে হবে। পরিবহনগুলোকে কয়েকটি প্লাটফর্মে এনে আইনপ্রয়োগকারী কোনো বাহিনীর ওপর যদি অর্পণ করা যায় তাহলে ভাড়া নৈরাজ্যসহ গণপরিবহন খাতের অরাজকতা বন্ধ হতে পারে। বাংলাদেশের যাত্রীদের অধিকার রক্ষা করা আর সেবার মান বাড়ানো বা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এই প্রয়োজনকে গভীর, যথার্থ ও কার্যকরীভাবে দেখার জন্য প্রথমেই সরকারসহ নীতি-নির্ধারক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও পরিবহন নেতৃত্বের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার মন-মানসিকতার গুণগত পরিবর্তন ঘটাতে হবে। প্রতিটি কর্তৃপক্ষ এবং প্রতিষ্ঠানকে পর্যাপ্ত গবেষণা ও স্টাডি করে বিষয়টির প্রকৃতি, ধরন, অবস্থা, করণীয় ইত্যাদি নির্দিষ্ট করে বাস্তবতা অনুযায়ী একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সম্পদ ও সামর্থ্য অনুযায়ী তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা যত দ্রুত কাজ করতে পারবে ততই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর