.ঢাকা, সোমবার   ২২ এপ্রিল ২০১৯,   বৈশাখ ৮ ১৪২৬,   ১৬ শা'বান ১৪৪০

যমুনার বুকে নতুন জীবন

 প্রকাশিত: ১৯:২০ ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮   আপডেট: ১৯:২০ ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

[পাবনা শহর থেকে ৫১ কিমি দূরে নগরবাড়ী ঘাট। এর ২০ কিমি ভাটিতে আরিচা ঘাট। নগরবাড়ী থেকে আরিচা, দৌলতদিয়া প্রভৃতি নৌ-রুটে, লঞ্চ, মালামাল বহনকারী কার্গো ইত্যাদি চলাচল করে। এক সময় বড় বড় স্টিমার, রো- রো ফেরি চলত। বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু চালুর আগ পর্যন্ত নগরবাড়ী ঘাট হয়েই উত্তরাঞ্চল থেকে মানুষজন রাজধানীতে আসা- যাওয়া। হাজারও কর্মচাঞ্চল্যে নগরবাড়ি ছিল মহাব্যস্ত এক ঘাট। এখন নগরবাড়ী ঘাটে নেই আর যাত্রীর ব্যস্ততা, কুলি হাঁকাহাঁকি ..।  বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হবার পর থেকে সব থমকে গেছে। এখন কেমন আছে সেই নগরবাড়ী ঘাট? নগরবাড়ী ঘাটের সমস্যা- সম্ভাবনা নিয়েই ডেইলি বাংলাদেশে ৮ পর্বের ধারাবাহিক। আজ ৮ম ও শেষ পর্ব।] 

যমুনা নদীর নগরবাড়ী অংশের উত্তর দিকে ভুঞাপুর আর পূর্ব দিকে শিবালয় পর্যন্ত বিস্তীর্ণ চর জেগে ওঠায় স্রোতধারা প্রায় রুদ্ধ হলেও এর বুক জুড়ে গড়ে ওঠা জনবসতিতে মরা যমুনায় প্রাণচাঞ্চল্যের জোয়ার বইছে। বৃষ্টিতে ভিজে, বর্ষায় ডুবে, খরায় পুড়েও চরবাসী একখন্ড বসত বাড়ী পেয়ে সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে।

নগরবাড়ী সন্নিহিত যমুনা চরের পাবনা অংশে নতুন ভারেঙ্গা, বোরামাড়া, সিংহাসন, বক্তারপুর, আটবাকশো, শাপল্লা, সরেষা, বাউশি, কোমরপুর, পাচুরিয়া, নাকালিয়া, পেঁচাকোলা প্রভৃতি আর মানিকগঞ্জের অংশে দুর্গাপুর, বাঁচামারা, সিংহাই, দেউলাটিয়া, সুবুদ্ধা, বাকশাট্টা, নিচভারেঙ্গা, পারুলিয়া, রাঘুটিয়া, গোবিন্দপুর, চরকাটারি, লোচনপুর প্রভৃতি চরে নদী ভাংলী মানুষেরা নতুন করে ঘর বেঁধেছে।

এক দুই হাজার বিঘা আয়তন বিশিষ্ট এসব চরের বয়স ২-১৫ বছর পর্যন্ত। তবে অধিকাংশ চর ৮৮ সালের বন্যার পর জেগেছে বলে চরবাসী জানায়। চরগুলি স্থায়িত্ব পেলেও নতুন চরগুলোর ব্যাপারে বসতকারীরা সন্দিহান। এগুলোর মধ্যে কোন কোনটি বর্ষায় সম্পূর্ণ ডুবে যায়। যেমন গত বর্ষায় সম্পূর্ণ ডুবে ও ভেঙ্গে গিয়েছিল চর বোরামাড়া। প্রায় দেড় হাজার বিঘা আয়তন বিশিষ্ট চরে প্রায় দু’শ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় পাওয়া ষাটোর্ধ দরিদ্র ছইমুদ্দিন মোল্লা বলছিলেন নদী কেড়ে নিয়েছিল সব আবার নদীর বুকেই আশ্রয় পেয়েছি। আবার চর জেগে ওঠায় মকছেদ আলী সেখের মত ধনাঢ্য চাষি শত বিঘা জমি ফিরে পেয়েছেন। বিভিন্ন চর পরিদর্শনে বোঝার উপায় নেই যে, এই মাত্র ক’মাস আগে তারা এই চরের সব ঘর-বাড়ি হারিয়েছে। চরের জমিতে চাষির ব্যস্ততা, গৃহবধুদের শাকপাতা সংগ্রহ, গবাদিপশুর যত্নআত্তি, দূরের বাজার থেকে গৃহকর্তাদের ঘরে ফেরা, শিশু কোলাহল সব মিলিয়ে তাদের এক পরিপূর্ণ সংসার। নানা অভাব অভিযোগ মাটি চাপা নিয়ে তারা এই মাটিটুকুই আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। ভাঙনের অজানা আশঙ্কা তাদের সমস্যা জর্জরিত জীবনকে দমিয়ে রাখছে।

 চর বোরামাড়ায় শিক্ষিত যুবক মোশারফ হোসেন, কলেজ ছাত্র আঃ সালাম বলছিলেন, চরগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাব, স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য নেই কোন স্বাস্থ্য ক্লিনিক। নেই দোকান পাট, হাট বাজার, চরের শিশুরা বিদ্যালয়ের অভাবে নিরক্ষর হয়ে বেড়ে উঠেছে।

খর রৌদ্রের শেষ জ্যৈষ্ঠে যমুনা পাড়ে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নদীতে বান না ডাকলেও ভরা ফসলের মাঠে কৃষকের  হাঁসির  বান ডেকেছে। সে সময়ের ফসল বলতে বাদাম। চর  কোলচিনাখরা, চর  মধুপুর, চর গনপদ্দিয়া, চর দেউনাই, চর পুকুরপাড়, চর সিংহাসন, চর বোরামারা, চর শাপল্লা, চর যদুপুর, চর লক্ষীপুর  প্রভৃতি  চরে  হাজার  বিঘা জমিতে হয়েছে বাদামের চাষ। চরের পর চর বাদামের ক্ষেত। তাকালে মনে  হয় যেন আদিগন্ত বাদামেরই  জগৎ। চাষিরা জানান, বেড়ায় ঢালারচর ইউনিয়নে বাদামের চাষ করা হয় সবচেয়ে বেশি। তাছাড়াও হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন, নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়ন, পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চরগুলোতে ব্যাপক হারে বাদাম চাষ হয়ে থাকে।

নগরবাড়ী এলাকার বাদাম চাষি শের আলী মিয়া, আবু সুফিয়ান, শাহীন, মোক্তার হোসেন জানান, এ অঞ্চলে সাধারণত ডিজি-১ ও ডিজি-২ জাতের বাদাম চাষ করা হয়। কোনো কোনো চাষিরা বাদামের সঙ্গে ‘সাথী ফসল’ চাষ করে থাকেন। বাদাম ক্ষেতে বুনে দেয়া হয় ধান, তিল, কাউন। কাউন ও তিল আগে উঠে যায়। বিঘা  প্রতি  এক  থেকে দুই মন তিল ও দুই মন কাউন পাওয়া যায়। এরপর পাওয়া যায়  বাদাম।

চরনাগদার কৃষক সামাদ আলী প্রামাণিক জানান, তিনি এ বছর দুই একর (ছয় বিঘা) জমিতে বাদাম আবাদ করেছিলেন। ছয় বিঘা জমির বাদাম তুলে পাওয়া গেছে ১৪০ মন। রোদে শুকানোর পর তিনি পেয়েছেন মোট ৭০ মন। হাট-বাজারে মানভেদে প্রতিমন বাদাম দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এবছর চরের চাষিরা বাদাম বিক্রি করে বেশ লাভবান হচ্ছেন বলে তিনি জানান। শুধু কৃষক সামাদ আলী নয়, চরপেঁচাকোলার কৃষক আকবর আলী, সোনা মিয়া, চরঢালার আক্কাছ আলী, সাগর সরকার, গহের প্রামানিকসহ বিভিন্ন চরের শতাধিক কৃষকের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এ বছর বাদামের দাম বেশি হওয়ায় চাষিরা বেশ লাভবান হচ্ছেন।

বেড়া উপজেলার নাকালিয়া ও নগরবাড়ীতে চরাঞ্চলের বাদামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাদাম বিক্রির পাইকারি মোকাম এবং বাদাম কারখানা। প্রতিদিন চরের কৃষকরা নৌকায় করে নাকালিয়া ও নগরবাড়ী মোকামে বাদাম বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাদাম ব্যবসায়ীরা বাদাম কেনার জন্য এই মোকামে আসেন। বাদাম কেনা-বেচার জন্য দু’টি মোকাম ২০-২২টি আরত গড়ে উঠেছে। কিছু কিছু বড় ব্যবসায়ী বাদাম কিনে মেশিনে খোসা ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। পরে সেই বাদামের দানা সেখান থেকে সরাসরি প্রাণ, আকিজ, স্কয়ারসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বেড়ার নগরবাড়ীর আরতদার মোমেন আলী জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাদাম ব্যবসায়ীরা তার আরতে বাদাম কিনতে আসেন।

তবে চাষিদের পরামর্শের জন্য কৃষি বিভাগের কোন কৃষি কর্মকর্তা দূরের কথা কৃষি কর্মীকে খুঁজে পাওয়া যায় না। চরের চাষিরা বলেন‘সরকার অনান্য ফসলের বীজ বিভিন্ন কৃষকদের মাঝে প্রদান করলেও আমাদের কখনও বাদামের বীজ প্রদান করা হয় না। তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি আগামী বছরগুলোতে যেন আমাদের মাঝে বাদামের বীজ প্রদান করা হয়। এতে আমরা আরও লাভবান হতে পারব।’

বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে পশুসম্পদ পালনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা  থাকলেও পশুসম্পদ অধিদপ্তরের লোকজন চরে পা  রাখেন না। চরের অধিবাসীরা অসহায়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সহায়তায় কোন ইউপি চেয়ারম্যান মেম্বর সাহায্যের হাত বাড়ান না। যেমনটি বলছিলেন চর বেরামাড়ার অসহায় বৃদ্ধ ভানু খাতুন। কিছু বাসিন্দা নদী শিকস্তি হারান মোল্লা, চর কল্যাণপুরের আরব আলীসহ অন্যরা বললেন চর জাগায় তারা অথৈ সাগরে যেন একখন্ড কাঠ পেয়েছেন। তবে দুর্গম চরে তাদের দেখার কেউ নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো এবং দায়িত্বশীল কিছু এনজিও এগিয়ে এলে যমুনায় জেগে ওঠা চরের নদী শিকস্তি মানুষগুলোর নতুন জীবন আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।

বেড়া উপজেলার পুরাণভারেঙ্গা ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহনূর ইসলাম বলেন, তাদের পুরাণভারেঙ্গা ইউনিয়নের দুই তৃতীয়াংশ এলাকা যমুনার গহীনে। এখন যেখানে আবার চর জেগে উঠেছে। তিনি বলেন, বড় সংগ্রামী তাদের এলাকার মানুষ। যারা চরে তাপদাহে পোড়ে, বৃষ্টিতে ভেজে আর বণ্যায় ভাসে- ডোবে। কিন্তু এ মানুষগুলোর জন্য সরকারের আলাদা নজর নেই। তিনি যমুনার চরবাসীর জন্য বিশেষ প্রকল্প নেয়ার দাবি জানান।

ডেইলি বাংলাদেশ/অারআর