Alexa মোগলহাট রেললাইন: ১২ কি:মি’র ১০ কিলোমিটারই চুরি

ঢাকা, রোববার   ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯,   পৌষ ১ ১৪২৬,   ১৮ রবিউস সানি ১৪৪১

মোগলহাট রেললাইন: ১২ কি:মি’র ১০ কিলোমিটারই চুরি

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:১৬ ১০ নভেম্বর ২০১৯  

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

এক সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যে যাওয়ার ইমিগ্রেশন রুট ছিল লালমনিরহাটের মোগলহাট। সেসময় এই পথে ট্রেন চলাচল করতো। ইমিগ্রেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরপরই এ রুটে ট্রেন চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। সেই মোগলহাট রেলপথের ১২ কিলোমিটারের মধ্যে ১০ কিলোমিটার লাইন ও স্লিপার চুরি করে নিয়ে গেছে চোর সিন্ডিকেট। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বাকি দুই কিলোমিটার রেললাইনও খোয়া যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

রেলভবন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃটিশ আমলে লালমনিরহাট রেলওয়ে বিভাগের মাধ্যমে ভারতের কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু ছিল। ভারতবর্ষের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র ছিল লালমনিরহাট। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির পরও লালমনিরহাট সদরের মোগলহাট হয়ে ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।

অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে লালমনিরহাটের মোগলহাট রেললাইন

এই রেলপথের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় উৎপাদিত পাট, চা, তামাক, চামড়া, ধান, চাল ও শালকাঠ ভারতে রফতানি করা হতো। আর ভারত থেকে কয়লা, তেল, ডিজেলসহ অন্যান্য পণ্য আমদানি করা হতো। এছাড়া দু’দেশের পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচলে মোগলহাটে একটি চেকপোস্ট ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা ছিল। প্রতিদিন দু’দেশের শতাধিক পাসপোর্টধারী যাত্রী মোগলহাট হয়ে যাতায়াত করতেন। সড়ক পথে যোগাযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়ায় আশির দশকে ১২ কিলোমিটার লালমনিরহাট-মোগলহাট রেলপথ বন্ধ করে দেয়া হয়।

এরপর থেকে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে লালমনিরহাটের এ রেলপথ। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় দিন দিন নষ্ট হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। এরমধ্যে ১২ কিলোমিটার রেলপথের প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকার লাইন ও স্লিপারসহ সব কিছু চুরি হয়ে গেছে।

এদিকে এই রেলপথ ও স্থলবন্দরটি পুনরায় চালু করতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি নেপালের একটি প্রতিনিধি দল রেলপথসহ স্থলবন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে স্থানটি পরিদর্শন করেন।

রেললাইন চুরি করে তৈরি করা হয়েছে বাড়ি

সূত্র জানায়, ২০১২ সালে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রেলওয়ের চুরি যাওয়া কিছু লাইন উদ্ধার করলে রেলওয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন রেলওয়ের উর্দ্ধতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল লতীফ। তবে সেই অভিযোগে চোর বা চুরির পুরো তথ্য দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে জিআরপি পুলিশ তদন্ত করে লালমনিরহাট শহরের সাপ্টানা এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে মিজানুর রহমান মিজান ও কুরুল এলাকার কোরবান আলীর ছেলে শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এ মামলার প্রধান আসামি মিজানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মাদক ও চোরাচালন মামলাও বিচারাধীন রয়েছে। এরপরেও রেললাইন চুরি বন্ধ হয়নি। বরং লালমনিরহাট রেল বিভাগের বেশির ভাগ এলাকার লাইন চুরির সাথে সম্পৃক্ত হন মিজান ও তার সহযোগিরা।

স্থানীয়রা জানান, রাতের আঁধারে মিজান ও তার সহযোগিরা স্থানীয়দের জিম্মি করে রেললাইন কেটে নিয়ে যান। এর প্রতিবাদ করলে তাদের হত্যার হুমকি দেয়া হয়। আপাতত দুই কিলোমিটার অংশে ভুমিহীনরা ঘরবাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করায় তা চুরি করতে পারেনি। তবে তাদের ঘর সরাতে হুমকি দিচ্ছে চক্রটি।

রেললাইন চুরি মামলার সাক্ষী কর্নপুর পাতুরগেট এলাকার মন্টু মিয়া ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, যখন রেললাইন চুরি যায়, তখন আমি ঢাকায় রিকশা চালাতাম। আমি কিছুই জানি না, তবুও পুলিশ আমাকে সাক্ষী করেছে। যারা দেখেছে তাদের সাক্ষী করা হয়নি। রেললাইন চুরির সাক্ষীরা অনেকেই ঘটনার সময় কাজের সন্ধানে এলাকার বাইরে ছিলেন। ফলে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর অভাবে মামলার জট খুলছে না।

অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে লালমনিরহাটের মোগলহাট রেললাইন

মোগলহাট ইউনিয়নের কর্ণপুর পাতুরগেট গ্রামের আবুল হোসেন ও সিরাজুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ৫ থেকে ৭ বছর আগে দুর্বৃত্তরা রাতে রেললাইন কেটে নিয়ে যায়। বাকি অংশটুকুও কেটে নেয়ার চেষ্টা করছেন মিজান ও তার দলবল।

মোঘলহাট রেলওয়ে স্টেশন অফিসে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন নদী ভাঙনের শিকার মরিয়ম বেওয়া। তিনি বলেন, নদীর ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে পরিত্যক্ত রেল অফিসে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বসবাস করছি। রেলচালু হলে স্বেচ্ছায় চলে যাবো।

রেলওয়ে লালমনিরহাট বিভাগীয় ব্যবস্থাপক শফিকুর রহমান শফিক ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, পরিত্যক্ত এ রেলপথ পুনরায় চালু করে ভারতের গিতালদাহের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা হবে। এজন্য উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফায় পরিদর্শন করেছেন। তবে এখনই না হলেও ভবিষ্যতে এই রুটে ভারতে যাওয়ার ইমিগ্রেশন চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, রেললাইন চুরির বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে রেলওয়ের সম্পদ রক্ষায় অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এস