মেলা থেকে কুড়ানো কথা

ঢাকা, শুক্রবার   ০৩ এপ্রিল ২০২০,   চৈত্র ২০ ১৪২৬,   ০৯ শা'বান ১৪৪১

Akash

মেলা থেকে কুড়ানো কথা

রুমা মোদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৯:১৮ ১ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৯:৩২ ১ মার্চ ২০২০

রুমা মোদক

রুমা মোদক

আমার খুব প্রিয় একজন বন্ধু গল্পকার কুলদা রায়ের লেখার পাঁড় ভক্ত। কিন্তু ঠিক প্রকাশকের নাম জানে না। বই কিনতে নিয়ে গেলাম নালন্দায়।বিক্রয়কর্মীকে বলতেই একমিনিটে বের করে দিলেন বই দুটো। কৌতুহলে জিজ্ঞেস করলাম, বইগুলো কেমন বিক্রি হয়? প্রথমটায় সে নিরুত্তর। আমার খানিক চাপাচাপিতেই বলতে বাধ্য হলো,আসলে আপা এই বইগুলো আমরা ডিসপ্লেতে রাখিনা। এগুলোর নির্দিষ্ট পাঠক,এসে এই বইগুলোই চায়।

অভিজ্ঞতা দুই.
ডিসপ্লেতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সৈয়দ হক,হুমায়ুন,জাফর ইকবাল, কেকাপা এক সারিতে। পাঠক নেড়েচেড়ে দেখছেন,ঠিক কোনটা কিনবেন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। বিক্রয়কর্মী মেয়েটি অসীম দয়ায় এগিয়ে এলেন, আপু এই যে এটি নিতে পারেন, সুচিটা দেখুন,ছুটি, পোস্টমাস্টার, হৈমন্তী,ক্ষুধিত পাষাণ.. জোশ জোশ সব গল্প..। বিশ্বাস করুন, (যদি অডিও কিংবা ভিডিও ট্যাগ করে দিতে পারতাম!) ঠিক এই ছিলো মেয়েটির শব্দচয়ন।

অভিজ্ঞতা তিন.
বইমেলা আমার কাছে তীর্থভ্রমণ। জীবনে একবার বাণিজ্য মেলায় গিয়েছিলাম,তারপরই শপথ করেছি দ্বিতীয়বার আর যাবোনা। কিন্তু বইমেলা,এ যে আমার তীর্থ।

পারিবারিক, ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধকতায় অনেকগুলো বছর চলে গেছে মাঝখানে, আমি মেলা থেকে বিচ্ছিন্ন। সুখে ছিলাম না,বিদ্ধ করতো বিশাল হতাশাবোধ। একজন সামাজিক নারীর মতো গাড়ি নয়, বাড়ি নয় আমাকে কুড়ে কুড়ে খেতো বইমেলায় সংযুক্ত না হবার বেদনা। ফেব্রুয়ারি এলেই কেমন আকুপাকু করতে থাকতো অন্তর!

শেষ পর্যন্ত সংযুক্তও হতে পারলাম গত কয়েকবছর ধরে, প্রতি মেলায় একটি দুটি বই আসলো মেলায়।

তিনবছর পর এবার পরপর দুবার যেতেও পারলাম স্বশরীরে।

দ্বিতীয়বার গেলাম কাব্য পদ্যকে নিয়ে। ওরাও চিনতে শিখুক তীর্থ। ওরা ঘুরেফিরে এক স্টলেই যেতে চায়। আমি প্রথমটায় বুঝিনি। পরে যখন দুজন ভীড়ে সেলফি তোলে দুটো মোটিভেশনাল বই নিয়ে ফিরলো আমি তাজ্জব হয়ে আমার যত্নে,লালনে চোখের সামনে বড় হয়ে ওঠা হুজুগে প্রজন্ম দেখলাম অচেনা চোখে!

যে দুদিন বইমেলায় গিয়েছিলাম দুদিনই ছুটির দিন। মেলামুখী মানুষের স্রোতে অবরুদ্ধ পথঘাট। বলা যায় প্রায় দু যুগ পরে আমার এভাবে প্রস্তুতি নিয়ে শুধু মেলার উদ্দেশ্যেই মেলায় যাওয়া।

একটা সময়, ফেব্রুয়ারির আটাশটা বিকেল কাটানো বইমেলা ভীষণ বদলে গেছে ততোদিনে। বাংলা একাডেমির ভালোবাসার এলোমেলো প্রাঙ্গণ ছেড়ে সরে এসেছে সোহরাওয়ার্দীর পরিকল্পিত গোছানো ঠিকানায়। ঢোকার মুখে টি এস সির মোড় থেকে এখন আর শিমুল মোস্তফার গলা গমগম করে না, যতক্ষণ তুমি কৃষকের পাশে আছো....ইথারে ছড়িয়ে পরে না 'ততোক্ষণ আমিও তোমার' প্রতিধ্বনি। সেই ছাত্রজীবনে মা বাবার পাঠানো খরচের টাকা থেকে কষ্টে বাঁচানো ব্যাগের টাকাগুলোকে বাইরের স্টল থেকে গলা বাড়িয়ে ডাকতো পাইরেসি বই। মহানন্দে সেগুলো কিনে হলে ফিরতাম, আহা নতুন বইয়ের গন্ধ আর পড়ার নেশায় নির্ঘুম রাত। তখন বইমেলা এলে কলাভবন সেজে যেতো সাদাকালো কিছু পোস্টারে, এদিক সেদিক টেবিল পেতে বসা লিটলম্যাগ, কতোরকম কবিতাকার্ড... প্রেমিক প্রেমিকাদের কেনার সীমিত সামর্থ্যে সেখানেই ঘুরঘুর। হঠাৎ চোখের সামনে রক্তমাংসে তসলিমা কিংবা গুন।

আমি বড়ো নস্টালজিক, বইমেলায় যাবার সময় আমি কিছু নস্টালজিয়া সাথে নিয়ে যাই। কিছু অমূল্য বিকেল আর মূল্যহীন মানুষের নস্টালজিয়া...।
যে কারণে বাণিজ্যমেলা বাদ দিয়েছিলাম একবার গিয়েই, সেই ধাক্কাটা খেলাম এবার বইমেলায় গিয়ে, কোথায় পাঠ ভালোবাসা, কেবলই হুল্লোড়! হুল্লোড়ে নতুন যুক্ত হয়েছে 'ফুড কোর্ট'। সারি সারি বাহারি খাবারের দোকান। বোধ হচ্ছে এই খাবারের জন্যও বোধকরি আগামী দিনগুলোতে এ হুল্লোড় কেবলই বাড়বে। বাড়বে সেলফি হিড়িক,বসন্তের ফুলের বিক্রি। ক্রমেই বাড়বে বই আর পাঠের সঙ্গে সম্পর্কহীন ঘুরে বেড়ানো মানুষ! হ্যা মানুষের তো অধিকার রয়েছেই অবাধে সর্বত্র যাবার, সে প্লাস্টিকের বালতির মেলাই হোক কিংবা বইয়ের মেলা।

যে 'স্বপ্ন' স্বপ্নের মতো ছিলো, বইমেলায় লেখক হিসাবে যাওয়া, স্টল আলো করে বসে থাকা...অটোগ্রাফ দেয়া...সবই বড়ো বিব্রতকর ঠেকলো অতি বাড়াবাড়িতে। আমাকে দেখে লজ্জায় পড়ে কেউ হয়তো বই কিনলেন, কেউ কিনলেন না দুপক্ষের কাছেই আমার বিব্রতবোধ লুকাই কি করে! আত্মসম্মান কই লেখকের! লেখক কেনো ক্যানভাসার হয়ে উঠছেন?

পাঠক তবে লেখক চিনবেন কি করে? লেখকই বা জানবেন করে প্রকৃত পাঠক কে?

মিডিয়া পলিসি, মানহীন সম্পাদনা, বিপণন কৌশলের ব্যর্থতা, পুরস্কারের নামে সিণ্ডিকেট সবকিছুই বড়ো জটিল করে দিয়েছে পরিস্থিতি। ক্রমাগত ‌‘সফল’ সন্তান বানানোর ধান্ধায় আমরা ধ্বংস করেছি কয়েকটি প্রজন্ম। হুমায়ূনের পর কেনো মোটিভেশনাল বই বেস্টসেলার? ভুল হোক কিংবা ঠিক, আমাদের সামনে লক্ষ্য ছিলো, গন্তব্যে পৌঁছার মতো কিছু স্বপ্ন ছিলো, অনুসরণ করার মতো কিছু আদর্শ ছিলো। আমরা পারতাম তাদের পিছু পিছু চলতে...।

কিন্তু এখন জেনারেশানের গন্তব্য জানা নেই, চোখ বন্ধ করে দেখার মতো স্বপ্ন নেই, অনুসরণ করার মতো আদর্শ নেই। কেবল আছে তাড়া, পরিবারের তাড়া, ‘সফল’ হতে হবে। আছে সমাজের হাতছানি ‘কেউকেটা’ হতে হবে। সফল আর কেউকেটা হবার উদগ্র তাড়ায় তারা সমবয়সীদের মোটিভিশন কিনে পয়সা দিয়ে।

হয়তো আর বইমেলায় যাবো না। লেখক বন্ধুরা, যারা জড়িয়ে ধরে সেলফি তোলে, উন্নাসিক লেখকরা যারা চিনেও না চেনার ভাণ করে এড়িয়ে যায় কারো জন্যই আর মেলায় যাবোনা। হ্যাঁ হয়তো যাবো না। হয়তো যাবো।

কিন্তু যাই কিংবা না যাই অপেক্ষায় থাকবো সেই পাঠকের যে আমার খোঁজে মেলায় যাবে না, আমার বইয়ের খোঁজে যাবে...। ডিসপ্লেতে আমার বই সাজাতে হবে না। আমার দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না স্টলের সামনে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর