Alexa মেডিকেলে ভর্তি হতে না পারা মেয়েটি এখন বিভাগের সেরা!

ঢাকা, বুধবার   ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০,   ফাল্গুন ১৩ ১৪২৬,   ০২ রজব ১৪৪১

Akash

মেডিকেলে ভর্তি হতে না পারা মেয়েটি এখন বিভাগের সেরা!

রুমান হাফিজ, চবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ১৫:৫৪ ১১ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১৬:৩৫ ১১ জানুয়ারি ২০২০

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

ছবিঃ ডেইলি বাংলাদেশ

একাদশ শ্রেণিতে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির পর থেকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা নাড়া দেয়। কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিটি বিষয়ের উপর ভালো আয়ত্বের জন্য প্রাইভেট পড়ার বিকল্প নেই। ক্লাসের সবাই এই স্যার, ওই ব্যাচ নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তার সেই পরিমাণ আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই। কি উপায়? থেমে যায়নি। নিজের প্রাইভেটের খরচ জোগাড় করতে ছাত্রছাত্রী পড়ানো শুরু। 

এইচএসসির ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। মেডিকেল ভর্তির প্রস্তুতি পুরোদমে নিলেও সেটা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। মাত্র ৮ দিন প্রস্তুতিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ‘বি’ ইউনিটে মেধাতালিকা স্থান করে নেয়। 

বলছিলাম চবির শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার এর কথা। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন তিনি। 

শারমিনের স্থায়ী নিবাস বরিশাল হলেও জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরে। বাবা-মা আর বড় বোন নিয়ে চারজনের ছোট্ট পরিবার। একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবার ছোট্ট চাকরি দিয়ে পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তবুও মেয়েদের পড়ালেখার ব্যাপারে পিছপা হননি। ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখায় ভালো শারমিন। পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি। জেএসসি ও এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ অর্জন৷

ক্লাসের পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কার্যক্রমেও শারমিনের পদচারণার প্রমাণ মিলে তার বাসায় ফ্রেমবন্দি ক্রেস্ট, সার্টিফিকেটগুলো দেখে। স্কুল জীবনে গান, আবৃত্তি, চিত্রাংকন, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক ইত্যাদি শাখায় অংশগ্রহণ করে অনেক পুরস্কার অর্জন করে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০১৪ সালে ‘Bangladesh Talent Hunt’ প্রতিযোগিতার ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করা। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে গার্ল গাইডের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছে সে। আবৃত্তির প্রতি দুর্বলতা থেকেই যুক্ত আছে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য প্রমা আবৃত্তি সংগঠনের সঙ্গে।

পরিবারে কোনো ছেলে সন্তান নেই। মেয়ে হিসেবে কেমন প্রতিবন্ধকতা পার করতে হচ্ছে? প্রশ্নের উত্তরে শারমিন বলেন, এখনো অনেক বাবা-মা ছেলের জন্ম হলে প্রথমে সবাইকে হাসি মুখে মিষ্টি বিতরণ করে সুসংবাদ দেয়। আর একটা মেয়ের জন্ম হলে বাবা কপালে হাত দিয়ে মুখ গুমড়ো করে বসে থাকে। বর্তমানে এই প্রেক্ষাপট অনেকটা পাল্টালেও বেশিরভাগই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। আমি প্রথমত এই দিক থেকে ভাগ্যবতী। আমার পরিবারে মেয়ের জন্ম নিয়ে কারো অসন্তুষ্টি নেই। আমি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া অতি সাধারণ একটি মেয়ে। পরিস্থিতি থেকেই কিছু না কিছু শিখেছি। গত সাতমাস বাবার চাকরি ছিলো না। মায়ের জমানো কিছু টাকায় খুব কষ্ট করে চলতে হয়েছে। জীবনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, উপলব্ধি, অর্জনের গন্ডি হয়ত ছোট। তবে এই ক্ষুদ্র সময়ে আমি প্রতিটি পরিস্থিতি থেকেই কিছুনা কিছু শিখেছি।

প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গল্প

বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়ে আমি মোটেও হতাশ হইনি। অনেক কট্যুক্তি শুনেছি। নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি এটা বলে যে এই বাংলা বিভাগেই আমি আমার সর্বোচ্চটা দিব। আমি সবসময় যা পড়ি তা ভালোবেসে পড়ি, বুঝার চেষ্টা করি, বিষয়গুলো ধারন করার চেষ্টা করি। প্রথম বর্ষে আমি প্রথম শ্রেনিতে প্রথম হয়েছি তাও বিগত অনেক বছরের সিজিপিএ থেকে ভালো হয়েছে।

প্রাইভেট পড়ানো, নিজের পড়ালেখা, ক্লাসসহ অন্যান্য সব কাজ কিভাবে করা হয়? প্রশ্নের উত্তরে স্বভাবসুলভ হাসি টেনে বলতে লাগলো শারমিন, পরিবারকে সহযোগিতার পাশাপাশি নিজের পড়ালেখার ব্যয়ভারেও আমার প্রাইভেট থেকে পাওয়া টাকাগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করে। তবে এক্ষেত্রে আমাকে শ্রম দিতে হয় অনেক বেশি। সপ্তাহে ৫ দিন সাড়ে সাতটার ট্রেনে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া, সেখান থেকে ফিরে রাত ৯টা পর্যন্ত টিউশন করে যেটুকু সময় পাই পড়তে বসি। এক্ষেত্রে সপ্তাহের দুদিন বন্ধকে কাজে লাগাই। শুক্রবার আর শনিবার পর্যাপ্ত পড়ার চেষ্টা করি যাতে সপ্তাহের ৫ দিনের পড়ার ক্ষতিটা কিছুটা হলেও পুষে। তবে ভালোবেসে পড়ি বলেই হয়ত ততটা কষ্ট হয় না।

সবকিছুর পেছনে অনুপ্রেরণায় বাবা মা। শারমিন জানায়, মা এর সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট পেয়েছি বলেই আজ এতদূর আসা। আমার জীবনের সব কিছুর মূল প্রেরণাদানকারী হলেন আমার মা। তবে এই চলার পথে বড় বোনের পদাঙ্ক অনুসরণের চেষ্টা করেছি। যিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরই সমাজতত্ত্ব বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন।

মোড় ঘুরিয়ে দেয়া স্বপ্ন 

ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও সময় তার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। শারমিন বলেন, নতুন এক স্বপ্নের বীজ বুনেছি নিজ মনে। ভবিষ্যতে আমি বাংলা বিভাগের একজন যোগ্য শিক্ষক হতে চাই। একটা নারী যে পুরুষের মত করেই তার শিক্ষার্থীদের ভাল করে নির্ধারিত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান দান করতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। তবে সময়ের হাতে অর্পণ করেছি আমার ভবিষ্যতের রুদ্ধ দ্বার প্রান্তের চাবি। আমার জন্য যে বাবা-মা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তার মান আমি রাখার চেষ্টা করছি প্রতিনিয়ত। তাদের মুখের হাসিটুকুই আমার চলার পথের সব প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র অস্ত্র। ভালোকিছু হবে সেই প্রত্যাশায়ই পরের দিনের সূর্য দেখার ইচ্ছায় রাতে ঘুমাই। আর আশা করি কালকের সকাল আমার জন্য হয়ত নতুন কিছু নিয়ে অপেক্ষা করছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডএম