মৃত্যুর প্রহর গুনছেন কনস্টেবল পলি!

ঢাকা, বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯,   আষাঢ় ১২ ১৪২৬,   ২১ শাওয়াল ১৪৪০

মৃত্যুর প্রহর গুনছেন কনস্টেবল পলি!

জালালউদ্দিন সাগর, চট্টগ্রাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:৫৩ ১৭ মে ২০১৯   আপডেট: ১৫:৩৯ ১৯ মে ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পুলিশের চট্টগ্রাম বিভাগীয় হাসপাতালের ছয় ফুট প্রস্থ ১০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কেবিনে অনেকটা লেপ্টে আছে রুগ্ন শরীর। আমি যখন কেবিনে ঢুকি তখন ঘড়িতে রাত আটটা। সাদা বিছানায় শুয়ে আছে মেয়েটি। গলায় লাগানো কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাসের যন্ত্রের নালি।

কেবিনের দরজা খুলতেই সঙ্গে থাকা দুই নারী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বিছানার সঙ্গে ল্যাপ্টে থাকা শরীরটাকে একটু ঠিকঠাক করতে। বড় ভাই আরিফ এগিয়ে এলেন কুশল বিনিময় করতে। পরিচয় দিতেই হাতটা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছেন দাদা? বললাম আমি ভালো,পলি কেমন আছে।   

অপরিচিত কন্ঠে পলি নামটা শুনে স্থির চোখ দুটো কিছুটা অস্থির হয়ে ওঠলো মেয়েটির। অচঞ্চল দেহে অস্থির চোখ দুটিতে রাজ্যের শব্দ উড়াউড়ি করছে। কিছুটা এগিয়ে গেলাম। ঠিক বিছানার কাছাকাছি। কিছু যেন বলতে চায় সে।

বড়ভাই রিপন এগিয়ে এলেন পলির মাথার কাছাকাছি। আদরে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, আজকাল খুব বেশি অভিমানী হয়েছে সে। শুধুই মরতে চায়! বলে, মৃত্যুর জন্য এমন করুণ প্রতীক্ষা কারো ভাগ্যে যেন না জুটে। রিপনের কথা শুনে অভয় দেয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেললাম আমি। কিছু বলতে গিয়েও কণ্ঠ থেমে গেল অজান্তে। 

‘মৃত্যুর জন্য এমন করুণ প্রতীক্ষা কারো ভাগ্যে যেন না জুটে’-এমন বাক্য শোনার পর অভয় দেয়ার মতো যুতসই কোনো শব্দ পেলাম না অভিধানে। বাংলাদেশ পুলিশের অদম্য সাহসী এ নারী কতটা অসহায় হয়ে উঠলে মৃত্যুর জন্য এমন প্রহর গুনতে পারে!

আরিফ বলেন, ২০১৫ সাল থেকে বোনের চিকিৎসা করতে গিয়ে সব কিছু বিক্রি করে এখন নিঃস্ব আমরা। তবুও বোনকে বাঁচাতে আমাদের যে লড়াই তার চেয়ে অনেক কঠিন লড়াই করছে পলি। প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে সে। 

পলিকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করতে আবারো যেতে হবে ভারতে। সে জন্য ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য দেয়া হয়েছে। ভিসা হয়তো হয়ে যাবো কিন্তু অর্থ ! এত অর্থ পাবো কোথায়। 

২০১৫ সালে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত সিএমপি’র কনেস্টেবল পলি আক্তার। মেরুদন্ডের উপরে ঘাড়ের ঠিক মাঝখানে ব্রেইনের কাছাকাছি টিউমার ধরা পড়ে এমআরআই পরীক্ষায়। 

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবারো ঘাড় ও মাথায় ব্যথা অনুভব করলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের চেন্নাইয়ে। দ্বিতীয়বার অপারেশন বিপদজনক মনে হওয়ায় চেন্নাইয়ের চিকিৎসকরা অপারেশন না করেই ফিরিয়ে দেন দেশে। 

এরপর ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর পলিকে ভর্তি করানো হয় ঢাকার আগারগাও এর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সাইন্স হাসপাতালে । গত ১৭ ডিসেম্বর সেখানে দ্বিতীয়বার অপারেশন হয় তার। রাখা হয় আইসিইউতে। 

প্রায় পাঁচ মাস আইসিওতে রাখার পর অর্থের অভাবে গত ৪ এপ্রিল পলিকে নিয়ে আসা হয় চট্টগ্রামে। ভর্তি করানো হয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে। 

চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মাহবুবর রহমান স্যারের সহযোগিতা ও চেষ্টায় সিএমপি থেকে আড়াই লাখ টাকা সাহায্য দেয়া হয়েছে পলিকে। এ ছাড়া পুলিশ সদর দফতর থেকে এককালীন দেয়া হয়েছে আরো দেড় লাখ টাকা। 

সর্বশেষ গত ২২ এপ্রিল পলিকে দেখতে গিয়ে সিএমপি কমিশনার আরো তিন লাখ টাকা সাহায্য দেয়ার কথা দিয়েছেন। উচ্চতর চিকিৎসার জন্য পলিকে ভারতে নিতে সিএমপি কমিশনার এ আর্থিক সাহায্য করবেন। 

২০১২ সালে পুলিশে চাকরি হয় পলির। রংপুরে প্রশিক্ষণ শেষে কনেস্টবল পদে যোগ দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশে (সিএমপি)। সে থেকেই সিএমপিতেই আছেন কনেস্টবল হিসেবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ