Alexa মৃত্যুর আগে যা বলে গেলেন সকিনা বেগম

ঢাকা, শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯,   ভাদ্র ১০ ১৪২৬,   ২৩ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

Akash

মৃত্যুর আগে যা বলে গেলেন সকিনা বেগম

 প্রকাশিত: ১৮:৫৩ ২৭ এপ্রিল ২০১৮  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

দাউদকান্দি উপজেলার ভাগলপুর গ্রামের মৃত কালু মিয়ার স্ত্রী সকিনা বেগম। মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার ছোট রায়পুর গ্রামের নায়েব আলী ও সাগরি বেগমের মেয়ে তিনি। পিতা-মাতার এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি বড়।

১৯৬২ সালের দিকে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ভাগলপুর গ্রামের কালু মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সকিনা বেগমের ৬ ছেলে ও এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। এর মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে তার তিন ছেলে হয়। পরে হয় আরো তিন জন। ৭ ছেলে মেয়ের মধ্যে বর্তমানে ৩ ছেলে বেঁচে আছে। বাকী ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে মারা যায়। একে তো সংসারে অভাব, তার উপর ৩ ছেলে। তাদের খাওয়াতে হিমসিম খাওয়া শুরু হল কালু মিয়ার। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়াতে আয়-রোজগারও কমে গেল। তাই সুন্দলপুর গ্রামে যখন মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প করা হল তখন প্রস্তাব পাওয়া মাত্র নিজের স্ত্রীকে রান্না করার চাকরিটা করতে রাজী হন কালু মিয়া।

সকিনা বেগম বলেন, আমাদের পাশের গ্রাম সুন্দলপুরে মুক্তিবাহিনীর বড় ক্যাম্প ছিল। সে ক্যাম্পে মুক্তি বাহিনীর জন্য প্রতিদিন আমি রান্না করতাম। এই গ্রামে মাত্র ২-১ বছর হয়েছে বিয়ে করে এসেছি। তাই অনেকে নতুন বউ হিসেবে আমাকে অন্য গ্রামে গিয়ে রান্নার কাজটা করতে নিষেধ করত। কিন্তু রিকশা চালিয়ে শ্বশুর ও স্বামীর যে আয় তা দিয়ে সংসার চলত না। তাই মুক্তিবাহিনীর জন্য রান্নার চাকরিটা নেই। এতে পাকবাহিনীর লোকজন আমাকে টার্গেট করে। একদিন সকালে মুক্তিবাহিনীর জন্য রান্না করতে যাওয়ার সময় তারা মাঝ পথে আমাকে আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে নির্যাতন করে। সেই নির্যাতনের কথা এখনও মনে হলে বুক ভেঙে যায়।

একেবারে বয়সের ভারে নূয়ে পড়া সকিনা বেগম অতীতের কথা মনে করতে পারেন না খুব একটা। মানসিকভাবে অসুস্থ বলে মনে হলো। নিজের বাপের বাড়ির ঠিকানাও সঠিকভাবে দিতে পারেননি। ছোট ছেলের স্ত্রী ও বড় ছেলের মেয়ের সহায়তায় তার মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অব্যক্ত কথাগুলো বেরিয়ে এলো।

৭১’র কথা উঠতেই সকিনা বেগম জানালেন, আমাদের সুন্দলপুর গ্রামে মুক্তিফৌজের ক্যাম্প ছিল। তারা ছিল আমাদের দেশি। এখান থেকে বিভিন্ন জায়গায় অপারেশনে যেত মুক্তিফৌজ। আমার দায়িত্ব ছিল তিন বেলা তাদের জন্য রান্না করে খাওয়ানো। আমার হাতের রান্না ভাল ছিল বলে তারাও আমাকে সব সময় সাহায্য করতো। মুক্তিবাহিনীর জন্য রান্না করতে গিয়ে আমি যে এলাকার কারো কারো শত্রু হচ্ছি বুঝতে পারতাম। কিন্তু দু’টি কারণে তাদের জন্য আমি রান্না করতাম। এক. এই কাজ করে টাকা-পয়সা পেতাম যা সংসারে লাগত। দুই. তারা দেশের জন্য যুদ্ধ করছে, আমাদের স্বাধীনতার জন্য। এই ব্যাপারটা আমার শ্বশুর ও স্বামী আমাকে বোঝাত।

স্মৃতিচারণ করতে বললে কিছুক্ষণ চুপ থেকে সকিনা বেগম হঠাৎ করেই বললেন, একদিন সকাল বেলা। স্বামী ও শ্বশুর আগেই কাজে বেরিয়েছে। এ দিন গ্রামে পাক বাহিনী প্রবেশ করে। আমি সুন্দলপুর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে যাব এমন সময় রাস্তা থেকে আমাকে ধরে ফেলে পাঞ্জাবিরা। তারা আমাকে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করে। এই নির্যাতনের পর আর আমি সুন্দলপুর যাইনি।

সকিনা বেগম বলেন, আমার শ্বশুর কইত, মনে রাখবা, শুধু টাকার জন্যই তোমাকে ঐ খানে পাঠাইনি। তারা মুক্তিফৌজ। আমাদের দেশে পাঞ্জাবিরা ঢুইকা পড়েছে। তাদের বিতাড়িত করতে পারলে বাংলাদেশ স্বাধীন হইব। সুন্দলপুর ক্যাম্পের লোকগুলো এই স্বাধীনতার জন্য কাজ করতাছে। তাই বউমা তুমি দেশের উপকার করতাছ-এইভাবে আমার শ্বশুর আমাকে বোঝাতেন।

সকিনা বেগম আরো বলেন, জেলা প্রশাসক দাউদকান্দি উপজেলার সোনাকান্দা মৌজার ১নং খতিয়ানের ৪৮৪ নং দাগে ০.০৬ শতক জমি আমাকে দিয়েছে। যা আজ আমি বুঝে পেয়েছি। কিন্তু আমার যে একটি ঘর দরকার। ওষুধ খাওয়ার জন্য টাকা পয়সা দরকার। ছেলেরা গরিব। তাদের সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তার উপর আমাকে চালাবে কি করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি তা আর বলতে চাই না। বলে সমাজে লজ্জা ছাড়া আর কি পাব। আমার মাথা ঠিক নাই। গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। কি বলতে কি বলে ফেলি জানি না। শুধু এতটুকু বলব, সরকার যেন আমাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সরকার যেন আমাকে ঘর আর ঔষধ খাওয়ার টাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এর চেয়ে বেশি আর আমার কিছুই চাওয়ার নেই।

সকিনা বেগমের বড় ছেলে নুর মোহাম্মদ বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমার বয়স ৬-৭ বছর হবে। আমি খুব না বুঝলেও একেবারে অবুঝ ছিলাম না। আমার মা যে কি কষ্ট করেছে, নির্যাতিত নিপিড়িত হয়েছে, তা আমার থেকে বেশি আর কে জানে। সুন্দলপুরে গিয়ে রান্না করে আবার ভাগলপুর এসে সংসারের কাজ করা, কত যে কষ্ট তিনি করেছেন এক আল্লাহ জানেন। দেশ স্বাধীন হয়েছে এতগুলো বছর হল কিন্তু মায়ের খোঁজটুকু কেউ নেয়নি। আজ সম্মান দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন।

নুর মোহাম্মদ বলেন, আমরা ৭ ভাই বোনের মধ্যে বর্তমানে ৩ ভাই জীবিত আছি। আমরা খুবই গরিব। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মাকে ভালভাবে রাখতে পারছি না। তার শেষ জীবনটা যাতে সুন্দরভাবে কাটে এইটুকুই আমাদের প্রত্যাশা। (সম্প্রতি মারা গেছেন বীর নারী সকিনা বেগম)।

ডেইলি বাংলাদেশ/আজ/এমআরকে

Best Electronics
Best Electronics