Alexa মৃতের সঙ্গে বসবাস (পর্ব ১)

ঢাকা, শুক্রবার   ১৯ জুলাই ২০১৯,   শ্রাবণ ৪ ১৪২৬,   ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪০

মৃতের সঙ্গে বসবাস (পর্ব ১)

আহনাফ তাহমিদ

 প্রকাশিত: ১০:৩৯ ১০ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১১:৫৫ ১০ জানুয়ারি ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

মৃত মানুষের সঙ্গে কি জীবিতদের বসবাস করা সম্ভব? অবশ্যই, সম্ভব নয়! কারণ মৃত্যুর পর দেহাবশেষ পচে-গলে যেতে শুরু করে। এছাড়াও কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে মৃতের সঙ্গে কেউ জীবন পার করা সম্ভব নয়। হাঁটতে চলতে থাকা মানুষটি রয়ে যায় কেবলই স্মৃতির পাতায়। তবে কেউ কেউ আছেন, যারা মৃতকে ভুলতে পারেন না কোনোভাবেই। মাঝে মাঝে তারা এমনসব কাজ করে বসেন, যা আপনার আমার চোখে পাগলামো বলে মনে হতেই পারে। যেমন ধরুন, মৃতের সঙ্গে বসবাস! দুই পর্বে আপনাদের এমনই কিছু ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে, যারা বাস করতেন মৃতদেহের সঙ্গে-

রবার্ট ক্যালভিন মার্ক

টেনিসির অধিবাসী রবার্ট একদিন তার দরজায় টোকা শুনলেন। খুলে দেখলেন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কেন? কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে তিনি একটি মৃতদেহের সঙ্গে বসবাস করছেন (হ্যাঁ, মৃতদেহের সঙ্গে বসবাস করতে হলেও টেনিসিতে অনুমতি গ্রহণ করতে হয়)। ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালের ৩রা ডিসেম্বর। পুলিশকে কেউ একজন ফোন করে রবার্টের বাড়িতে বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে বলেছিলেন। টেনিসি ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করে দেখে, সেখানে ৭২ বছর বয়সী ডরিস অ্যান ব্রেইথওয়েটের মৃতদেহ পড়ে আছে। রবার্টের বয়স ছিল ৬৫। মৃতদেহের অবমাননা করার জন্য তাকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এই ডরিস ছিলেন রবার্টের বান্ধবী। প্রতিবেশীদের দেয়া বয়ানে জানা যায়, রবার্ট বাড়ির বাইরে বেরোতেন না বললেই চলে। শুধুমাত্র সিগারেটের তেষ্টা পেলেই তিনি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতেন।

রবার্ট জেমস কফলার

মৃতের সঙ্গে বসবাস করেও মিনেসোটার অধিবাসী রবার্ট জেমস কফলারের মনে কোনো খেদ নেই। এক বছরেরও কিছু বেশি সময় দু-দুটি মৃতদেহের সঙ্গে বসবাস করেছেন তিনি। একটি ছিল তার মায়ের এবং অপরটি তার জমজ ভাইয়ের দেহ। কীভাবে এ ধরনের একটি কাজ কফলার করতে পারলেন, তা নিয়ে কারো ধারণা ছিল না। ক্রিসমাসের সময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ফোনে জানিয়েছিলেন যে তার মা এবং ভাইয়ের শরীর বেশ অসুস্থ এবং কারো সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ কিংবা কথা বলতে পারবেন না। সকলেই তা মেনেও নিয়েছিল। কফলারের মা মারা গিয়েছিলেন ২০১৫ সালে এবং তার কিছু মাস আগে ভাই। শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি কফলার। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি মৃতা মা এবং ভাইয়ের মরদেহ নিজের সঙ্গে রেখেছিলেন। পুলিশের বয়ান মতে, কফলারের ভাইয়ের দেহ মমিফাইড করা হয়েছিল এবং মায়ের দেহটি একটি কঙ্কাল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। মেডিকেল পরীক্ষকের দেহ দুটি শনাক্ত করতে সপ্তাহান্ত লেগে যায়। তবে তাদেরকে হত্যা করা হয়নি। প্রাকৃতিক কারণেই মৃত্যু ঘটেছিল এই দু’জনের।

ম্যাথিউ শ্মার

২০১৭ সালে অবশেষে নিউ জার্সি কর্তৃপক্ষ ম্যাথিউ শ্মার নামক এক ব্যক্তির বাড়ির দরজা খুলতে সক্ষম হয়। ভেতরে চমকে দেবার মতো কিছু তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। দুটি ঘরের বিছানায় ম্যাথিউ শ্মার এবং ৫২ বছর বয়সী এক নারীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। তিনি অন্তত তিনদিন আগে মারা গিয়েছিলেন। গল্পটা কিছুটা বেদনাদায়ক বটে। মার্চের ১৮ তারিখে এক বন্ধুর বাচ্চাকে দেখাশোনা করার জন্য শ্মার তার বাড়িতে ছিলেন। বাচ্চাটি ৫২ বছর বয়সী এই নারীর তত্ত্বাবধানে ছিল। কিছু ঔষধ এবং হেরোইন কেনার জন্য অন্য এক শহরে যাবার তাগিদ অনুভব করলেন। ফিরে এসে উক্ত নারীকে তিনি জীবিত অবস্থাতেই দেখেন। তবে হঠাৎই অজানা কারণে তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। ভয় পেয়ে যান ম্যাথিউ। প্রথমে তিনি এটিকে আত্মহত্যার কেস হিসেবে সাজাতে শুরু করেন। নারীর ল্যাপটপ এবং কিছু টাকা সরিয়ে ফেলা হয়। ম্যাথিউর বন্ধু ফিরে এলে দরজায় টোকা দেন। কেউ খোলে না। সন্দেহ হয় তার। পুলিশকে ফোন করা হয়। পুলিশ এসে দরজায় টোকা দিলে একই অবস্থা হয়। এরপর দরজা ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকে এই ভয়াবহ চিত্র দেখতে পান। তবে বাচ্চাটি জীবিতই ছিল।  

ডরিস কার্বি

এতক্ষণ যাদের গল্প বললাম, তারা সবাই ছিলেন পুরুষ। এখন বলব এক নারীর গল্প। ২০১৪ সালে ডরিস কার্বির স্বামী নানা অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। অ্যালাবামায় এই দম্পতির সঙ্গে আর কোনো পরিবার পরিজন ছিল না। স্বামীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্ত্রী ডরিস তার পাশে ছিলেন। ডরিস আলঝেইমারের রোগী ছিলেন। তার স্বামীই বাড়িতে দেখাশোনা করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তার অসুস্থতা এতটাই তীব্র হয়ে যায় যে সৎকার না করেই তার মৃতদেহের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। আশেপাশের প্রতিবেশীদের অনুরোধে পুলিশ এসে দেখে বাড়িতে ডরিসের স্বামী মৃত। তাদের দুটি কুকুর ছিল। ক্ষুধার তাড়নায় সেগুলোও মরে পড়ে আছে। বেচারী ডরিসের শরীর এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে স্বামী বেঁচে আছেন না মারা গিয়েছেন, তাও ঠিকমতো জানতেন না তিনি। তারা দু’জন দু’জনকে দেখাশোনা করতেন প্রতিনিয়ত। তবে মৃত্যুর পরও স্বামীকে নিজের অজান্তেই কাছে রেখে দিয়েছিলেন ডরিস কার্বি।  

রোড আইল্যান্ডের মানুষটি

ডরিস কার্বির ঘটনাটি ঘটবার কিছুদিন পরই প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দূরে প্রায় একইরকম একটি ঘটনা ঘটে। ৭১ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ফায়ার ডিপার্টমেন্টকে ফোন করেন। আলঝেইমারের একদম শেষ স্টেজে ছিলেন তিনি। কেন তিনি ফোন করেছিলেন, তা অজানা। তবে ফায়ার ডিপার্টমেন্টের লোকজন এসে দেখে বেজমেন্টে নিজের মৃতা স্ত্রীর লাশ নিয়ে তিনি দু’দিন বসবাস করছেন, সম্পূর্ণ নিজের অজান্তেই। বাড়ির কুকুরটিকেও সেখানে পাওয়া যায়, ডরিসের মতোই। তবে হত্যা করা হয়েছে কিনা এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক কারণেই বৃদ্ধের ৬৭ বছর বয়সী স্ত্রী এবং কুকুরটির মৃত্যু হয়েছিল।  (আগামী পর্বে সমাপ্ত হবে)

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস