Alexa মুসল্লিদের হক ও ইমামের করণীয়

ঢাকা, সোমবার   ২১ অক্টোবর ২০১৯,   কার্তিক ৫ ১৪২৬,   ২১ সফর ১৪৪১

Akash

মুসল্লিদের হক ও ইমামের করণীয়

শহীদুল ইসলাম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

 প্রকাশিত: ২১:১৪ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ২১:১৭ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ঢাকা শহরকে বলা হয় মসজিদের শহর। এ শহরের অলিগলিতে প্রচুর মসজিদ। ঢাকা ছাড়াও আমাদের দেশের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের অবস্থা একই। এর কারণ হচ্ছে এদেশের মুসলমানদের ইসলামের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও ধর্মভীরুতা। 

শহরগুলোতে যেমন অনেক মসজিদ তেমনি মুসলিম জনসংখ্যার বসবাসও। তাই এত মসজিদ থাকা সত্তে জুমার দিনে মসজিদগুলোতে জায়গা সংকুলান হয় না। বাধ্য হয়ে মুসল্লিদের মসজিদের ছাদ, রাস্তা বা সামনের চত্তরে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে হয়। এই কষ্টকে কেউ কিছু মনে করেন না। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টুই তাদের কাছে মূল। সারা বছর মুসল্লিদের কোনো সমস্যা না হলেও বর্ষাকালে মুসল্লিদের বিপাকে পড়তে হয়। প্রচণ্ড রোদের কারণে গ্রীষ্মকালেও কখনো কখনো মুসল্লিদের কষ্ট পোহাতে হয়। তাই ইমাম সাহেবের চৌকান্ন থাকতে হবে। একদিকে রোদ্র বা বৃষ্টি অন্যদিকে  লম্বা কেরাত খুতবা যেন মুসল্লির মনে বিরক্তির উদ্রেগ না ঘটায়। এটা শুধু মানবীয় বিষয় নয় বরং ইমামতির জিম্মাদারিও বটে।

আরো পড়ুন>>> সন্তানের দীনি জ্ঞান অর্জনে বাবা-মা’র দায়িত্ব

মুসলমানরা বহুকিছু রাসূল (সা.) থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে। দ্বীনের দাওয়াত, ইলম ও কোরআন সুন্নাহর আলোকে বিচার করা যেমন রাসুল (সা.) এর মিরাছ, ইমামতিও তেমনি একটি মিরাছ সম্পদ। রাসূল (সা.) মসজিদে নববীর ইমাম ছিলেন। অন্যরা হচ্ছেন অন্যান্য মসজিদের ইমাম। জীবনের সকল ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) এর আদর্র্শগুলোকে মেনে চলতে হয়। ইমামতির ক্ষেত্রেও তার দেখানো নির্দেশনাগুলোকে মেনে চলতে হবে। তাহলে একজন ইমাম হবেন হেদায়েতের বাতিঘর। অন্যথায় ইমামতিও ফেতনার কারণ হতে পারে। বিভিন্ন হাদিসের আলোকেই তা সুস্পষ্ট। ইমামদেরকে উদ্দেশ্য করে, রাসূল (সা.) যে সকল নির্দেশনা দিয়েছেন নিম্নে তার কিছু আলোচনা করা হলো।

মানুুষের হালতের প্রতি খেয়াল রেখে ইমামতি করা:
বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রতীয়মাণ হয় যে, ইমামতির একটি অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের অবস্থার দিকে খেয়াল রেখে ইমামতি করা। এটা ইমামের ওপর মুক্তাদিদের হকও বটে। একবার রাসূল (সা.) নামাজ পড়াচ্ছেন। নামাজে থেকে তিনি বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়ে নামাজ খুুব দ্রুত শেষ করেন। হাদিসটি হজরত আবু কাতাদা (রা.) এর সূত্রে, বোখারীতে বর্ণীত হয়েছে এভাবে ‘রাসূল (সা.) বলেন, আমি নামাজ শুরু করে লম্বা কেরাত পড়তে চাই, কিন্তু যখনই বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই কেরাত সংক্ষিপ্ত করে ফেলি। কারণ আমি জানি বাচ্চার কান্নার আওয়াজে মা কত পেরেশানিতে পড়ে।’ এই রকমের আরেকটি হাদিস মুুসলিম ও বোখারী উভয় কিতাবে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্র্ণীত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কেরাতের নামাজ রাসূল (সা.) এর পেছনে আদায় করেছি। এবং সবচেয়ে লম্বা কেরাতের নামাজও তার পেছনেই পড়েছি। রাসূল (সা.) এর অবস্থা ছিল কখনো বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলে তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করে ফেলতেন। কারণ তিনি আশংকা করতেন, কেরাত লম্বা করলে বাচ্চার মার নামাজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’ এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ লোকদের নিয়ে নামাজ পড়ে, সে যেন নামাজ সংক্ষিপ্ত করে। কারণ পিছনের লোকদের মাঝে অসুস্থ, দুর্বল ও বৃদ্ধরাও থাকেন। আর যখন একা একা নামাজ আদায় করে তখন যত ইচ্ছা কেরাত লম্বা করবে।’ রাসূল (সা.) এর যমানায় কখনো কখনো এমন ঘটনা ঘটেছে যে, দুর্বল বা কর্মজীবী মানুষ সারা দিন কাজ করে এশার নামাজে দাড়াত আর ইমাম সাহেব লম্বা কেরাত শুরু করত। এতে মুসল্লিদের কষ্ট হত। যখন রাসুল (সা.) এর কাছে এর সংবাদ যেত তখন তিনি ইমামদেরকে কঠিনভাবে সতর্ক করতেন।

মুসল্লিদের অবস্থার প্রতি খেয়াল না করার  কারণে এক সাহাবিকে ফেতনা সৃষ্টিকারী বলা:
ঘটনাটি সহীহ বোখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। বর্ণনাকারী হচ্ছেন হজরত কায়েস ইবনে আবু হাযেম। সূত্র হচ্ছে হজরত আবু মাসউদ আনসারী (রা.)। ঘটনাটি হচ্ছে এক সাহাবি এসে রাসূল (সা.) এর কাছে অভিযোগ দায়ের করল যে, আল্লাহর কসম, ওমুক ব্যক্তির  জন্য আমি ফজরে জামাতে শরিক হই না। সে নামাজে লম্বা লম্বা কেরাত পড়ার কারণে বাধ্য হয়ে আমাকে একা একা নামাজ আদায় করতে হয়। কারণ এত লম্বা সময় আমি দাঁড়াতে সক্ষম নই। আবু মাসউদ আনসারী বলেন, একথা শুনে রাসূল (সা.) লোকদের উদ্দেশে কথা বলতে দাঁড়ালেন। ইতোপূর্বে আমি কখনো রাসূল (সা.)-কে  এত রাগান্বিত হতে দেখিনি। তিনি লোকদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি এমন আছে, যারা নিজেদের কর্ম দ্বারা আল্লাহর বান্দাদেরকে দূরে সরিয়ে দেয়। তোমাদের মাঝে কেউ লোকদের ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করলে তার জন্য উচিত নামাজ সংক্ষিপ্ত করা। লম্বা না করা। কারণ, নামাজিদের মাঝে কেউ থাকে অসুস্থ, কেউ দুর্বল আর অনেকের প্রয়োজনও থাকে।’ এ রকমেই আরেকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সেখানে ঘটনাটি হচ্ছে হজরত মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) সম্পর্কে। তিনি এশা নামাজ সাধারণত বিলম্ব করে শুরু করতেন। তিনি নিজের নিয়ম মোতাবেক একদিন নামাজ বিলম্বে শুরু করেন এবং সূরা বাকারার মতো লম্বা সূরা তেলাওয়াত শুরু করেন। মুক্তাদিদের মাঝে এক লোক ছিলেন কর্মজীবী। সারা দিন মাঠে কাজ করে শরীর ছিল ক্লান্ত। এত লম্বা কেরাতের কারণে বেচারা নামাজ ছেড়ে দিয়ে একা একা নামাজ আদায় করে ফিরে যান। আস্তে আস্তে ঘটনা নবী করিম (সা.) পর্যন্ত পৌছে। তখন তিনি মুয়াজ ইবনে জাবালকে ডেকে অনেক ধমকালেন। এবং বলেন, ‘আ ফাত্তানুন আনত’ অর্থাৎ তুমি কি ফেতনা সৃষ্টিকারী ? এবং তাকে নির্দিষ্ট কিছু সূরা তেলাওয়াতের জন্য বলেন।’ (সহীহ বোখারী ও মুসলিম)

ইমামতি, বয়ান ও খুতবা লৌকিকতা মুক্ত হওয়া:
রাসুল (সা.) এর পর সাহাবায়ে কেরাম হচ্ছেন উম্মতের আদর্শ। এক হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা আমার সুন্নত ও খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নতকে আকড়ে ধর!’ সাহাবায়ে কেরাম কী কী গুণে গুণী ছিলেন তা আমরা অনেকে হয়তো জানি। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘তোমরা কারো অনুসরণ করতে চাইলে মৃতদের অনুসরণ কর। কারণ জীবিতরা ফেতনা থেকে মুক্ত নন। (অনুসরণীয় ওই মৃত ব্যক্তিরা হলেন) মুহাম্মাদ (সা.) এর সাথীগণ। তারা হচ্ছেন উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম। তাদের অন্তর ছিল সর্বাধিক পবিত্র। ইলম ও জ্ঞানের দিক থেকে তারা ছিলেন সবচেয়ে বড় পণ্ডিত। লৌকিকতা ছিল তাদের মাঝে সবচেয়ে কম।’ সাহাবায়ে কেরামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল লৌকিকতা মুক্ত জীবন যাপন। তাই তাদের কথা বলতে হয়নি বরং তাদের দেখেই অনেক মানুষ হেদায়েত পেয়ে যেত। ইমাম সাহেবদের থেকে মানুষ দ্বীন শিখবে। সহজ সরল ভাষায় ইমাম সাহেবদের থেকে দ্বীনের বিষয়গুলো শিখা মুসল্লিদের হক। তাই বয়ান, খুতবা ইত্যাদি দ্বারা উদ্দেশ হবে মানুষের হেদায়াত; শ্রোতাদের আকৃষ্ট করা নয়। কোনো কোনো ইমাম খতিবের বয়ানে হাসি কৌতুক এত বেশি থাকে যে, মনে হয়, এ যেন বিনোদনের কোনো আসর। এগুলো দ্বারা জিম্মাদারি আদায় হবে না। সহজ ভাবে মানুষের কাছে দ্বীনের সহীহ কথা পৌঁছে দিতে পারলেই কেবল জিম্মাদারি আদায় হবে।

ইসলামের নির্দেশ হচ্ছে ‘তোমরা সহজ কর কঠিন কর না, সুসংবাদ দাও, দূরে সরিয়ে দিয়ো না।’ অন্য এক বর্ণনায় এসেছে ‘দ্বীন-ইসলাম হচ্ছে সহজ। দ্বীনের ব্যাপারে কেউ কঠোর হলে সে নিজেই এক সময় ক্লান্ত হয়ে বসে যাবে।’ তাই ইমাম, খতিবগণের জিম্মাদারির উপলব্ধি থাকা জরুরি। মনে রাখতে হবে, আমার কাজ হচ্ছে কৌশলে মানুষকে দ্বীনের যত কাছাকাছি আনা সম্ভব তা করা। আমার আচরণ বা কোনো কর্মের মাধ্যমে মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া কখনো কাম্য নয়। প্রসিদ্ধ ঘটনা। এক ইমাম সাহেব মসজিদের টাকার জন্য জনৈক ব্যবসায়ীর কাছে যান। ব্যবসায়ী তখন ব্যস্ত ছিল তাই ডাকার পর যখন জানতে পারল মসজিদের কালেকশনের জন্য ডেকেছে তখন ইমাম সাহেবের দিকে থুথু দেয়। ইমাম সাহেব বাম হাতে থুথু নিয়ে বলেন, এটাত আমার জন্য, আসলে আমি এর উপযুক্ত। এই যে ডান হাত পেতেছি। এটা আল্লাহর জন্য, এখানে আপনি মসজিদের জন্য কিছু দেন। ব্যবসায়ীর মন গলে যায়। এবং মসজিদের সমস্ত খরচ সে দিয়ে দেয়।’

ইমামতির বাইরেও কিছু জিম্মাদারি পালন করা মুসল্লিদের হক:
নামাজ সংক্রান্ত বিষয় ছাড়াও ইমামের ওপর মুসল্লিদের কিছু হক রয়েছে। প্রথম হক হচ্ছে কোরআনের সঙ্গে মানুষের পরিচয় করে দেয়া। বড়দের জন্য বিশুদ্ধ কোরআন তেলাওয়াত ও সহজভাষায় কোরআনের তরজমা শেখার ব্যবস্থা করা। শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান দেওবন্দি (রা.) কারগার থেকে বের হয়ে শাগরিদদেরকে বলেছিলেন, আমি মুসলমানদের অধপতনের কারণ নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি। আমার কাছে দুটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এক কারণ হলো, মুসলমানদের অনৈক্য আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে মুসলমানদের কোরআন থেকে পিছিয়ে আসা। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার বাকি জীবন এই দুই কাজে ব্যয় করব।’ তাই কোরআনের সঙ্গে পরিচয় করানোও ইমামতির অন্যতম দায়িত্ব। অনেকে মনে করেন সাধারণ মুসলমানরা কোরআন বুঝলে গোমরা হয়ে যাবে। কথাটা ঠিক নয়। তাদেরকে কোরআন থেকে কোন বিষয় শিখাতে হবে সে বিষয় চিন্তা করে ঠিক করতে হবে। তারপর সকলের জন্য কোরআন শিখার ব্যবস্থা করতে হবে।

সর্বশেষ কথা হচ্ছে ইমাম মানে সমাজের নেতা। তাই সমাজ নিয়েও চিন্তা থাকা চাই। শুধু নামাজের চিন্তা করলেই ইমামতির দায়িত্ব আদায় হবে না। সমাজের বাচ্চাদের শিক্ষাদীক্ষা, বেকারদের কর্মসংস্থান, অসুস্থদের চিকিৎসা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর ফিকিরও ইমামের ভেতর থাকতে হবে। সমাজ থেকে অন্যায় ও অনৈতিক কমকাণ্ড দূর করতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতি, ইসলামের আদাবুল মুআশারাতের চর্চা সমাজে চালু করতে হবে। মোট কথা সমাজের যাবতীয় দায়দায়িত্ব একজন ইমামের ওপর বর্তায়। সে যদি তা আদায় করে তাহলে সে প্রকৃত অর্থে ইমাম। অন্যথায় কবির কথার বাস্তব নমুনা আমি ইমাম হয়ে যাব -‘কওম কেয়া ছিজ হ্যয়, কওম কী ইমামত কেয়া হ্যয়, কেয়া সমজে এ বেচারে দু রাকাত কা ইমাম’ অর্থাৎ জাতি কী জিনিস, জাতির নেতৃত্ব কী, এই ইমাম বেচারা কী বুঝবে? 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে